একাধিক অসঙ্গতিপূর্ণ মৃত্যুকালীন ঘোষণার সাক্ষ্যমূল্য ও সাজার আইনি বাস্তবতা (Section 32 Evidence Act) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৩

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২৩
প্রশ্ন ৮। (খ): একাধিক অসঙ্গতিপূর্ণ মৃত্যুকালীন ঘোষণার সাক্ষ্যমূল্য ও সাজার আইনি বাস্তবতা (Section 32 Evidence Act) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৩

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় মৃত্যুকালীন ঘোষণা (Dying Declaration) একটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ও শক্তিশালী সাক্ষ্য। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে মানুষ সাধারণত মিথ্যা বলে না—এই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে সাক্ষীকে জেরা করার সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও ৩২(১) ধারায় এটি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু মৃত ব্যক্তি যদি মৃত্যুর পূর্বে একাধিক ব্যক্তির নিকট ভিন্ন ভিন্ন ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়ে যায়, তবে কোন বক্তব্যটি সত্য বলে গণ্য হবে? অত্র সমস্যাভিত্তিক প্রশ্নে অগ্নিদগ্ধ X ডাক্তারের নিকট N ও Z-এর নাম এবং পরদিন পুলিশের নিকট N, Y ও Z-এর নাম প্রকাশ করে মারা যায়। এই দুটি ভিন্ন বক্তব্যের ভিত্তিতে আসামীদের সাজা দেওয়া যাবে কি না তা নির্ধারণ অত্র প্রশ্নের উদ্দেশ্য।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী

The Evidence Act, 1872 এর Section 32(1) এ মৃত্যুকালীন ঘোষণার বিধান বিবৃত রয়েছে:

“When the statement is made by a person as to the cause of his death, or as to any of the circumstances of the transaction which resulted in his death, in cases in which the cause of that person’s death comes into question.”

৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও গভীর আইনি ব্যাখ্যা

আইনি বিশ্লেষণ ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের সাক্ষ্যমূল্য

  1. বক্তব্য দুটির অসঙ্গতি (Inconsistency in Statements):
    • ডাক্তার D-এর নিকট প্রথম বক্তব্যে X বলেছিল: আসামী N ও Z ‘দাহ্য পদার্থ’ ঢেলে আগুন দিয়েছে (Y-এর কোনো উল্লেখ ছিল না)।
    • পরদিন পুলিশ P-এর নিকট দ্বিতীয় বক্তব্যে X বলল: আসামী N, Y ও Z ‘কেরোসিন’ ঢেলে আগুন দিয়েছে (এখানে নতুন করে Y-এর নাম যুক্ত হয়েছে)।
  2. উচ্চ আদালতের সুপ্রতিষ্ঠিত আইনি নীতি:
    • উচ্চ আদালতের সুপ্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একাধিক মৃত্যুকালীন ঘোষণার মধ্যে যদি মূল আসামী বা ঘটনার বর্ণনায় বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি (Material contradiction) থাকে, তবে আদালত কোনো একটি বক্তব্যের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করে আসামীদের দণ্ড প্রদান করতে পারেন না।
    • যেহেতু প্রথম বক্তব্যে Y ছিল না এবং পরে Y-কে জড়ানো হয়েছে, এটি প্রমাণ করে যে পরবর্তীতে কারো প্ররোচনায় বা অসৎ উদ্দেশ্যে বক্তব্যে পরিবর্তন আনা হতে পারে।
  3. স্বতন্ত্র প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা (Requirement of Corroboration):
    • পরস্পরবিরোধী মৃত্যুকালীন ঘোষণার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী বা ফরেনসিক সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থন (Corroboration) ব্যতিরেকে কেবল এই ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে সাজা দেওয়া আইনসঙ্গত নয়।
    • তবে N ও Z-এর নাম উভয় বক্তব্যেই অভিন্ন থাকায় অন্যান্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণের সাথে মিললে N ও Z-এর বিরুদ্ধে সাজা হতে পারে; কিন্তু Y-এর ক্ষেত্রে কেবল দ্বিতীয় বক্তব্যের ভিত্তিতে কোনো অবস্থাতেই সাজা দেওয়া যাবে না।

৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স

১. কুদরত উল্লাহ বনাম রাষ্ট্র (45 DLR AD 161): আপিল বিভাগ রায় দেন যে, একাধিক মৃত্যুকালীন ঘোষণার মধ্যে পরস্পরবিরোধী তথ্য থাকলে তা সন্দেহের জন্ম দেয় এবং স্বাধীন পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের সমর্থন ছাড়া কেবল তার ভিত্তিতে কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড বা সাজা দেওয়া নিরাপদ নয়।

২. পাঞ্জাব রাজ্য বনাম পারভিন কুমার (AIR 2005 SC 1277): একাধিক ডাইং ডিক্লারেশনে আসামীর সংখ্যা পরিবর্তন হলে নতুন অন্তর্ভুক্ত আসামিকে খালাস দিতে হবে।

৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত

অতএব আইনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: X-এর দুটি পরস্পরবিরোধী মৃত্যুকালীন ঘোষণার নিছক ভিত্তিতে স্বাধীন সাক্ষ্য-প্রমাণের সমর্থন ছাড়া আসামীদের সরাসরি সাজা প্রদান করা আইনসঙ্গত হবে না। বিশেষ করে Y-এর বিরুদ্ধে বক্তব্যটি সম্পূর্ণ সন্দেহযুক্ত হওয়ায় Y সরাসরি খালাস পাওয়ার হকদার।

৪.১. একাধিক অসঙ্গতিপূর্ণ মৃত্যুকালীন জবানবন্দির ক্ষেত্রে আদালতের ৩টি সোনালী অনুশাসন

সাক্ষ্য আইনের ৩২(১) ধারায় মৃত্যুকালীন ঘোষণা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। তবে যদি একই ব্যক্তির একাধিক মৃত্যুকালীন জবানবন্দিতে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থাকে, তবে আদালত নিম্নোক্ত নীতিমালার আলোকে সিদ্ধান্ত নেন:

  • প্রথম বক্তব্যের গুরুত্ব: ঘটনার ঠিক পরপরই চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্বাভাবিক পরিবেশে প্রদত্ত প্রথম বক্তব্যটি আদালত অধিকতর নির্ভরযোগ্য বিবেচনা করেন;
  • প্রভাবমুক্ততা ও মানসিক সুস্থতা: ঘোষণাকারী কি আত্মীয়-স্বজনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল নাকি স্বেচ্ছায় বিবৃতি দিয়েছিল তা চিকিৎসকের সনদ (Fitness Certificate) দ্বারা নিশ্চিত হতে হবে;
  • পারিপার্শ্বিক স্বতন্ত্র সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থন (Corroboration): একাধিক বক্তব্য পরস্পরবিরোধী হলে একক জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে ফাঁসি দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ; আদালত অন্যান্য স্বতন্ত্র চাক্ষুষ বা দালিলিক সাক্ষ্যের সমর্থন দাবি করেন।

৪.২. সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ (আব্দুল জলিল বনাম রাষ্ট্র, 42 DLR (AD) 160) মামলায় সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, অসঙ্গতিপূর্ণ একাধিক মৃত্যুকালীন ঘোষণার ক্ষেত্রে যে বক্তব্যটি অন্যান্য বস্তুগত প্রমাণের সাথে মেলে আদালত কেবল সেটিই গ্রহণ করবেন এবং অবশিষ্ট অংশ বর্জন করবেন।

৪.৩. মৃত্যুকালীন ঘোষণার সময় সাক্ষীদের মানসিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা

মৃত্যুকালীন ঘোষণা লিপিবদ্ধ করার সময় উপস্থিত পুলিশ অফিসার বা ম্যাজিস্ট্রেটের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। ঘোষণাকারী ব্যক্তি কথা বলতে অক্ষম হলে ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে প্রদত্ত বক্তব্যও গ্রহণযোগ্য হতে পারে (ধারা ৩২), তবে উক্ত ইঙ্গিতগুলো একাধিক স্বতন্ত্র নিরপেক্ষ সাক্ষীর দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হতে হবে। অন্যথায় বিপরীতধর্মী বক্তব্যের ক্ষেত্রে আদালত আসামিকে সন্দেহের সুবিধা (Benefit of Doubt) প্রদান করতে বাধ্য।

৪.৪. মৃত্যুকালীন জবানবন্দির ক্ষেত্রে পুলিশের সতর্কতা

ম্যাজিস্ট্রেট না পাওয়া গেলে পুলিশ অফিসার কর্তৃক গৃহীত মৃত্যুকালীন জবানবন্দির সাক্ষ্যমূল্য সীমিত। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, পুলিশ যদি জবানবন্দি নেয় তবে দুইজন নিরপেক্ষ স্থানীয় সাক্ষীকে উপস্থিত রাখতে হবে এবং যথাসম্ভব দ্রুত তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আদালতে উপস্থাপন করতে হবে।

আইনি সিদ্ধান্ত: অতএব, একাধিক অসঙ্গতিপূর্ণ জবানবন্দির ক্ষেত্রে যে বক্তব্যটি সাক্ষীদের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের সাথে সর্বাধিক সঙ্গতিপূর্ণ, বিজ্ঞ আদালত কেবলমাত্র সেই অংশটি গ্রহণ করবেন।

Related Articles

Back to top button