ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত করার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট: ১৯৫৯ সালের কবলা ও এস.এ. রেকর্ডের ভিত্তিতে স্বত্ব বহাল

📌 সংক্ষিপ্ত আইনি সারসংক্ষেপ (Legal Summary)

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক দিকনির্দেশনামূলক রায়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন যে, কোনো ব্যক্তির বৈধ ক্রয়কৃত ও এস.এ. রেকর্ডীয় ব্যক্তিগত কৃষিজমি জরিপ বিভাগের ভুলে সরকারের ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত (Khas Khatian No. 1) হলেই তা সরকারের সম্পত্তিতে পরিণত হয় না। খতিয়ানের ভুল অন্তর্ভুক্তি কারো স্বত্ব সৃষ্টি বা বিলোপ করতে পারে না (An erroneous entry in the record of rights neither creates nor extinguishes title)। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত (৫৬ ডিএলআর (এডি) ৫৩) অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৪এ ধারামতে আর.এস. খতিয়ানের আইনি অনুমিতি কোনো চূড়ান্ত দলিল নয়, বরং উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা তা অখণ্ডনীয়ভাবে খণ্ডনযোগ্য (Rebuttable presumption)। যেক্ষেত্রে ব্যক্তি মালিকপক্ষ ১৯৫৯ সালের ৩০ বছরের অধিক প্রাচীন রেজিস্ট্রি কবলা দলিল (সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারার অনুমিতি), বৈধ নামজারি, ডিসিআর ও খাজনার দাখিলা প্রদর্শন করে স্বত্ব ও বর্গা চাষের দখল প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন এবং সরকারপক্ষ কোনো বৈধ অধিগ্রহণ বা ভেষ্টিং দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে—সেক্ষেত্রে খাস খতিয়ানের দাবি বাতিল করে প্রজার স্বত্ব ঘোষণা আইনসংগত।

১. বিরোধের পটভূমি ও আর.এস. খাস খতিয়ানের সংকট (Background of Dispute)

আলোচ্য মামলার সূচনা সিরাজগঞ্জ জেলার সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে ২০০৬ সালে দায়েরকৃত ১২৯ নম্বর অপর শ্রেণি মোকদ্দমা (Other Class Suit No. 129 of 2006) থেকে। মোকদ্দমাটি দায়ের করেছিলেন বেগম সুফিয়া (বাদী-প্রতিপক্ষ) বাংলাদেশ সরকার, পক্ষে জেলা প্রশাসক, সিরাজগঞ্জের বিরুদ্ধে নালিশি ০.৭৮৫০ একর (সাড়ে ৭৮ শতক) জমিতে স্বত্ব ঘোষণা ও বিবাদী সরকারের নামে প্রস্তুতকৃত ভুল আর.এস. ১ নং খাস খতিয়ান বেআইনি ঘোষণার প্রার্থনায়।

বাদিনীর আরজির বিবরণ মতে, নালিশি ভূমিসহ মোট ৪.৫৮ একর জমির মূল সি.এস. রেকর্ডীয় মালিক ছিলেন কৃষ্ণ চন্দ্র ঘোষ। উক্ত সি.এস. মালিকের নিকট থেকে বাদিনী বিগত ২৭ মে ১৯৫৯ তারিখে ৩২০৮ নম্বর রেজিস্ট্রিকৃত কবলা দলিলের মাধ্যমে ০.৭৮৫০ একর জমি বৈধ মূল্যে খরিদ করে দখল গ্রহণ করেন। উক্ত কবলা দলিলের ভিত্তিতে সরকারি এস.এ. জরিপকালে বাদিনীর নিজ নামে এস.এ. ৮৪ নম্বর খতিয়ান নির্ভুলভাবে প্রস্তুত ও চূড়ান্ত প্রচারিত হয়। বাদিনী পরবর্তীতে সিরাজগঞ্জ সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে নামজারি কেস নং ১২৪২/৯-১/৯০-৯১ মূলে জমাভাগ ও নামজারি অনুমোদন করিয়ে ৯৩৮৬৪ নং ডিসিআর বইয়ের মাধ্যমে খাজনা পরিশোধ করে বর্গা চাষীদের মাধ্যমে ভোগদখলে বহাল থাকেন।

কিন্তু পরবর্তী আর.এস. জরিপকালে সরকারি জরিপ কর্মকর্তা সরেজমিন তদন্ত ব্যতিরেকে অত্যন্ত দায়িত্বহীনভাবে বাদিনীর ব্যক্তিগত জোতের সাড়ে ৭৮ শতক জমি সরকারের ১ নং খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করে নেন। বাদিনী উক্ত ভুলের বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলেন। পরবর্তীতে বিগত ১৭ আগস্ট ২০০৪ তারিখে স্থানীয় তহশিলদার খাস খতিয়ান দেখিয়ে বাদিনীর নিকট থেকে খাজনা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে স্বত্বের ওপর হুমকি সৃষ্টি হয় এবং বাদিনী প্রতিকার চেয়ে দেওয়ানী আদালতে স্বত্ব ঘোষণার মোকদ্দমা দায়ের করেন।

২. পক্ষগণের বিপরীতমুখী দাবি ও প্রতিদ্বন্দ্বী বক্তব্য (Pleadings of the Parties)

বিচারিক আদালতে সরকারপক্ষ লিখিত জবাব দাখিল করে জমিটিকে সরকারি খাস জমি হিসেবে দাবি করে এবং বাদিনীর স্বত্ব অস্বীকার করে।

🏛️ বাদী-প্রজার বক্তব্য ও আইনি দাবি

  • সি.এস. সূত্র ও প্রাচীন দলিল: সি.এস. প্রজা কৃষ্ণ চন্দ্র ঘোষের নিকট হতে ২৭/০৫/১৯৫৯ তারিখের ৩২০৮ নং মূল কবলা দলিলে (Ex-8) জমি ক্রয় করা হয়েছে।
  • বৈধ এস.এ. রেকর্ড: দলিলের ভিত্তিতে বাদিনীর নামে এস.এ. ৮৪ নম্বর খতিয়ান চূড়ান্ত প্রকাশিত হয়েছে যা সরকার কখনো চ্যালেঞ্জ করেনি।
  • নামজারি ও খাজনা দাখিলা: কেস নং ১২৪২/৯০-৯১ মূলে নামজারি ও ডিসিআর নিয়ে বাদিনী নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করেছেন (প্রদর্শনী ৫, ৬ ও ৭)।
  • বর্গা চাষে বাস্তব দখল: জমিতে স্থানীয় বর্গাদার নিয়োগ করে বাদিনী ধান চাষ করিয়ে আসছেন এবং এডভোকেট কমিশনারের তদন্তেও জমি ফসলী প্রমাণিত।
  • ভুল খাস রেকর্ড বাতিলযোগ্য: কোনো সরকারি অধিগ্রহণ বা নোটিশ ছাড়া ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি ১ নং খাস খতিয়ানে লেখা বেআইনি ও বাতিল।

🛡️ সরকার-বিবাদীর লিখিত জবাব ও প্রতিরক্ষা যুক্তি

  • আর.এস. ১ নং খাস খতিয়ান: সর্বশেষ সরকারি আর.এস. জরিপে জমিটি সরকারের ১ নং খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়ে চূড়ান্ত হয়েছে।
  • নিম্নাঞ্চল ও সাধারণের ব্যবহার: নালিশি জমিটি বর্ষাকালে পানিতে নিমজ্জিত থাকে এবং সাধারণ জনগণ এটি উন্মুক্তভাবে ব্যবহার করে থাকে।
  • স্বত্ব ও দখলের অভাব: নালিশি ভূমিতে বাদিনীর কোনো বাস্তব স্বত্ব বা দখল নেই; বাদিনী সরকারি সম্পত্তি গ্রাস করার অপচেষ্টা করছেন।
  • মূল দলিলের হেফাজতে প্রশ্ন: পিডব্লিউ-১ জেরায় বলেছেন মূল দলিল বড় ভাইয়ের কাছে রয়েছে, ফলে দলিলের বিশুদ্ধতা নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়েছে।
  • স্বার্থবান সাক্ষীর বয়ান: বাদিপক্ষে যেসব সাক্ষী পরীক্ষা করা হয়েছে তারা সবাই আত্মীয় ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট সাক্ষী বিধায় তাদের সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য।

৩. অধস্তন আদালতদ্বয়ের বিচার ও অভিন্ন সিদ্ধান্ত (Concurrent Findings of Fact)

সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, সিরাজগঞ্জে বিচার চলাকালে বাদিপক্ষ ১৯৫৯ সালের রেজিস্ট্রি মূল কবলা দলিল প্রদর্শনী-৮ হিসেবে দাখিল করেন। এছাড়াও নামজারি ডিসিআর এবং খাজনার দাখিলাসমূহ প্রদর্শনী ৫, ৬ ও ৭ হিসেবে চিহ্নিত হয়। বাদিপক্ষের সাক্ষীরা শপথ নিয়ে সাক্ষ্য দেন যে জমিটি বর্গা দিয়ে চাষাবাদ করা হয়। অপরদিকে বিবাদী সরকারের একমাত্র সাক্ষী ডিডব্লিউ-১ জেরার মুখে চরম স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেন যে—নালিশি জমির পাশে কোনো বিল বা সরকারি খাস জমি নেই এবং সরকার এই জমি কখনোই কোনো প্রক্রিয়ায় অধিগ্রহণ করেনি! তদুপরি সরকারের দাখিলকৃত আর.এস. খাস খতিয়ানের পর্চায় (Exhibit-Ka) জমির শ্রেণী ‘নিম্নাঞ্চল’ নয় বরং স্পষ্ট অক্ষরে ‘ফসলী’ হিসেবে লিপিবদ্ধ ছিল!

বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালত বিগত ১৩ জুলাই ২০১১ তারিখে বাদিনীর পক্ষে স্বত্বের ডিক্রি প্রদান করেন। উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে সরকারপক্ষ সিরাজগঞ্জের জেলা জজ আদালতে অপর ক্লাস আপিল নং ১২৩/২০১৪ দায়ের করে, যা নিষ্পত্তির জন্য অতিরিক্ত জেলা জজ ২য় আদালতে প্রেরিত হয়। বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা জজ বিগত ০৩ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে আপিল নামঞ্জুর করে সহকারী জজ আদালতের স্বত্বের রায় ও ডিক্রি সম্পূর্ণরূপে বহাল রাখেন। অধস্তন উভয় আদালতের এই অভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে সরকারপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন নং ২৮৬৭/২০২৩ দায়ের করে।

৪. মহামান্য হাইকোর্টে পর্যালোচিত আইনি প্রশ্নসমূহ (Core Legal Issues)

হাইকোর্ট বিভাগের শুনানিতে নিম্নলিখিত তাৎপর্যপূর্ণ আইনি প্রশ্নসমূহের ওপর চূড়ান্ত শুনানি গ্রহণ করা হয়:

  1. আর.এস. খাস খতিয়ানের অনুমিতি ও খণ্ডনযোগ্যতা: প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৪এ ধারা মতে আর.এস. খতিয়ানের প্রাথমিক অনুমিতি থাকা সত্ত্বেও পূর্বের রেজিস্ট্রি দলিল ও এস.এ. রেকর্ডের দ্বারা তা খণ্ডন (Rebuttal of RS record) করা যায় কি না?
  2. ৩০ বছরের প্রাচীন রেজিস্ট্রি দলিলের সাক্ষ্যমূল্য: সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারা মোতাবেক ৩০ বছরের অধিক পুরাতন কোনো মূল রেজিস্ট্রি দলিল দাখিল করা হলে তার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে আদালতের বাধ্যবাধকতা কতখানি?
  3. লিখিত জবাবে ধারাবাহিক স্বত্ব অস্বীকার না করার পরিণতি: দেওয়ানী কার্যবিধির ৮ আদেশের ৫ বিধি অনুযায়ী সরকারের লিখিত জবাবে বাদীর সি.এস. স্বত্ব ও হস্তান্তরের চেইন সুনির্দিষ্টভাবে অস্বীকার না করলে তা কি আইনগত স্বীকারোক্তি হিসেবে গণ্য হবে?
  4. দেওয়ানী রিভিশনের পরিধি: অধস্তন উভয় আদালত যখন সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে অভিন্ন সিদ্ধান্তে (Concurrent findings of fact) উপনীত হয়, তখন কোনো আইনগত বা এখতিয়ারগত বিকৃতি ছাড়া রিভিশন আদালতে হস্তক্ষেপের অবকাশ কতটুকু?

৫. বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দের যুক্তি ও আইনি নজিরসমূহ (Arguments & Citations)

রাষ্ট্রপক্ষে বিজ্ঞ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জনাব মো: জহিরুল ইসলাম এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল জনাব মো: ফেরদৌস সরকার যুক্তি দেখান যে, সর্বশেষ আর.এস. জরিপ হলো দেশের আইনসম্মত কার্যকর রেকর্ড। সেই রেকর্ডে জমিটি ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত হয়েছে। বাদিপক্ষের সাক্ষীরা নিরপেক্ষ ছিলেন না এবং জমির প্রকৃত দখল বাদিপক্ষের ছিল না। সরকার খাস জমি হিসেবে এর মালিকানা ধরে রাখার অধিকারী এবং অধস্তন আদালতদ্বয় আর.এস. রেকর্ড উপেক্ষা করে মারাত্মক ভুল করেছেন।

বিপরীতে প্রতিপক্ষ বাদিপক্ষে বিজ্ঞ কৌঁসুলি জনাব চঞ্চল কুমার বিশ্বাস, মিস উম্মে মাসুম উন নেসা এবং জনাব সৌগত গুহ শুনানিতে অংশ নেন। বিজ্ঞ আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দুটি ঐতিহাসিক নজির উপস্থাপন করেন:

  • 24 BLC (AD) 36: আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, বিবাদীপক্ষ লিখিত জবাবে বাদীর আরজিতে বর্ণিত স্বত্বের ধারাবাহিক চেইন যদি স্পষ্টভাবে অস্বীকার না করে, তবে ৮ আদেশের ৫ বিধিমতে তা বাদীর দাবির পূর্ণ স্বীকারোক্তি হিসেবে গণ্য হবে।
  • 56 DLR (AD) 53: আপিল বিভাগ ঘোষণা করেছেন যে, প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৪এ ধারার অধীনে আর.এস. খতিয়ানের অনুমিতি কোনো চূড়ান্ত বিষয় নয়; যিনি ভুল রেকর্ডের শিকার তিনি বিপরীত সাক্ষ্য-প্রমাণ দাখিল করে আর.এস. রেকর্ড সম্পূর্ণ খণ্ডন করতে পারেন।

বিজ্ঞ কৌঁসুলি আরও তুলে ধরেন ৪৫ ডিএলআর ২১৭ নজির—যেখানে খাজনার দাখিলা ও ডিসিআর দখলের অকাট্য প্রমাণ এবং স্বত্বের সহায়ক সাক্ষ্য হিসেবে স্বীকৃত। সরকারপক্ষ যেখানে কোনোদিন জমি অধিগ্রহণ করেনি, সেখানে ব্যক্তি মালিকানাধীন ফসলী জমি খাস লেখার কোনো আইনি সুযোগ নেই।

৬. সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যবেক্ষণ ও আইনগত অনুসিদ্ধান্ত (Judicial Analysis & Ratio)

মাননীয় বিচারপতি আবদুর রহমান মামলার নথি এবং উচ্চ আদালতের প্রতিষ্ঠিত নজিরসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে নিম্নোক্ত ঐতিহাসিক অনুসিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ করেন:

(এক) খতিয়ানের ভুল অন্তর্ভুক্তি স্বত্ব সৃষ্টি বা ধ্বংস করে না:
আইনশাস্ত্রের চিরন্তন নীতি হলো—খতিয়ান কোনো স্বত্বের মূল দলিল নয়; এটি কেবল রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে প্রস্তুতকৃত দখল সংক্রান্ত তালিকা মাত্র। জরিপ বিভাগের ভুলের কারণে কোনো বৈধ মালিকের জমি যদি ১ নং খাস খতিয়ানে উঠে যায়, তবে সেই ভুলের কারণে সরকারের কোনো স্বত্ব সৃষ্টি হয় না, কিংবা মূল প্রজার স্বত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায় না। যখনই এই ভুলের কারণে প্রজার খাজনা গ্রহণ বন্ধ বা স্বত্ব অস্বীকার করা হয়, তখনই দেওয়ানী আদালতে স্বত্ব ঘোষণার প্রতিকার পাওয়ার পূর্ণ অধিকার প্রজার রয়েছে।

(দুই) ৩০ বছরের পুরাতন দলিল ও সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারা:
বাদিনী ১৯৫৯ সালের মূল রেজিস্ট্রিকৃত কবলা দলিল (প্রদর্শনী-৮) আদালতে প্রদর্শন করেছেন, যা ৫০ বছরেরও বেশি প্রাচীন। সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারা অনুযায়ী ৩০ বছরের অধিক পুরাতন কোনো দলিল যথাযথ হেফাজত থেকে আদালতে দাখিল হলে তার সম্পাদন ও বিশুদ্ধতা সম্পর্কে আদালত নিশ্চিত অনুমিতি গ্রহণ করবে। এছাড়া উক্ত দলিলের ভিত্তিতে পাকিস্তান আমলে প্রস্তুতকৃত এস.এ. ৮৪ নং খতিয়ান বাদিনীর স্বত্বকে অকাট্য ভিত্তি প্রদান করেছে।

(তিন) অধস্তন আদালতের যৌথ সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের অযোগ্যতা:
সহকারী জজ আদালত ও অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত উভয়ই দালিলিক ও মৌখিক সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে অভিন্ন সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে জমিটি বাদিনীর কেনা সম্পত্তি এবং তিনি বর্গা চাষীদের মাধ্যমে দখলে আছেন। সরকারপক্ষ কোনো অধিগ্রহণ দেখাতে পারেনি এবং সরকারের দাখিলকৃত খাস খতিয়ান পর্চাতেই জমিটি ‘ফসলী’ লেখা আছে। দেওয়ানী কার্যবিধির ১১৫(১) ধারার অধীন রিভিশনাল এখতিয়ারে তথ্যের এই অভিন্ন সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের কোনো আইনগত সুযোগ নেই।

৭. হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আদেশ (Final Decision & Order)

মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সার্বিক পর্যালোচনায় সরকারের রিভিশন আবেদনে কোনো আইনগত বা এখতিয়ারগত ভিত্তি না থাকায় নিম্নোক্ত চূড়ান্ত আদেশ প্রদান করেন:

  • রিভিশন রুল খারিজ: সরকারের দায়েরকৃত দেওয়ানী রিভিশন রুল নং ২৮৬৭/২০২৩ কোনো খরচা ছাড়াই চূড়ান্তভাবে খারিজ (Discharged without costs) করা হলো।
  • স্বত্বের ডিক্রি বহাল: সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা জজ ২য় আদালতের অপর ক্লাস আপিল নং ১২৩/২০১৪-এর রায় এবং সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের অপর ক্লাস মোকদ্দমা নং ১২৯/২০০৬-এর স্বত্বের রায় ও ডিক্রি সম্পূর্ণরূপে বহাল ও অপরিবর্তিত রাখা হলো।
  • খাস খতিয়ান সংশোধনের অধিকার: বাদিনী বেগম সুফিয়া নালিশি সাড়ে ৭৮ শতক জমির বৈধ মালিক হিসেবে সাব্যস্ত হলেন এবং রাজস্ব বিভাগে নামজারি ও পরবর্তী জরিপে রেকর্ড সংশোধনের পূর্ণ অধিকারী ঘোষিত হলেন।
  • নথি অবিলম্বে প্রেরণের নির্দেশ: অধস্তন আদালতের নথিপত্র রায়ের অনুলিপিসহ অনতিবিলম্বে সংশ্লিষ্ট আদালতে ফেরত পাঠানোর আদেশ দেওয়া হলো।

৮. মামলার রেফারেন্স ও বিচারিক তথ্যাদি (Case Summary Table)

আইনি গবেষক ও বিজ্ঞ আইনজীবীদের সুবিধার্থে এই ঐতিহাসিক রায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ও বিচারিক রেফারেন্স নিম্নের সারণিতে উপস্থাপন করা হলো:

বিষয়বস্তু মামলার বিস্তারিত তথ্য
উচ্চ আদালত ও বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (দেওয়ানী রিভিশন এখতিয়ার)
মাননীয় বিচারপতি আবদুর রহমান (Mr. Justice Abdur Rahman)
মামলা নম্বর ও শ্রেণি দেওয়ানী রিভিশন নং ২৮৬৭ / ২০২৩ (Civil Revision No. 2867 of 2023)
পক্ষগণের নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, পক্ষে জেলা প্রশাসক, সিরাজগঞ্জ (দরখাস্তকারী/বিবাদী) বনাম বেগম সুফিয়া এবং অন্যান্য (প্রতিপক্ষ/বাদী)
বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দ দরখাস্তকারী পক্ষে: জনাব মো: জহিরুল ইসলাম, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং জনাব মো: ফেরদৌস সরকার, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল
প্রতিপক্ষ পক্ষে: জনাব চঞ্চল কুমার বিশ্বাস, মিস উম্মে মাসুম উন নেসা এবং জনাব সৌগত গুহ, অ্যাডভোকেট
উৎস ও বিচারিক আদালত অতিরিক্ত জেলা জজ ২য় আদালত, সিরাজগঞ্জ (অপর ক্লাস আপিল নং ১২৩/২০১৪, রায়: ০৩.১১.২০১৬)
সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, সিরাজগঞ্জ (অপর ক্লাস মোকদ্দমা নং ১২৯/২০০৬, ডিক্রি: ১৩.০৭.২০১১)
শুনানি ও রায় ঘোষণার তারিখ শুনানি: ২৩ ও ২৮ জুন ২০২৬
চূড়ান্ত রায়: ৩০ জুন ২০২৬ (১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ)
মূল আইনি আলোচ্য ধারা ও নজির State Acquisition and Tenancy Act, 1950 (Section 144A), Evidence Act, 1872 (Section 90), Code of Civil Procedure (Order VIII Rule 5, Section 115(1))
নজির: 56 DLR (AD) 53, 24 BLC (AD) 36, 45 DLR 217
অফিসিয়াল রায় ও পোর্টাল লিংক 📥 অফিসিয়াল জাজমেন্ট PDF ডাউনলোড
🌐 সুপ্রিম কোর্ট পোর্টাল

Related Articles

Back to top button