‘বল প্রয়োগ’, ‘অপরাধমূলক বল প্রয়োগ’ ও ‘আক্রমণ’ বলতে কী বুঝেন? চুরি ও বলপূর্বক গ্রহণ কখন দস্যুতা হিসাবে গণ্য হবে?

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২২: দণ্ডবিধি, ১৮৬০

প্রশ্ন: দণ্ডবিধি অনুযায়ী ‘বল প্রয়োগ’ (Force), ‘অপরাধমূলক বল প্রয়োগ’ (Criminal Force) ও ‘আক্রমণ’ (Assault) বলতে কি বুঝেন? চুরি ও বলপূর্বক গ্রহণ (Extortion) কখন দস্যুতা (Robbery) হিসেবে গণ্য হবে? বিস্তারিত ব্যাখ্যা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]

১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও সংজ্ঞাগত পর্যালোচনা

দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ষোড়শ অধ্যায়ে মানবদেহের বিরুদ্ধে অপরাধসমূহ এবং সপ্তদশ অধ্যায়ে সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধসমূহের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা রয়েছে। শারীরিক আঘাতের সূচনা হয় বলপ্রয়োগ ও আক্রমণ দ্বারা, আর সম্পত্তির অপরাধ চরম রূপ নেয় দস্যুতার মাধ্যমে।

২. বলপ্রয়োগ, অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ ও আক্রমণের তুলনামূলক বিশ্লেষণ

(১) বলপ্রয়োগ (Force – ধারা ৩৪৯):

কোনো ব্যক্তি অপর কোনো ব্যক্তির শরীরে গতি সঞ্চার করে, গতি পরিবর্তন করে বা গতিরোধ করে যদি নিজের দৈহিক শক্তি দিয়ে, কোনো বস্তুর মাধ্যমে অথবা কোনো পশুর মাধ্যমে উক্ত কার্যটি করে, তবে সে ‘বলপ্রয়োগ’ করেছে বলে গণ্য হবে। নিছক বলপ্রয়োগ কোনো অপরাধ নয় (যেমন ডাক্তার কর্তৃক রোগীকে স্পর্শ করা)।

(২) অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ (Criminal Force – ধারা ৩৫০):

যখন কোনো ব্যক্তি অপর কোনো ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে তার ওপর এমনভাবে বলপ্রয়োগ করে—

  • কোনো অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে; অথবা
  • উক্ত ব্যক্তির ক্ষতি, ভয় বা বিরক্তি (injury, fear or annoyance) সৃষ্টির উদ্দেশ্যে;

তখন তা ‘অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ’ হিসেবে গণ্য হয় (যেমন: ইচ্ছাকৃতভাবে কারো মুখের ওপর থুথু নিক্ষেপ করা বা কাপড় টেনে ধরা)।

(৩) আক্রমণ (Assault – ধারা ৩৫১):

কোনো ব্যক্তি যদি এমন কোনো অঙ্গভঙ্গি বা প্রস্তুতি প্রদর্শন করে যা দেখে উপস্থিত কোনো ব্যক্তির মনে যুক্তিসঙ্গত ভীতি জন্মায় যে উক্ত ব্যক্তি এখনই তার ওপর ‘অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ’ করতে উদ্যত হয়েছে, তবে তাকে ‘আক্রমণ’ বলে।

স্মর্তব্য: কেবল মৌখিক কথা আক্রমণ নয়; কিন্তু কথার সাথে মারমুখী অঙ্গভঙ্গি যুক্ত হলে তা আক্রমণ হয় (যেমন: হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ঘুষি মারার ভঙ্গিতে এগিয়ে যাওয়া)।

৩. কখন চুরি ও বলপূর্বক গ্রহণ দস্যুতায় রূপান্তরিত হয় (ধারা ৩৯০)

আইনশাস্ত্রের বিখ্যাত নীতি হলো—“সকল দস্যুতাই হয় চুরি অথবা বলপূর্বক গ্রহণ”। দণ্ডবিধির ৩৯০ ধারা অনুযায়ী নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে এরা দস্যুতায় পরিণত হয়:

মূল অপরাধ কখন দস্যুতা (Robbery) হিসেবে গণ্য হবে?
১. চুরি কখন দস্যুতা (When Theft is Robbery) চুরি করার উদ্দেশ্যে, অথবা চুরি করার সময়ে, অথবা চুরি করা সম্পত্তি বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময়ে চোর যদি স্বেচ্ছাকৃতভাবে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায়, আঘাত দেয় বা অবৈধ প্রতিরোধ করে অথবা তাৎক্ষণিক মৃত্যু, আঘাত বা তাৎক্ষণিক অবৈধ বাধার ভয় প্রদর্শন করে, তবে উক্ত চুরি দস্যুতায় পরিণত হবে।
২. বলপূর্বক গ্রহণ কখন দস্যুতা (When Extortion is Robbery) অপরাধী যদি ভিকটিমের সামনে উপস্থিত থেকে তাকে নিজের বা অন্য কোনো ব্যক্তির তাৎক্ষণিক মৃত্যু, তাৎক্ষণিক গুরুতর আঘাত বা তাৎক্ষণিক অবৈধ বাধার ভয় দেখিয়ে সেই ভয়ের বশবর্তী করে তাৎক্ষণিকভাবে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে বাধ্য করে, তবে উক্ত বলপূর্বক গ্রহণ দস্যুতায় পরিণত হবে।

৪. অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ ও আক্রমণের শাস্তির তুলনামূলক বিধান

দণ্ডবিধিতে পরিস্থিতির গুরুত্ব ও ভিকটিমের মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে পৃথক শাস্তির মাত্রা নির্ধারিত হয়েছে:

  • সাধারণ আক্রমণ বা বলপ্রয়োগ (ধারা ৩৫২): কোনো প্রকার গুরুতর উসকানি ছাড়া আক্রমণ বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগের জন্য অনধিক ৩ মাসের কারাদণ্ড বা ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।
  • সরকারি কর্মচারীকে কর্তব্য পালনে বাধা প্রদানে আক্রমণ (ধারা ৩৫৩): সরকারি কর্মচারীকে সরকারি দায়িত্ব পালনে নিবৃত্ত বা আক্রমণ করলে অনধিক ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।
  • নারীর শালীনতাহানির উদ্দেশ্যে আক্রমণ (ধারা ৩৫৪): কোনো নারীর সম্ভ্রমহানি বা শালীনতাহানির অসাধু উদ্দেশ্যে আক্রমণ বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করলে অনধিক ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড।

৫. উচ্চ আদালতের যুগান্তকারী নজিরসমূহ

  • স্টেট বনাম রমজান আলী (38 DLR 145): পিস্তল দেখিয়ে পকেট থেকে মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া তাৎক্ষণিক মৃত্যুর ভয় প্রদর্শনের শামিল, ফলে তা চুরির স্তর পেরিয়ে দস্যুতার অপরাধ।
  • বিশু শেখ বনাম সম্রাট (16 CWN 1053): চুরি করা সম্পত্তি অক্ষত রাখতে বলপ্রয়োগ করলেই চুরি দস্যুতায় রূপান্তরিত হয়।
  • আনোয়ারুল হক বনাম রাষ্ট্র (45 DLR 210): মুখের অঙ্গভঙ্গির সাথে কোনো ভয় প্রদর্শন না থাকলে তা আক্রমণের আইনি উপাদান পূরণ করে না।

৬. উপসংহার

সংক্ষেপে, আক্রমণ হলো মানসিক প্রস্তুতি ও ভীতি, অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ হলো তার শারীরিক প্রয়োগ। আর দস্যুতা হলো সম্পত্তিকেন্দ্রীক অপরাধ যেখানে তাৎক্ষণিক সহিংসতার স্পর্শ লেগে অপরাধের মাত্রা লঘু হতে চরম গুরুতর স্তরে উন্নীত হয়।

৪. বলপ্রয়োগ, অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ ও আক্রমণের সংবিধিবদ্ধ তুলনামূলক ছক

তুলনার ক্ষেত্র বলপ্রয়োগ (Force – ৩৪৯ ধারা) অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ (Criminal Force – ৩৫০ ধারা) আক্রমণ (Assault – ৩৫১ ধারা)
প্রকৃতি বিশুদ্ধ শারীরিক বল বা গতি পরিবর্তন (অপরাধমূলক উদ্দেশ্য ছাড়া) সম্মতি ছাড়া অপরাধ করার উদ্দেশ্যে বা ক্ষতি/ভয় সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বলপ্রয়োগ শারীরিক অঙ্গভঙ্গি বা প্রস্তুতি যার মাধ্যমে ভুক্তভোগীর মনে আসন্ন বলপ্রয়োগের ভীতি সৃষ্টি হয়
শারীরিক সংস্পর্শ শারীরিক সংস্পর্শ বা গতিবেগ প্রয়োজন শারীরিক সংস্পর্শ সরাসরি ঘটে থাকে কোনো প্রত্যক্ষ সংস্পর্শের প্রয়োজন নেই; নিছক ভীতিজনক প্রস্তুতিই যথেষ্ট
শাস্তি স্বতন্ত্র কোনো শাস্তি নেই (সংজ্ঞামূলক) ৩৫২ ধারা মতে ৩ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫০০ টাকা জরিমানা বা উভয় ৩৫২ ধারা মতে ৩ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫০০ টাকা জরিমানা বা উভয়

৫. অঙ্গভঙ্গি বনাম মৌখিক উক্তি: আক্রমণের আইনি মাত্রা ও সুপ্রিম কোর্টের নজির

দণ্ডবিধির ৩৫১ ধারার ব্যাখ্যায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কেবল মৌখিক হুমকি বা গালিগালাজ কোনো আক্রমণ নয়; তবে মৌখিক কথার সাথে যদি এমন কোনো শারীরিক অঙ্গভঙ্গি (যেমন- লাঠি উঁচিয়ে মারতে উদ্যত হওয়া বা বন্দুক তাক করা) যুক্ত থাকে যা অন্যের মনে আশু আঘাতের ভীতি তৈরি করে, তবে তা সম্পূর্ণ আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে। সুপ্রিম কোর্ট (কাদের বনাম রাষ্ট্র, 39 DLR 140) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, আক্রান্ত ব্যক্তির যুক্তিসঙ্গত আতঙ্কই আক্রমণের মূল আইনগত উপাদান।

৬. গুরুতর ও আকস্মিক প্ররোচনায় আক্রমণ বা বলপ্রয়োগের দায় হ্রাস (ধারা ৩৫৮)

দণ্ডবিধির ৩৫৮ ধারা অনুযায়ী, যদি আসামি কোনো গুরুতর ও আকস্মিক প্ররোচনার (Grave and Sudden Provocation) বশবর্তী হয়ে আক্রমণ বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করে, তবে শাস্তির মাত্রা হ্রাস পেয়ে মাত্র ১ মাস কারাদণ্ড বা ২০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। তবে এই প্ররোচনা আসামির নিজ সৃষ্ট বা আইনের আদেশ পালনকারীর বিরুদ্ধে হতে পারবে না।

Related Articles

Back to top button