থানায় এজাহার লেখার নিয়ম ও সরাসরি কপি করার ৩টি নমুনা ফরম্যাট (২০২৬)
⚖️ এজাহার (FIR) সম্পর্কে আইনি তাৎপর্য ও মূলনীতি
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ১৫৪ ধারা অনুযায়ী কোনো আমলযোগ্য অপরাধ (Cognizable Offence) সংঘটিত হওয়ার সংবাদ যখন প্রথম কোনো থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (OC)-এর নিকট মৌখিকভাবে বা লিখিতভাবে পৌঁছানো হয়, তখন তাকে প্রথম তথ্য বিবরণী বা এজাহার (First Information Report – FIR) বলা হয়। এজাহার কোনো চূড়ান্ত সাক্ষ্যমূলক দলিল নয়, তবে এটি ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার প্রাথমিক ভিত্তিপ্রস্তর। এজাহারে ঘটনার তারিখ, সময়, স্থান, অপরাধীদের ভূমিকা এবং প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের নাম সঠিকভাবে উল্লেখ করা অত্যন্ত জরুরি।
১. এজাহার (FIR) এবং সাধারণ ডায়েরি (GD)-এর তুলনামূলক পার্থক্য
অনেকেই থানায় অভিযোগ করতে গিয়ে এজাহার এবং জিডি (GD)-এর পার্থক্য গুলিয়ে ফেলেন। নিচের টেবিলটি দেখে পরিষ্কার ধারণা নিন:
| বৈশিষ্ট্য | এজাহার (FIR) | সাধারণ ডায়েরি (GD) |
|---|---|---|
| আইনি ধারা | ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারা | ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৪ ধারা ও পিআরবি ৩৭৭ |
| অপরাধের প্রকৃতি | আমলযোগ্য অপরাধ (খুন, ডাকাতি, মারধর, ধর্ষণ ইত্যাদি) | অ-আমলযোগ্য বিষয়, হারানো সংবাদ বা সম্ভাব্য অপরাধের আশঙ্কা |
| পুলিশের পদক্ষেপ | আদালতের অনুমতি ছাড়াই তাৎক্ষণিক তদন্ত ও আসামি গ্রেফতার | ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়া কোনো তদন্ত বা গ্রেফতার নয় |
| মামলার জন্ম | সরাসরি নিয়মিত জি.আর. (GR) ফৌজদারি মামলার সৃষ্টি হয় | নিছক একটি পুলিশি এন্ট্রি বা রেকর্ড হিসেবে থাকে |
২. এজাহার লেখার সাধারণ নিয়মাবলী ও আবশ্যিক বিষয়সমূহ
- স্পষ্ট তারিখ ও সময়: ঘটনাটি কোন দিন, কত তারিখ এবং আনুমানিক কয়টার সময় ঘটেছে তা স্পষ্ট লিখুন।
- ঘটনাস্থল (Place of Occurrence – PO): ঘটনাস্থল কোন মৌজায়, কোন রাস্তার মোড়ে বা কার বাড়ির উঠানে তা সুনির্দিষ্ট উল্লেখ করুন।
- আসামিদের সুনির্দিষ্ট বিবরণ: আসামিদের নাম, পিতার নাম, ঠিকানা এবং সম্ভব হলে তাদের বয়স ও পেশা উল্লেখ করুন। অজ্ঞাতনামা আসামি থাকলে তাদের আনুমানিক সংখ্যা লিখুন।
- আঘাত ও অস্ত্রের সুনির্দিষ্ট বর্ণনা: কোন আসামি কোন অস্ত্র (লাঠি, রড, রামদা) দিয়ে শরীরের কোন স্থানে আঘাত করেছে তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করুন।
- লুণ্ঠিত সম্পদের তালিকা: টাকা, মোবাইল বা স্বর্ণালঙ্কার ছিনতাই হলে তার আনুমানিক মূল্য পৃথক প্যারায় লিখুন।
- চিকিৎসা গ্রহণের প্রমাণ: ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে কোন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বা কার অধীনে চিকিৎসা নিয়েছে তা লিপিবদ্ধ করুন।
- সাক্ষীদের তালিকা: ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে যারা ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছেন তাদের নাম ও ঠিকানা আরজির শেষে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করুন।
৩. সরাসরি কপি করার উপযোগী ৩টি বাস্তবসম্মত নমুনা এজাহার ফরম্যাট
নিচে সাধারণ নাগরিকদের সুবিধার জন্য তিনটি বহুল প্রচলিত ঘটনার তৈরি এজাহার ফরম্যাট দেওয়া হলো। আপনি বন্ধনীর মধ্যকার তথ্যগুলো নিজের ঘটনা অনুযায়ী পরিবর্তন করে সরাসরি সাদা কাগজে প্রিন্ট বা কম্পোজ করে থানায় দাখিল করতে পারেন:
📋 নমুনা ১: জমি দখল, সীমানা প্রাচীর ভাঙচুর ও মারধরের এজাহার
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)
[………………………] থানা, [………………………] জেলা।
বিষয়: বেআইনি জনতাবদ্ধে অনধিকার প্রবেশপূর্বক জমি দখল, সীমানা প্রাচীর ভাঙচুর, মারধর ও প্রাণনাশের হুমকির বিষয়ে এজাহার।
মহোদয়,
আমি নিম্নস্বাক্ষরকারী [আপনার নাম] (বয়স: ….. বছর), পিতা: [পিতার নাম], মাতা: [মাতার নাম], সাং: [গ্রাম/মহল্লা], থানা: [থানা], জেলা: [জেলা], পেশা: [পেশা], এই মর্মে এজাহার দায়ের করিতেছি যে—
১. নিম্নলিখিত ব্যক্তিগণ আমার পূর্বপরিকল্পিত শত্রু ও বিবাদী:
(১) [১ নং বিবাদীর নাম] (বয়স: …..), পিতা: […………………..], সাং: […………………..]
(২) [২ নং বিবাদীর নাম] (বয়স: …..), পিতা: […………………..], সাং: […………………..]
(৩) অজ্ঞাতনামা আরও ৪/৫ জন সন্ত্রাসী ব্যক্তি।
২. ঘটনার বিবরণ এই যে, [জেলা] জেলার [থানা] থানাধীন [মৌজার নাম] মৌজার সিএস/আরএস খতিয়ান নং […..], দাগ নং […..] এ মোট […..] শতক জমি আমার পৈতৃক ও খরিদসূত্রে দখলীয় সম্পত্তি। উক্ত জমিতে আমি সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করিয়া শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখল করিয়া আসিতেছি। বিবাদীগণ দীর্ঘদিন যাবত উক্ত সম্পত্তি জবরদখল করার পাঁয়তারা চালাইয়া আসিতেছিল।
৩. এমতাবস্থায় গত [তারিখ] তারিখ আনুমানিক সকাল [সময়] ঘটিকার সময় ১ ও ২ নং বিবাদীর হুকুমে অজ্ঞাতনামা আসামিরা দেশীয় মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে (লোহার রড, শাবল, দা) সজ্জিত হইয়া বেআইনি জনতাবদ্ধে আমার উক্ত জমিতে অনধিকার প্রবেশ করে। তাহারা শাবল ও হাতুড়ি দ্বারা আমার সীমানা প্রাচীরের প্রায় ৫০ ফুট দেওয়াল ভাঙিয়া ফেলিয়া আনুমানিক ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকার আর্থিক ক্ষতিসাধন করে।
৪. আমি এবং আমার ভাই [সাক্ষীর নাম] বাধা প্রদান করিতে গেলে ১ নং বিবাদী হত্যার উদ্দেশ্যে তাহার হাতে থাকা লোহার রড দিয়া আমার মাথায় আঘাত করার চেষ্টা করিলে আমি হাত দিয়া ঠেকাইলে আমার বাম হাতের কনুইতে গুরুতর ফাটা জখম হয়। ২ নং বিবাদী আমার ভাইকে কিল-ঘুষি ও লাথি মারিয়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে নীলাফুলা জখম করে। আমাদের চিৎকার শুনিয়া আশেপাশের সাক্ষীরা ছুটিয়া আসিলে বিবাদীগণ আমাদিগকে এই মর্মে হুমকি দেয় যে, “বাড়াবাড়ি করিলে তোদের লাশ গুম করিয়া ফেলিব।”
৫. অতঃপর সাক্ষীদের সহায়তায় আমরা উদ্ধার হইয়া স্থানীয় [হাসপাতালের নাম] হাসপাতালে গিয়া জরুরি বিভাগে চিকিৎসা গ্রহণ করি। চিকিৎসা গ্রহণ ও সাক্ষীদের সহিত পরামর্শ করিয়া এজাহার দায়ের করিতে সামান্য বিলম্ব হইল।
অতএব, বিনীত প্রার্থনা এই যে, উপরোক্ত ঘটনাটি সরজমিনে তদন্তপূর্বক দোষী বিবাদীগণের বিরুদ্ধে এজাহার হিসেবে গণ্য করিয়া দণ্ডবিধির ১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/৩২৩/৩২৫/৪২৭/৫০৬ ধারায় নিয়মিত মামলা রুজু করিতে আপনার মর্জি হয়।
বিনীত নিবেদক,
স্বাক্ষর: …………………………………
নাম: [আপনার নাম]
মোবাইল নং: [আপনার মোবাইল নম্বর]
তারিখ: …………………………………
সাক্ষীগণের নাম ও ঠিকানা:
১. [সাক্ষী ১ এর নাম ও মোবাইল]
২. [সাক্ষী ২ এর নাম ও মোবাইল]
৩. [সাক্ষী ৩ এর নাম ও মোবাইল]
📋 নমুনা ২: পথরোধ, মারধর, ছিনতাই ও নগদ টাকা লুটের এজাহার
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)
[………………………] থানা, [………………………] জেলা।
বিষয়: পথরোধ করিয়া ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখাইয়া মারধর, নগদ অর্থ ও মোবাইল ছিনতাইয়ের বিষয়ে এজাহার।
মহোদয়,
আমি নিম্নস্বাক্ষরকারী [আপনার নাম] পেশায় একজন ব্যবসায়ী। এই মর্মে অভিযোগ করিতেছি যে, গত [তারিখ] তারিখ রাত আনুমানিক [সময়] ঘটিকার সময় আমি আমার দোকান বন্ধ করিয়া দিনের বিক্রয়লব্ধ নগদ ১,৫০,০০০/- (এক লাখ পঞ্চাশ হাজার) টাকা এবং একটি স্যামসাং স্মার্টফোন ব্যাগে লইয়া মোটরসাইকেলযোগে বাড়ি ফিরিতেছিলাম।
পথিমধ্যে [স্থান/রাস্তার নাম] এর নির্জন স্থানে পৌঁছামাত্র ৩ জন অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারী মোটরসাইকেল আড়াআড়ি করিয়া আমার গতিরোধ করে। আমি থামিবামাত্র ১ জন আমার গলায় ধারালো চাকু ধরিয়া চিৎকার করিতে নিষেধ করে এবং অন্যজন কাঠের বাটযুক্ত লাঠি দিয়া আমার পিঠে সজোরে আঘাত করে। তাহারা আমার সাথে থাকা টাকার ব্যাগ ও পকেটে থাকা মোবাইল ফোনটি (যার আনুমানিক মূল্য ৩০,০০০/- টাকা) জোরপূর্বক ছিনাইয়া নেয়। আমার চিৎকারে পথচারীরা আসিতে থাকিলে দুষ্কৃতকারীরা দ্রুত মোটরসাইকেল চালাইয়া [দিকের নাম] দিকে পালাইয়া যায়।
অতএব, বিষয়টি তদন্তপূর্বক দণ্ডবিধির ৩৪১/৩৯২ ধারায় নিয়মিত মামলা রুজু করিয়া ছিনতাইকৃত মালামাল উদ্ধার ও আসামিদের গ্রেফতারের ব্যবস্থা করিতে মহোদয়ের মর্জি হয়।
নিবেদক,
[আপনার নাম ও মোবাইল]
তারিখ: ………………..
📋 নমুনা ৩: প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের এজাহার (দণ্ডবিধির ৪২০/৪০৬ ধারা)
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)
[………………………] থানা, [………………………] জেলা।
বিষয়: বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখাইয়া নগদ ৫ লাখ টাকা গ্রহণপূর্বক প্রতারণা ও আত্মসাতের বিষয়ে এজাহার।
মহোদয়,
অভিযোগকারী আমি [আপনার নাম]। ১ নং বিবাদী [বিবাদীর নাম] নিজেকে একটি ট্রাভেল এজেন্সির মালিক পরিচয় দিয়া আমাকে কানাডায় উচ্চ বেতনের ওয়ার্ক পারমিট ভিসা দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। তাহার মিষ্টি কথায় বিশ্বাস করিয়া গত [তারিখ] তারিখে বিবাদীর অফিসে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে আমি নগদ ৫,০০,০০০/- (পাঁচ লাখ) টাকা প্রদান করি এবং বিবাদী ৩ মাসের মধ্যে ভিসা দেওয়ার লিখিত অঙ্গিকার করে।
কিন্তু নির্ধারিত মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার পর ভিসা না দিয়া ঘুরাইতে থাকে এবং সম্প্রতি টাকা ফেরত চাহিলে বিবাদী স্পষ্ট জানায় যে সে কোনো টাকা ফেরত দিবে না এবং আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। বিবাদী পূর্বপরিকল্পিতভাবে প্রতারণার উদ্দেশ্যে বিশ্বাসভঙ্গ করিয়া আমার কষ্টার্জিত টাকা আত্মসাৎ করিয়াছে।
অতএব, দণ্ডবিধির ৪২০/৪০৬/৫০৬ ধারায় মামলা রুজু করিয়া অর্থ উদ্ধারে আপনার সুমর্জি হয়।
নিবেদক,
[আপনার নাম ও মোবাইল]
তারিখ: ………………..
৪. থানা যদি এজাহার গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে আপনার আইনি প্রতিকার কী?
পুলিশ রেগুলেশনস এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে এজাহার নিতে পুলিশ বাধ্য। কিন্তু কোনো কারণে থানা যদি এজাহার নিতে গড়িমসি বা অস্বীকৃতি জানায়, তবে আপনার কাছে দুটি শক্তিশালী আইনি পথ খোলা রয়েছে:
- পুলিশ সুপার (SP) বরাবর আবেদন: জেলার পুলিশ সুপার (বা মেট্রোপলিটনে ডিসি ক্রাইম) বরাবর এজাহারের একটি অনুলিপিসহ ডাকযোগে বা সরাসরি আবেদন করুন। পুলিশ সুপার তদন্তের নির্দেশ দিলে থানা মামলা রুজু করতে বাধ্য।
- আদালতে সি.আর. মামলা (CR Case) দায়ের: ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০ ও ২০০ ধারা অনুযায়ী আপনি সরাসরি সংশ্লিষ্ট এলাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট / মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে নালিশি মামলা (Complaint Register Case) দায়ের করতে পারেন। ম্যাজিস্ট্রেট আপনার জবানবন্দি গ্রহণ করে থানাকে এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ (Section 156(3) CrPC) দিতে পারেন অথবা পিবিআই/সিআইডিকে তদন্তের আদেশ দেবেন।
