ফৌজদারি রিভিশন দরখাস্তের পূর্ণাঙ্গ মুসাবিদা (Section 439A CrPC) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৫

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২৫
প্রশ্ন ৫। (খ): ফৌজদারি রিভিশন দরখাস্তের পূর্ণাঙ্গ মুসাবিদা (Section 439A CrPC) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৫

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

ফৌজদারি মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় অভিযোগ গঠন (Framing of Charge) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তর। ফৌজদারি কার্যবিধির 241A ধারা অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট কেবল নালিশের বক্তব্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে অভিযোগ ভিত্তিহীন মনে হলে আসামিকে অব্যাহতি দিতে পারেন। কিন্তু চার্জ শুনানিকালে যদি ম্যাজিস্ট্রেট আসামিপক্ষের দাখিলকৃত বিতর্কিত অপ্রমাণিত নথির (যেমন অডিট রিপোর্ট) উপর নির্ভর করে আসামিকে অব্যাহতি প্রদান করেন, তবে তা আইনের গুরুতর অপপ্রয়োগ। অত্র সমস্যাভিত্তিক প্রশ্নে এই ধরনের বেআইনি অব্যাহতি আদেশের বিরুদ্ধে বিজ্ঞ মহানগর দায়রা জজ আদালতের নিকট দায়েরের জন্য নালিশকারীর পক্ষে একটি পূর্ণাঙ্গ রিভিশন দরখাস্ত মুসাবিদা প্রস্তুত করা হয়েছে।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী

The Code of Criminal Procedure, 1898 এর অধীন রিভিশনের সংবিধিবদ্ধ ভিত্তি:

  • Section 241A: যখন ম্যাজিস্ট্রেট আসামিকে অব্যাহতি প্রদান করবেন (Discharge of accused in warrant case)।
  • Section 435: নিম্ন আদালতের নথিপত্র তলব ও পর্যালোচনার ক্ষমতা।
  • Section 439A: দায়রা জজের রিভিশন এখতিয়ার ও আদেশ প্রদানের ক্ষমতা (Powers of Sessions Judge in revision)।
  • The Penal Code, 1860, Sections 406 & 420: বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণা।

৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও গভীর আইনি ব্যাখ্যা

আইনি প্রেক্ষাপট ও রিভিশনের মূল আইনি গ্রাউন্ডসমূহ

বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশের ত্রুটিসমূহ যা রিভিশনাল গ্রাউন্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে:

  1. চার্জ শুনানীতে আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের নথিপত্র অগ্রাহ্য: CrPC ধারা 241A এবং উচ্চ আদালতের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী, অভিযোগ গঠন বা অব্যাহতির শুনানীর পর্যায়ে ম্যাজিস্ট্রেট কেবল অভিযোগকারী কর্তৃক দাখিলকৃত আরজি ও নথিপত্র দেখবেন। আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো দলিল (Defense Document) বিবেচনা করার কোনো আইনি সুযোগ নেই।
  2. অডিট রিপোর্টের সত্যতা বিচারিক শুনানীর বিষয়: আইনজীবী X কর্তৃক দাখিলকৃত অডিট রিপোর্টটি আসল না ভুয়া তা সাক্ষ্য-প্রমাণ ও জেরার মাধ্যমে প্রমাণসাপেক্ষ। সাক্ষ্যগ্রহণ ব্যতিরেকে চার্জ শুনানীর দিনে এই ধরনের দলিলের ওপর ভিত্তি করে আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া বিজ্ঞ আদালতের চরম এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ।

৪. পূর্ণাঙ্গ খসড়া মুসাবিদা (Legal Drafting)

বিজ্ঞ মহানগর দায়রা জজ আদালত, ঢাকা
ফৌজদারী রিভিশন মোকদ্দমা নং ………… / ২০২৫
(বিজ্ঞ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নং ৫, ঢাকা কর্তৃক সি.আর মোকদ্দমা নং ১২০/২০২৪ এ প্রদত্ত বিগত ১০/০৪/২০২৫ তারিখের বেআইনি অব্যাহতি আদেশের বিরুদ্ধে)

Y, পিতা: মৃত রফিক উল্লাহ, সাং: বাড়ি নং ১২, রোড নং ৫, ধানমন্ডি, ঢাকা। …….. নালিশকারী—রিভিশনকারী
বনাম
১. X (আয়কর আইনজীবী), পিতা: অজ্ঞাত, চেম্বার: স্যুট-৪০২, বিজয়নগর, ঢাকা। …….. অভিযুক্ত—প্রতিপক্ষ
২. রাষ্ট্র, জেলা প্রশাসক, ঢাকা কর্তৃক প্রতিনিধিত্বকৃত। ……………………………… প্রতিপক্ষ

The Code of Criminal Procedure, 1898 এর Section 435 সহ পঠিতব্য Section 439A ধারা মতে নালিশকারী পক্ষে রিভিশন দরখাস্ত।

বিনীত নিবেদন এই যে—

  1. নালিশকারী একজন সৎ ও নিয়মিত করদাতা ব্যবসায়ী। অভিযুক্ত ১ নং প্রতিপক্ষ X একজন আয়কর আইনজীবী। নালিশকারী তার ২০২৪-২০২৫ করবছরের আয়কর সরকারি কোষাগারে জমাদানের নিমিত্তে অভিযুক্তের নিকট নগদ ৫,০০,০০০/- (পাঁচ লক্ষ) টাকা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র হস্তান্তর করেন।
  2. অভিযুক্ত উক্ত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে প্রতারণামূলকভাবে আত্মসাৎ করায় নালিশকারী বিজ্ঞ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০ ধারায় সি.আর মামলা নং ১২০/২০২৪ দায়ের করেন।
  3. বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগের সত্যতা পেয়ে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সমন জারি করেন এবং অভিযুক্ত আদালতে হাজির হয়ে জামিন লাভ করে পরবর্তীতে CrPC ধারা 241A অনুযায়ী অব্যাহতির (Discharge) আবেদন দাখিল করে।
  4. গত ১০/০৪/২০২৫ তারিখে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট ধারা 241A এর অধীন শুনানিকালে অভিযুক্ত প্রতিপক্ষ কর্তৃক দাখিলকৃত একটি স্ব-নির্মিত ও অপ্রমাণিত ‘অডিট রিপোর্ট’ বিবেচনা করে অভিযুক্তকে মামলা হতে বেআইনিভাবে অব্যাহতি (Discharge) প্রদান করেন, যা সম্পূর্ণ এখতিয়ারবহির্ভূত ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

আইনগত কারণসমূহ (Grounds):

I. যেহেতু বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট CrPC এর 241A ধারার অন্তর্নিহিত বিধান অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন। 241A ধারা অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট কেবল নালিশের বক্তব্য ও অভিযোগকারী কর্তৃক উপস্থাপিত প্রমাণাদি বিবেচনা করবেন; আসামিপক্ষের কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের দলিল বিচার ও সাক্ষ্য প্রমাণ ব্যতীত বিবেচনা করার কোনো এখতিয়ার বিজ্ঞ নিম্ন আদালতের ছিল না।

II. যেহেতু অভিযুক্ত কর্তৃক দাখিলকৃত অডিট রিপোর্টটি আসল না জাল তা সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা ব্যতিরেকে নির্ধারণ করা আইনত অসম্ভব ছিল। বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট বিচারিক এখতিয়ারের সুস্পষ্ট সীমা লঙ্ঘন করে উক্ত অপ্রমাণিত দলিলের ভিত্তিতে অব্যাহতি প্রদান করে গুরুতর আইনগত ভুল (Error of law) করেছেন।

III. যেহেতু নালিশকারী আরজিতে সুস্পষ্টভাবে ৫ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণার সুনির্দিষ্ট উপাদান উপস্থাপন করেছেন যা দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০ ধারায় একটি সুস্পষ্ট প্রাইমা ফেসি অপরাধ প্রতিষ্ঠা করেছে; ফলে আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করাই ছিল সংবিধিবদ্ধ বাধ্যবাধকতা।

প্রার্থনা:
অতএব বিনীত প্রার্থনা এই যে, বিজ্ঞ আদালত অনুগ্রহপূর্বক নিম্ন আদালতের মূল নথি তলবপূর্বক বিজ্ঞ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের গত ১০/০৪/২০২৫ তারিখের বেআইনি অব্যাহতি আদেশটি বাতিল ও রদ করতঃ অভিযুক্ত প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০ ধারায় চার্জ গঠনপূর্বক নিয়মিত বিচারকার্য পরিচালনার নির্দেশ প্রদানে মর্জি হয়।

তারিখ: ১৫ মে ২০২৫
নালিশকারী পক্ষে অ্যাডভোকেট

৫. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স

১. মিজানুর রহমান বনাম রাষ্ট্র (51 DLR 212): সুপ্রিম কোর্ট দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন যে, 241A ধারায় চার্জ শুনানীর সময় আসামীপক্ষের কোনো বিতর্কিত দলিল গ্রহণ বা বিবেচনা করে অব্যাহতি প্রদান সম্পূর্ণ বেআইনি; আসামীকে তার নির্দোষিতা নিয়মিত বিচারে সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে।

২. জয়নাল আবেদীন বনাম রাষ্ট্র (45 DLR AD 161): আপিল বিভাগ পর্যবেক্ষণ করেন যে, অভিযোগনামায় প্রাথমিক উপাদান (Prima facie case) থাকলে আসামির দাখিলকৃত নথির ভিত্তিতে বিচারপূর্ব অব্যাহতি দেওয়া বিচারিক ক্ষমতার অপব্যবহার।

৬. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত

বিজ্ঞ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের গত ১০/০৪/২০২৫ তারিখের বেআইনি অব্যাহতি আদেশটি আইন ও নথির সাক্ষ্যপ্রমাণের পরিপন্থী হওয়ায় তা দায়রা জজের রিভিশন এখতিয়ারে বাতিলযোগ্য এবং আসামীর বিরুদ্ধে ৪০৬/৪২০ ধারায় চার্জ গঠন করার জন্য নিম্ন আদালতকে নির্দেশ প্রদান সমীচীন।

Related Articles

Back to top button