হাইকোর্ট বিভাগের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা ৫৬১এ ধারা ও কোয়াশমেন্ট নজির – বার কাউন্সিল ২০১৫
বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১৫: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮
প্রশ্ন: ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১(ক) ধারায় হাইকোর্ট বিভাগের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা (Inherent Powers) আলোচনা করুন। কোন কোন পরিস্থিতিতে হাইকোর্ট বিভাগ কোনো ফৌজদারি মামলার কার্যধারা বাতিল (Quashment of Proceedings) করিতে পারেন? দেওয়ানি বিরোধকে ফৌজদারি রূপ দিলে আদালত কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন? সুপ্রিম কোর্টের নজির ও ফৌজদারি মিস পিটিশনের খসড়াসহ আলোচনা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]
১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও অন্তর্নিহিত ক্ষমতার স্বরূপ
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (CrPC)-এর ধারা ৫৬১(ক) কোনো নতুন বা কৃত্রিম ক্ষমতা সৃষ্টি করে না; বরং এটি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের আদি ও অন্তর্নিহিত বিচারিক কর্তৃত্বকে বিধিবদ্ধভাবে স্বীকৃতি প্রদান ও সংরক্ষণ করে। বিধিবদ্ধ আইনে সকল বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিকার আগে থেকে লিখে রাখা সম্ভব নয়। তাই আদালতকে যাতে কারিগরি আইনের অন্ধ শিকলে বন্দি হয়ে অন্যায় প্রত্যক্ষ করতে না হয়, সেজন্যই ৫৬১(ক) ধারা একটি সর্বোচ্চ বিচারিক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এর আইনগত দর্শন হলো—“Courts exist to dispense justice, not to perpetuate injustice”।
২. ৫৬১(ক) ধারার ৩টি নির্দিষ্ট সোনালী উদ্দেশ্য (Three Golden Purposes)
ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১(ক) ধারার সুস্পষ্ট ঘোষণা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগ নিম্নোক্ত ৩টি উদ্দেশ্যে তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন:
- কার্যবিধির আওতাধীন কোনো আদেশ কার্যকর করতে (To give effect to any order under this Code): আদালতের বৈধ নির্দেশ বা ডিক্রি বাস্তবায়নে কোনো বাধা দেখা দিলে তা দূরীকরণে।
- আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার অপব্যবহার রোধ করতে (To prevent abuse of the process of any Court): যেখানে কোনো মিথ্যা, হয়রানিমূলক বা ভিত্তিহীন মামলা দায়ের করে কাউকে অন্যায়ভাবে হেনস্তা বা ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশ্যে আদালতের প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়।
- ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য সমুন্নত ও নিশ্চিত করতে (Otherwise to secure the ends of justice): যেখানে অন্য কোনো সুস্পষ্ট বিধিবদ্ধ আইনি পথ নেই কিন্তু ন্যায়বিচারের চরম ব্যর্থতা রোধে উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ অপরিহার্য।
৩. মামলা বাতিল বা কোয়াশমেন্টের (Quashment) সংবিধিবদ্ধ ক্ষেত্রসমূহ
সুপ্রিম কোর্টের সুপ্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে ফৌজদারি মামলার কার্যধারা ৫৬১(ক) ধারায় কোয়াশ (Quash) বা বাতিল করা হয়:
- বিশুদ্ধ দেওয়ানি বিরোধকে ফৌজদারি রূপদান (Civil dispute given criminal colour): জমিজমার স্বত্ব বা চুক্তির শর্ত ভঙ্গের মতো নিখাদ দেওয়ানি বিরোধকে চাপ সৃষ্টির অসৎ উদ্দেশ্যে পেনাল কোডের ৪২০/৪০৬ ধারায় মামলা দায়ের করা হলে।
- এজাহারে কোনো অপরাধের উপাদান না থাকা (No Prima Facie Offence): এজাহার বা নালিশী দরখাস্তের সমস্ত বক্তব্য সত্য ধরে নিলেও যদি আইনের চোখে কোনো আমলযোগ্য অপরাধ গঠিত না হয়।
- আইনি বা সংবিধিবদ্ধ নিষেধাজ্ঞা থাকা: যেমন কোনো আইনের অধীনে সরকারি অনুমোদন (Sanction) ছাড়া মামলা দায়ের করা হলে (CrPC 195/197) কিংবা বিচারিক এখতিয়ারের সম্পূর্ণ অভাব থাকলে।
- হয়রানিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা (Frivolous and Vexatious Prosecution): ব্যক্তিগত শত্রুতা চরিতার্থ করার জন্য সুস্পষ্ট মিথ্যা ও সাজানো মামলা।
৪. তুলনামূলক বিশ্লেষণ: আপিল বনাম রিভিশন বনাম ৫৬১(ক) ধারায় কোয়াশমেন্ট
| তুলনার ক্ষেত্র | ফৌজদারি আপিল (Section 404) | ফৌজদারি রিভিশন (Section 439) | অন্তর্নিহিত ক্ষমতা (Section 561A) |
|---|---|---|---|
| অধিকারের উৎস | সংবিধিবদ্ধ সুনির্দিষ্ট অধিকার (Statutory Right)। | তত্ত্বাবধায়ক ও পর্যালোচনার অধিকার। | আদালতের স্বাভাবিক ও সুপ্ত অন্তর্নিহিত বিচারিক ক্ষমতা। |
| কার্যকারিতার পর্যায় | চূড়ান্ত রায় ও সাজার পর দায়ের হয়। | আদেশ বা রায়ের বৈধতা পরীক্ষার জন্য। | মামলার যে কোনো পর্যায়ে (এফআইআর, চার্জশিট বা চার্জ গঠনকালে) প্রয়োগযোগ্য। |
| অন্য প্রতিকার থাকা অবস্থায় | আপিল বিদ্যমান থাকলে রিভিশন বা ৫৬১(ক) সাধারণ নিয়মে চলে না। | আপিল না থাকলে প্রযোজ্য। | অন্য কোনো কার্যকর প্রতিকার না থাকলে বা প্রক্রিয়া অপব্যবহার হলে। |
৫. হাইকোর্ট বিভাগে ৫৬১(ক) ধারার ক্রিমিনাল মিস পিটিশনের আনুষ্ঠানিক মুসাবিদা
IN THE SUPREME COURT OF BANGLADESH
HIGH COURT DIVISION
(CRIMINAL MISCELLANEOUS JURISDICTION)
CRIMINAL MISCELLANEOUS CASE NO. ……… OF 2024
IN THE MATTER OF:
An application under Section 561A of the Code of Criminal Procedure, 1898 for quashing the proceedings of C.R. Case No. 120 of 2023 under Sections 420/406 of the Penal Code, now pending before the learned Metropolitan Magistrate, Court No. 5, Dhaka.
— AND —
Md. Rafiqul Islam …… Accused-Petitioner
— Versus —
1. The State, 2. Md. Enamul Haque …… Opposite Parties
The Petitioner most respectfully states:
- That the dispute between the parties arises out of a purely commercial breach of contract for supply of goods, which is entirely civil in nature.
- That the Opposite Party No. 2 with mala fide intention and to exert undue criminal pressure has instituted the impugned complaint under Sections 420/406 of the Penal Code without any element of dishonesty at inception.
- That continuation of the impugned criminal proceedings is a glaring abuse of the process of the Court and is liable to be quashed to secure the ends of justice.
PRAYER: Wherefore, it is humbly prayed that Your Lordships may be pleased to issue a Rule Nisi calling upon the Opposite Parties to show cause as to why the proceedings shall not be quashed, and pending hearing, stay all further proceedings of the case.
৬. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ (Landmark Case Laws)
- শামসুল হক বনাম রাষ্ট্র (44 DLR (AD) 273): সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, যদি কোনো অভিযোগের মূল ভিত্তি একটি দেওয়ানি বিরোধ বা চুক্তিভঙ্গ হয়, তবে ফৌজদারি আদালতের প্রক্রিয়া ব্যবহার করে আসামি দমন করা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার অপব্যবহার এবং ৫৬১(ক) ধারায় উক্ত মামলা অবিলম্বে কোয়াশ করতে হবে।
- কাজী সিরাজুল হক বনাম রাষ্ট্র (52 DLR (AD) 120): আপিল বিভাগ রায় দেন যে, অভিযোগপত্রে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধের উপাদান প্রাথমিকভাবে না থাকে, তবে অভিযুক্তকে দীর্ঘ বিচারের দুর্ভোগে ফেলা অন্যায়; হাইকোর্ট বিভাগ ৫৬১(ক) ধারায় তা বাতিল করবেন।
- মো: আলী বনাম রাষ্ট্র (36 DLR (AD) 14): আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, ৫৬১(ক) ধারার ক্ষমতা একটি ব্যতিক্রমী ক্ষমতা; সাধারণ নিয়মে বিচারিক আদালতের ট্রায়াল ব্যাহত করার জন্য এটি ঢালাওভাবে প্রয়োগ করা যাবে না।
৭. উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, হাইকোর্ট বিভাগের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা ৫৬১এ ধারা ও কোয়াশমেন্ট নজির ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ অলংকার। এটি বিচারপ্রার্থী নাগরিকদের অন্যায় পুলিশি হয়রানি ও বিদ্বেষমূলক ফৌজদারি মামলা থেকে রক্ষা করার এক অপরাজেয় সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ বর্ম হিসেবে কাজ করে।
