পুলিশ ডায়েরি কি ও আসামির ডায়েরি তলবের অধিকারের আইনি বিশ্লেষণ – বার কাউন্সিল ২০১৭

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১৭: ফৌজদারি কার্যবিধি ও সাক্ষ্য আইন

প্রশ্ন: ৪। (খ) পুলিশ ডায়েরি বা কেস ডায়েরি (Case Diary) কি? ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭২ ধারা মোতাবেক পুলিশ ডায়েরি রক্ষণাবেক্ষণের আইনি নিয়মাবলী কি? আসামি কি বিচার চলাকালে পুলিশ ডায়েরি তলব বা দেখার দাবি করিতে পারে? সাক্ষ্য আইনের ১৪৫ ও ১৬১ ধারার আলোকে ব্যতিক্রমসমূহ সুপ্রিম কোর্টের নজিরসহ বিশদ আলোচনা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]

১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও পুলিশ ডায়েরির ধারণা

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (CrPC)-এর ১৭২ ধারা এবং পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল (PRB)-এর প্রবিধান ১০৯ অনুযায়ী তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা আমলযোগ্য অপরাধের তদন্ত চলাকালে প্রতিদিনের তদন্ত অগ্রগতির যে সুনির্দিষ্ট রেজিস্টার সংরক্ষণ করেন, তাকে পুলিশ ডায়েরি বা কেস ডায়েরি (Case Diary – BP Form No. 38) বলা হয়। এটি আদালতের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্ত সহায়ক নথি হিসেবে কাজ করে।

২. পুলিশ ডায়েরিতে অন্তর্ভুক্ত আবশ্যকীয় তথ্যাবলি (Section 172(1))

  1. তদন্ত শুরুর সময় এবং দৈনিক তদন্ত পরিচালনার সুনির্দিষ্ট সূচি (Day-to-day proceedings);
  2. তদন্তের স্বার্থে কর্মকর্তা কোন কোন স্থানে গমন করেছেন এবং অপরাধস্থল পরিদর্শন করেছেন;
  3. তদন্তকালে তিনি কি কি পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বা আলামত প্রত্যক্ষ করেছেন;
  4. কোন কোন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেছেন এবং তদন্তের গতিপ্রকৃতি কি ছিল।

৩. আসামি বা তার কৌঁসুলির তলবের অধিকারের ওপর সংবিধিবদ্ধ নিষেধাজ্ঞা

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭২(২) ধারায় আসামির অধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে বলা হয়েছে:

“Neither the accused nor his agents shall be entitled to call for such diaries, nor shall he or they be entitled to see them merely because they are referred to by the Court.”
অর্থাৎ, আসামি বা তার নিয়োজিত আইনজীবী নিজ অধিকারে পুলিশ ডায়েরি তলব করতে পারবেন না এবং আদালত তদন্তের সহায়তায় ডায়েরি পাঠ করলেও আসামি তা পরিদর্শনের দাবি করতে পারেন না।

৪. দুটি ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র: যখন আসামি পুলিশ ডায়েরি দেখতে ও জেরা করতে পারে

  1. সাক্ষ্য আইনের ১৬১ ধারা (স্মৃতি পুনরুজ্জীবিত করা – Refresh Memory): তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা যদি সাক্ষ্যের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ডায়েরি পাঠ করে নিজের স্মৃতি সতেজ বা পুনরুজ্জীবিত করেন, তবে সাক্ষ্য আইনের ১৬১ ধারা মোতাবেক আসামিপক্ষ উক্ত ডায়েরির সংশ্লিষ্ট অংশটি দেখার এবং সাক্ষীকে উক্ত বিষয়ে জেরা করার পূর্ণ আইনগত অধিকার লাভ করেন।
  2. সাক্ষ্য আইনের ১৪৫ ধারা (পূর্ববর্তী বক্তব্যের বৈপরীত্য – Contradiction): যদি বিজ্ঞ আদালত তদন্তকারী কর্মকর্তার সাক্ষ্যের সাথে ডায়েরিতে লিখিত বক্তব্যের কোনো বৈপরীত্য উদঘাটনের জন্য ডায়েরিটি ব্যবহার করেন, তবে সাক্ষ্য আইনের ১৪৫ ধারার শর্তপূরণ সাপেক্ষে আসামিপক্ষ উক্ত বৈপরীত্য নিয়ে সাক্ষীকে জেরা করতে পারেন।

৫. বিজ্ঞ দায়রা আদালতে আসামিপক্ষের আবেদনের আনুষ্ঠানিক খসড়া (Draft Application)

বিজ্ঞ দায়রা জজ আদালত, ঢাকা

দায়রা মোকদ্দমা নং ……… / ২০২৩

রাষ্ট্র — বনাম — মো: সেলিম (আসামি)

সাক্ষ্য আইনের ১৬১ ধারা মতে কেস ডায়েরির সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠা পরিদর্শনের আবেদন

আসামিপক্ষে বিজ্ঞ আদালত সমীপে নিবেদন এই যে—

  1. অত্র মামলার আই.ও (তদন্তকারী কর্মকর্তা) পি.ডব্লিউ-৫ হিসেবে সাক্ষ্য প্রদানকালে বিজ্ঞ আদালতের অনুমতি নিয়ে কেস ডায়েরির পাতা নং ২০ পাঠ করিয়া নিজের স্মৃতি পুনরুজ্জীবিত (Refresh Memory) করিয়াছেন।
  2. সাক্ষ্য আইনের ১৬১ ধারার সংবিধিবদ্ধ বিধান মতে আসামিপক্ষের উক্ত পাতাটি পরিদর্শন এবং সাক্ষীকে বিস্তারিত জেরা করার অবিসংবাদিত অধিকার জন্মাইয়াছে।

প্রার্থনা: অতএব বিনীত প্রার্থনা এই যে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে কেস ডায়েরির উক্ত পৃষ্ঠা ২০ আসামিপক্ষকে পরিদর্শনের সুযোগ এবং সাক্ষীকে জেরার অনুমতি দানে আদালতের মর্জি হয়।

৪.১. পুলিশ ডায়েরি বনাম জেনারেল ডায়েরি (জিডি) বনাম প্রথম তথ্য বিবরণী (এফআইআর)

তুলনার ক্ষেত্র পুলিশ কেস ডায়েরি (Case Diary) জেনারেল ডায়েরি (GD) প্রথম তথ্য বিবরণী (FIR)
আইনি ভিত্তি CrPC ধারা ১৭২ ও PRB ১০৯। পুলিশ আইন ধারা ৪৪ ও CrPC ১৫৫। CrPC ধারা ১৫৪।
মূল বিষয়বস্তু চলমান তদন্তের প্রতিটি পদক্ষেপ ও দৈনন্দিন সূচি। থানার সাধারণ দৈনন্দিন প্রশাসনিক ঘটনা। আমলযোগ্য অপরাধের প্রাথমিক এজাহার।
আসামির তলবের অধিকার সাধারণ নিয়মে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (ব্যতিক্রম: ১৬১/১৪৫)। নাগরিক আবেদনের মাধ্যমে কপি পেতে পারে। আসামি বাধ্যতামূলকভাবে কপি পাওয়ার অধিকারী।

৫.১. কেস ডায়েরির গোপনীয়তা রক্ষার পেছনের যুক্তি ও ব্যতিক্রম

পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল (PRB)-এর প্রবিধান ১০৯ এবং CrPC ১৭২ ধারার মূল লক্ষ্য হলো পুলিশ যাতে কোনো প্রকার ভয় বা রাজনৈতিক চাপ ছাড়া নিরপেক্ষভাবে ডায়েরি লিখতে পারে। সাক্ষীদের নাম-ঠিকানা বা সোর্স (ইনফরমার)-এর পরিচয় প্রকাশ পেলে তাদের জীবনের নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে। এই কারণেই ডায়েরি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। তবে যখনই পুলিশ কর্মকর্তা কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ডায়েরি দেখে সাক্ষ্য দেন, তখনই ন্যায়বিচারের স্বার্থে সাক্ষ্য আইনের ১৬১ ধারা প্রাধান্য পায় এবং গোপনীয়তার পর্দা উঠে যায় (রাষ্ট্র বনাম মজিবুর রহমান, 44 DLR 233)।

৬. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ (Landmark Case Laws)

  • আব্দুল মজিদ বনাম রাষ্ট্র (39 DLR (AD) 117): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, তদন্তকারী কর্মকর্তা ডায়েরি দেখে সাক্ষ্য দেওয়ার পর আসামিপক্ষকে উক্ত পাতা দেখতে না দিলে তা বিচারের স্বচ্ছতাকে ক্ষুণ্ণ করে।
  • কুইন এমপ্রেস বনাম মান্নু (19 All 390 – Full Bench): আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, পুলিশ ডায়েরি কোনো বস্তুগত প্রমাণ নয়, এটি কেবল আদালতকে সত্য অনুসন্ধানে সহায়তা করে।

৭. উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, পুলিশ ডায়েরি কি ও আসামির ডায়েরি তলবের অধিকারের আইনি বিশ্লেষণ ফৌজদারি তদন্তের সুরক্ষা এবং আসামির নিরপেক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের একটি চমৎকার আইনি ভারসাম্য নিশ্চিত করে।

৪.১. পুলিশ ডায়েরি বনাম জেনারেল ডায়েরি (জিডি) বনাম প্রথম তথ্য বিবরণী (এফআইআর)

তুলনার ক্ষেত্র পুলিশ কেস ডায়েরি (Case Diary) জেনারেল ডায়েরি (GD) প্রথম তথ্য বিবরণী (FIR)
আইনি ভিত্তি CrPC ধারা ১৭২ ও PRB ১০৯। পুলিশ আইন ধারা ৪৪ ও CrPC ১৫৫। CrPC ধারা ১৫৪।
মূল বিষয়বস্তু চলমান তদন্তের প্রতিটি পদক্ষেপ ও দৈনন্দিন সূচি। থানার সাধারণ দৈনন্দিন প্রশাসনিক ঘটনা। আমলযোগ্য অপরাধের প্রাথমিক এজাহার।
আসামির তলবের অধিকার সাধারণ নিয়মে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (ব্যতিক্রম: ১৬১/১৪৫)। নাগরিক আবেদনের মাধ্যমে কপি পেতে পারে। আসামি বাধ্যতামূলকভাবে কপি পাওয়ার অধিকারী।

৫.১. কেস ডায়েরির গোপনীয়তা রক্ষার পেছনের যুক্তি ও ব্যতিক্রম

পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল (PRB)-এর প্রবিধান ১০৯ এবং CrPC ১৭২ ধারার মূল লক্ষ্য হলো পুলিশ যাতে কোনো প্রকার ভয় বা রাজনৈতিক চাপ ছাড়া নিরপেক্ষভাবে ডায়েরি লিখতে পারে। সাক্ষীদের নাম-ঠিকানা বা সোর্স (ইনফরমার)-এর পরিচয় প্রকাশ পেলে তাদের জীবনের নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে। এই কারণেই ডায়েরি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। তবে যখনই পুলিশ কর্মকর্তা কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ডায়েরি দেখে সাক্ষ্য দেন, তখনই ন্যায়বিচারের স্বার্থে সাক্ষ্য আইনের ১৬১ ধারা প্রাধান্য পায় এবং গোপনীয়তার পর্দা উঠে যায় (রাষ্ট্র বনাম মজিবুর রহমান, 44 DLR 233)।

Related Articles

Back to top button