সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৯ ধারায় বিবাদীর স্বত্বের দাবি ও আইনি মূল্যায়ন – বার কাউন্সিল ২০১৪
বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১৪: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭
প্রশ্ন: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৯ ধারার মোকদ্দমায় বিবাদী কি তাহার স্বত্ব বা মালিকানার দাবি (Plea of Title) উত্থাপন করিতে পারে? বিবাদী যদি উক্ত সম্পত্তির প্রকৃত মালিকও হয়, তবে ৯ ধারার ডিক্রির বিরুদ্ধে বিবাদীর প্রতিকার কি? আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান ও সুপ্রিম কোর্টের নজিরের আলোকে মূল্যায়ন করুন। [পূর্ণমান: ১৫]
১. তাত্ত্বিক পটভূমি ও আইনগত অবস্থান
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ (Specific Relief Act, 1877)-এর ৯ ধারা মূলত সম্পত্তির স্বত্ব বা মালিকানা নির্ধারণের কোনো আদালত নয়; এটি একটি সংক্ষিপ্ত ও দ্রুত প্রতিকারমূলক দেওয়ানি ব্যবস্থা যার একমাত্র লক্ষ্য শান্তিপূর্ণ দখল রক্ষা করা। এই ধারার আইনগত মূলনীতি হলো—“Jus tertii” বা স্বত্বের দাবি তুলে জোরপূর্বক বেদখলকে বৈধতা দেওয়া যাবে না। আইনের শাসনের মৌলিক শর্ত হলো, ভূমির মালিকানা যারই থাক না কেন, আইন প্রয়োগের একচ্ছত্র অধিকার কেবল রাষ্ট্রের। নিজের জমিতেও যদি অন্য কোনো ব্যক্তি শান্তিপূর্ণ দখলে থাকে, তবে মালিককে আদালতের মাধ্যমে উচ্ছেদের বৈধ প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে হবে, গায়ের জোরে উচ্ছেদ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
২. বিবাদী কি ৯ ধারায় স্বত্বের দাবি (Plea of Title) উত্থাপন করিতে পারে?
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৯ ধারার ২য় অনুচ্ছেদে আইনপ্রণেতাগণ অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বিধিবদ্ধ করেছেন:
“Nothing in this section shall bar any person from suing to establish his title to such property and to recover possession thereof.”
অর্থাৎ, এই ধারার কোনো কিছুই কোনো ব্যক্তিকে সম্পত্তির স্বত্ব প্রতিষ্ঠা ও দখল উদ্ধারের মামলা দায়ের হতে বারিত করবে না, কিন্তু ৯ ধারার মোকদ্দমায় স্বত্বের কোনো প্রশ্নই আদালত কর্তৃক বিবেচিত হবে না।
অতএব, ৯ ধারার মামলায় বিবাদী যদি আত্মপক্ষ সমর্থনে আরজির জবাবে দাবি করে যে—“আমি এই জমির খরিদা সূত্রে বা ওয়ারিশ সূত্রে প্রকৃত ও একমাত্র মালিক”, তবুও বিজ্ঞ আদালত বিবাদীর উক্ত স্বত্বের দাবি সরাসরি নাকচ ও অগ্রাহ্য করবেন। আদালত কেবল দুটি প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করবেন:
- উচ্ছেদ বা বেদখলের ঠিক পূর্বে বাদী উক্ত সম্পত্তিতে শান্তিপূর্ণ দখলে ছিলেন কি না?
- বাদীর সম্মতি ছাড়া এবং আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে বিবাদী বাদীকে জোরপূর্বক বেদখল করেছে কি না? এবং মামলাটি ৬ মাসের মধ্যে দায়ের হয়েছে কি না?
যদি এই উপাদানগুলো প্রমাণিত হয়, তবে বিবাদী প্রকৃত জমির মালিক হওয়া সত্ত্বেও বিজ্ঞ আদালত বাদীর অনুকূলে দখল পুনরুদ্ধারের ডিক্রি প্রদান করতে আইনত বাধ্য।
৩. ৯ ধারার বিপরীতে বিবাদীর লিখিত বক্তব্যের (Written Statement) আনুষ্ঠানিক খসড়া
৯ ধারার মামলায় বিবাদী স্বত্বের দাবি না তুলে কীভাবে আইনসম্মত ও যুক্তিযুক্ত লিখিত বক্তব্য প্রস্তুত করবেন, তার খসড়া নিম্নে প্রদত্ত হলো:
বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, সদর, ঢাকা
দেওয়ানি মোকদ্দমা নং ৪৫ / ২০২৪ (সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ৯ ধারা)
বাদী: মো: আব্দুর রহিম
— বনাম —
বিবাদী: মো: কবির হোসেন
বিবাদী কর্তৃক দাখিলকৃত লিখিত বক্তব্য (Written Statement)
বিবাদী পক্ষ বিজ্ঞ আদালত সমীপে নিবেদন করিতেছে যে—
- বাদী কর্তৃক দায়েরকৃত আরজির বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
- বাদী কখনোই তপশিল বর্ণিত জমিতে শান্তিপূর্ণ বাস্তব দখলে ছিলেন না। তিনি ছিলেন নিছক একজন অনধিকার প্রবেশকারী বা লাইসেন্সধারী ব্যক্তি।
- বিবাদী বাদীকে কোনো প্রকার বলপ্রয়োগ বা বেআইনিভাবে উচ্ছেদ করেন নাই। বাদী স্বেচ্ছায় অন্যত্রে বাসস্থান পরিবর্তন করিয়াছেন।
- আরজিতে কথিত বেদখলের যে তারিখ উল্লেখ করা হইয়াছে তাহা মিথ্যা; প্রকৃত প্রস্তাবে কথিত ঘটনা সংঘটিত হয় নাই এবং মামলাটি তামাদি আইনের ৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ৬ মাসের তামাদি মেয়াদের পর দায়ের করায় আরজি সরাসরি খারিজযোগ্য।
প্রার্থনা: অতএব বিনীত প্রার্থনা এই যে, মিথ্যা ও তামাদিতে বারিত আরজি খারিজপূর্বক বিবাদীর অনুকূলে ক্ষতিপূরণমূলক খরচ মঞ্জুর করিতে বিজ্ঞ আদালতের মর্জি হয়।
৪. বিবাদী যদি প্রকৃত মালিক হয়, তবে তার আইনি প্রতিকারসমূহ
৯ ধারায় ডিক্রি হয়ে গেলে বা ডিক্রি ঘোষণার মুখে বিবাদীর সামনে ৩টি স্পষ্ট সংবিধিবদ্ধ প্রতিকার বিদ্যমান থাকে:
- সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ও ৪২ ধারায় নিয়মিত স্বত্ব ঘোষণার মামলা: ৯ ধারার ডিক্রির কোনো রেস জুডিকাটা প্রভাব স্বত্বের ওপর পড়ে না। তাই বিবাদী সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ধারার অধীনে স্বত্ব সাব্যস্তপূর্বক খাস দখল উদ্ধারের জন্য বেদখলের তারিখ থেকে ১২ (বারো) বৎসরের মধ্যে নিয়মিত দেওয়ানি মামলা দায়ের করতে পারেন। উক্ত মামলায় বিবাদী স্বত্ব প্রমাণ করতে পারলে তিনি বৈধভাবে জমির চূড়ান্ত মালিকানা ও দখল ফিরে পাবেন।
- দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫ ধারায় রিভিশন: ৯ ধারার ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিল ও রিভিউ নিষিদ্ধ হলেও নিম্ন আদালত যদি আইনগত এখতিয়ার লঙ্ঘন করে বা তামাদির বিধান না মেনে ডিক্রি দেয়, তবে সংক্ষুব্ধ বিবাদী জেলা জজ আদালত কিংবা হাইকোর্ট বিভাগে দেওয়ানি রিভিশন দায়ের করতে পারেন।
- সহ-শরিকদের ক্ষেত্রে বাটোয়ারা মোকদ্দমা: যদি বিবাদী একজন সহ-শরিক হন, তবে তিনি বিজ্ঞ আদালতে দেওয়ানি কার্যবিধির অধীনে বাটোয়ারা মোকদ্দমা (Partition Suit) দায়ের করে নিজ অংশের হিস্যা অনুযায়ী পৃথক সহমালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।
৫. সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক নজিরসমূহ (Landmark Judicial Precedents)
- সোলেমান বনাম ইসমাইল (48 DLR 167): হাইকোর্ট বিভাগ সুস্পষ্টভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, ৯ ধারার বিচারে একমাত্র বিচার্য বিষয় হলো বাদীর পূর্ব দখল এবং বলপূর্বক বেদখল। বিবাদী শতভাগ বৈধ মালিক হলেও ৯ ধারার মামলায় তার স্বত্বের দলিল অপ্রাসঙ্গিক ও অগ্রাহ্য।
- লিয়াকত আলী বনাম মজিবুর রহমান (30 DLR 139): আদালত পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, ৯ ধারার ডিক্রি কোনো পক্ষের স্বত্ব বা স্বত্বাধিকার ক্ষুণ্ণ করে না। সংক্ষুব্ধ পক্ষ অবিলম্বে ৮ ধারায় স্বত্ব প্রমাণের মাধ্যমে দখল দাবি করতে পারেন।
- রহিম বক্স বনাম আব্দুল কাদের (22 DLR 588): সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে, ৯ ধারার ডিক্রি সম্পূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রকৃতির হওয়ায় এর বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি আপিল চলে না; একমাত্র প্রতিকার রিভিশন অথবা নিয়মিত স্বত্বের মোকদ্দমা।
৬. উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৯ ধারায় বিবাদীর স্বত্বের দাবি সম্পূর্ণরূপে অচল ও অগ্রাহ্য। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে সমাজ ও রাষ্ট্রের শৃঙ্খলার পরিপন্থী গণ্য করে বলেই ৯ ধারা মালিকের স্বত্বকে সাময়িকভাবে উপেক্ষা করে শান্তিপূর্ণ পূর্ব দখলকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। তবে প্রকৃত মালিকের জন্য ৮ ধারায় নিয়মিত মামলার দরজা সর্বদা উন্মুক্ত থাকে।
📌 সম্পর্কিত আইনি প্রস্তুতি ও সহায়িকা লিংক:
- ২০১৪ সালের বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষার সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ মডেল সমাধান দেখুন
- দেওয়ানী কার্যবিধি (CPC) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা ও আইনি আলোচনা
- বার কাউন্সিল ও জুডিশিয়ারি দেওয়ানী কার্যবিধি (CPC) অনলাইন মডেল টেস্ট দিন
- বার কাউন্সিল বিগত সকল লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নব্যাংক ও ১০০% পূর্ণাঙ্গ সমাধান ব্যাংক

