আত্মরক্ষার অধিকারের পরিধি, সীমাবদ্ধতা এবং মৃত্যু ঘটানোর শর্তসমূহ (দণ্ডবিধি ৯৬-১০৬ ধারা) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০১২

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১২: দণ্ডবিধি, ১৮৬০

প্রশ্ন: ১১ ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার অধিকার (Right of Private Defence) বলিতে কি বুঝায়? কোন কোন পরিস্থিতিতে দেহ রক্ষার এবং সম্পত্তি রক্ষার ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করিয়া আক্রমণকারীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটানো যায় (দণ্ডবিধির ১০০ ও ১০৩ ধারা)? আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের সংবিধিবদ্ধ সীমাবদ্ধতাসমূহ (৯৯ ধারা) সুপ্রিম কোর্টের নজিরসহ বিস্তারিত আলোচনা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]

১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও আত্মরক্ষার আইনি দর্শন

দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (The Penal Code, 1860)-এর ধারা ৯৬ হতে ১০৬ পর্যন্ত ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার অধিকারের সুদূরপ্রসারী বিধান বিধিবদ্ধ হয়েছে। দণ্ডবিধির ৯৬ ধারায় একটি দ্ব্যর্থহীন মূলনীতি ঘোষণা করা হয়েছে—“Nothing is an offence which is done in the exercise of the right of private defence.” (ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগে কৃত কোনো কাজই অপরাধ নয়)। আইন কখনোই কোনো সুস্থ নাগরিককে কাপুরুষ বা নিরীহ বলি হতে বাধ্য করে না। রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনী প্রতিটি নাগরিকের পেছনে প্রতি সেকেন্ডে পাহারা দিতে পারে না; তাই আসন্ন বেআইনি আক্রমণের মুখে নিজের বা অন্যের জীবন এবং সম্পত্তি রক্ষায় তাৎক্ষণিক বলপ্রয়োগের জন্মগত ও সংবিধিবদ্ধ অধিকার রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে।

২. দেহ রক্ষার্থে আক্রমণকারীর মৃত্যু ঘটানোর ৬টি ক্ষেত্র (Section 100 Penal Code)

দণ্ডবিধির ১০০ ধারা অনুযায়ী নিম্নোক্ত ৬টি পরিস্থিতির যে কোনো একটিতে আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে আত্মরক্ষাকারী ব্যক্তি আক্রমণকারীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে এবং এর জন্য সে খুনের দায়ে দায়ী হবে না:

  1. এমন কোনো আক্রমণ যার ফলে আত্মরক্ষাকারীর মনে যুক্তিসঙ্গত আতঙ্ক বা আশঙ্কা জন্মায় যে অন্যথায় তার মৃত্যু অনিবার্য;
  2. এমন কোনো আক্রমণ যার ফলে গুরুতর আঘাত বা জখম (Grievous Hurt) ঘটার যুক্তিসঙ্গত আশঙ্কা জন্মায়;
  3. ধর্ষণ (Rape) সংঘটনের সুস্পষ্ট অভিপ্রায়ে কৃত কোনো আক্রমণ;
  4. অস্বাভাবিক কামতৃপ্তি (Unnatural Lust) চরিতার্থ করার অভিপ্রায়ে আক্রমণ;
  5. অপহরণ বা মানুষ চুরি (Kidnapping or Abduction) করার উদ্দেশ্যে কৃত আক্রমণ;
  6. এমন কোনো পরিস্থিতিতে কাউকে বেআইনিভাবে অবরুদ্ধ বা আটক (Wrongful Confinement) করা যার ফলে ভিকটিম যুক্তিযুক্তভাবে মনে করে যে সে আত্মমুক্তির জন্য সরকারি কর্তৃপক্ষের সাহায্য লাভে সক্ষম হবে না।

৩. সম্পত্তি রক্ষার্থে আক্রমণকারীর মৃত্যু ঘটানোর ৪টি ক্ষেত্র (Section 103 Penal Code)

দণ্ডবিধির ১০৩ ধারা অনুযায়ী সম্পত্তি রক্ষার অধিকার প্রয়োগ করে নিম্নোক্ত ৪টি সুনির্দিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীর মৃত্যু ঘটানো আইনত সম্পূর্ণ বৈধ:

  1. ডাকাতি (Robbery / Dacoity): প্রকাশ্য বলপ্রয়োগে বা অস্ত্র উঁচিয়ে ডাকাতি সংঘটনকালে;
  2. রাত্রিকালীন ঘরে সিঁধ কাটা (House-breaking by night): সূর্যাস্তের পর এবং সূর্যোদয়ের পূর্বে জোরপূর্বক ঘরে প্রবেশকালে;
  3. বাসগৃহ, তাঁবু বা জাহাজে অগ্নিসংযোগ: মানুষ বসবাসের স্থানে বা সম্পত্তি সংরক্ষণের স্থানে অগ্নিসংযোগ বা বিস্ফোরণ ঘটানোকালে;
  4. চুরি, অপকৃতি বা অনধিকার প্রবেশ: এমন পরিস্থিতিতে চুরি, ক্ষতি বা গৃহপ্রবেশ যেখানে ভিকটিমের মনে যুক্তিসঙ্গত আতঙ্ক জন্মায় যে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাত না ঘটালে আক্রমণকারী তার নিজের জীবন হরণ করবে।

৪. আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের ৩টি সংবিধিবদ্ধ সীমাবদ্ধতা (Section 99 Penal Code)

দণ্ডবিধির ৯৯ ধারায় আত্মরক্ষার অধিকারের ওপর অত্যন্ত কঠোর সংবিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। এই শর্তগুলো লঙ্ঘিত হলে আত্মরক্ষার অজুহাত গ্রহণযোগ্য হয় না:

  • সরকারি কর্মচারীর সরল বিশ্বাসে কাজ: কোনো সরকারি কর্মচারী যদি আইনসম্মতভাবে নিজের ক্ষমতার আওতায় সরল বিশ্বাসে কোনো কাজ করে এবং তাতে মৃত্যুর আশঙ্কা না থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করা যায় না।
  • সরকারি কর্তৃপক্ষের সাহায্য লাভের সুযোগ (Recourse to Public Authorities): যদি এমন পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকে যেখানে আক্রমণকারীকে বলপ্রয়োগ না করে সময়মতো পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্য গ্রহণ করা সম্ভব ছিল, সেখানে আত্মরক্ষার অধিকার থাকে না।
  • প্রয়োজনের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (No more harm than necessary): আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য যতটুকু বলপ্রয়োগ প্রয়োজন ছিল, তার চেয়ে একবিন্দুও বেশি আঘাত করা যাবে না। যেমন লাঠির আঘাতের জবাবে বন্দুক দিয়ে গুলি করে বুক ঝাঁজরা করে দেওয়া আত্মরক্ষার অধিকারের সীমা লঙ্ঘন।

৫. আত্মরক্ষার অধিকারের সূচনা ও সমাপ্তি (Sections 102 & 105)

আক্রমণের সূচনা বা শারীরিক বিপদের যুক্তিসঙ্গত আশঙ্কা জন্মানোর সাথে সাথেই আত্মরক্ষার অধিকার শুরু হয় এবং যতদিন উক্ত বিপদের বাস্তব আশঙ্কা বলবৎ থাকে ততদিন এই অধিকার বজায় থাকে। আক্রমণকারী যদি অস্ত্র ফেলে পিছু হটে বা পালিয়ে যায়, তবে সাথে সাথে আত্মরক্ষার অধিকার বিলুপ্ত হয়ে যায়। পলায়নপর আক্রমণকারীকে পেছন থেকে গুলি বা কোপ মারা আইনের চোখে সরাসরি খুন হিসেবে গণ্য হবে।

৬. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ (Landmark Case Laws)

  • আব্দুল কুদ্দুস বনাম রাষ্ট্র (42 DLR 31): হাইকোর্ট বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, আত্মরক্ষার অধিকার কোনো আক্রমণাত্মক অধিকার নয়, এটি বিশুদ্ধ আত্মরক্ষামূলক ঢাল। বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে কোনো ব্যক্তির ওজন মাপার নিক্তি নিয়ে আঘাতের পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়; বিচারককে সমগ্র পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে।
  • হাসান আলী বনাম রাষ্ট্র (38 DLR (AD) 124): আপিল বিভাগ রায় দেন যে, আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগকালে অতিরিক্ত সীমা লঙ্ঘন ঘটলে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে ৩০০ ধারার ২ নং ব্যতিক্রমের অধীনে ৩০৪ ধারার ১ম অংশে সাজা প্রদান আইনসম্মত।

৭. উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, দণ্ডবিধির ৯৬-১০৬ ধারায় আত্মরক্ষার অধিকারের পরিধি ও সীমাবদ্ধতা আইনের শাসন ও নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতার অনন্য সমন্বয়। এটি নির্দোষ নাগরিককে জীবনের সংকট মুহূর্তে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার বৈধ অস্ত্র প্রদান করে, কিন্তু ৯৯ ধারার মাধ্যমে এর স্বেচ্ছাচারী অপব্যবহার রোধ করে সমাজের শান্তি রক্ষা নিশ্চিত করে।

৫.১. আত্মরক্ষার অধিকার প্রমাণের সাক্ষ্যগত দায়ভার (Burden of Proof – Section 105 Evidence Act)

সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ১০৫ ধারা অনুযায়ী—ফৌজদারি বিচারে আদালত সাধারণ নিয়মে অনুমান করবেন যে কোনো বিশেষ ব্যতিক্রম বিদ্যমান নেই। যে ব্যক্তি আত্মরক্ষার অধিকারের দাবি তুলবে, সেই অধিকারের বাস্তব অস্তিত্ব প্রমাণের প্রাথমিক দায়ভার আসামির ওপর বর্তায়। তবে প্রসিকিউশনের মতো আসামিকে শতভাগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয় না; আসামিকে কেবল পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য দ্বারা “Preponderance of Probability” (সম্ভাবনার ভারসাম্য) প্রতিষ্ঠা করলেই বিজ্ঞ আদালত আত্মরক্ষার পূর্ণ সুবিধা প্রদান করে আসামিকে খালাস দেন (আব্দুল কুদ্দুস বনাম রাষ্ট্র, 42 DLR 31)।

Related Articles

Back to top button