দায়রা জজ ও হাইকোর্টের রিভিশন ক্ষমতা এবং খালাস রদ করে শাস্তির বিধান – বার কাউন্সিল ২০১১
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১১: প্রশ্ন ৮ এর পূর্ণাঙ্গ মডেল সমাধান
১. ফৌজদারি রিভিশনের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য
ফৌজদারী কার্যবিধি, ১৮৯৮ (CrPC)-এর ৪৩৫, ৪৩৯ এবং ৪৩৯এ ধারায় রিভিশন এখতিয়ারের বিধান রয়েছে। অধস্তন আদালতের প্রদত্ত কোনো আদেশ, রায় বা কার্যধারার সঠিকতা (Correctness), বৈধতা (Legality) বা ঔচিত্য (Propriety) পরীক্ষা করার জন্যই রিভিশনাল ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়। যেখানে আপিলের কোনো বিধান থাকে না, সেখানেই সংক্ষুব্ধ পক্ষের প্রধান আশ্রয় হলো রিভিশন।
২. দায়রা জজ ও হাইকোর্ট বিভাগের রিভিশনাল ক্ষমতা
ক) নথিপত্র তলবের ক্ষমতা (ধারা ৪৩৫):
হাইকোর্ট বিভাগ অথবা দায়রা জজ তাদের অধস্তন যেকোনো ফৌজদারি আদালতের কার্যধারার শুদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য যেকোনো মামলার নথি তলব ও নিরীক্ষণ করতে পারেন এবং প্রয়োজনবোধে আসামিকে জামিনে মুক্তির আদেশ দিতে পারেন।
খ) হাইকোর্ট বিভাগের রিভিশন ক্ষমতা (ধারা ৪৩৯):
- হাইকোর্ট বিভাগ রিভিশনে আপিল আদালতের যাবতীয় ক্ষমতা (ধারা ৪২৩, ৪২৬, ৪২৭ এবং ৪২৮ অনুযায়ী) প্রয়োগ করতে পারেন।
- আদালত দণ্ডাদেশ কমাতে বা বাড়াতে পারেন (Enhancement of sentence), তবে আসামিকে কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়ে দণ্ড বাড়ানো যায় না।
- আদালত অধস্তন আদালতের অবৈধ আদেশ বাতিল করতে পারেন এবং নতুন করে বিচারের নির্দেশ (Retrial) দিতে পারেন।
গ) দায়রা জজের রিভিশন ক্ষমতা (ধারা ৪৩৯এ):
- ১৯৭৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনের মাধ্যমে দায়রা জজকে রিভিশনের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগের অনুরূপ পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।
- তবে ৪৩৯এ(২) ধারা অনুযায়ী দায়রা জজ কর্তৃক রিভিশন নিষ্পত্তি হলে উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে দ্বিতীয় রিভিশন দায়ের আইনত বারিত (Bar on second revision)।
৩. রিভিশন আদালত কি খালাসের আদেশ রদপূর্বক সরাসরি শাস্তি প্রদান করতে পারেন?
না, রিভিশন আদালত খালাসের আদেশ বাতিল করে আসামিকে সরাসরি দণ্ডাদেশ প্রদান করতে পারেন না।
এটি ফৌজদারী কার্যবিধির একটি সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা। ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৩৯(৪) ধারায় দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে:
“Nothing in this section shall be deemed to authorise a High Court Division to convert a finding of acquittal into one of conviction.”
রিভিশন আদালতের করণীয় বিকল্পসমূহ:
- যদি রিভিশন আদালত মনে করেন যে নিম্ন আদালত কর্তৃক প্রদত্ত খালাসের আদেশটি সম্পূর্ণ অবৈধ, বিচারিক নীতিবহির্ভূত বা সাক্ষ্য-প্রমাণ এড়িয়ে যাওয়ার কারণে ন্যায়বিচার ভূলুণ্ঠিত হয়েছে, তবে রিভিশন আদালত উক্ত খালাসের আদেশটি বাতিল (Set aside) করতে পারেন।
- খালাস বাতিল করে আদালত মামলাটি নিম্ন আদালতে পুনর্বিচারের (Retrial) জন্য ফেরত পাঠাতে পারেন অথবা আসামিকে কমিট করার নির্দেশ দিতে পারেন।
- কিন্তু রিভিশন আদালত নিজে সরাসরি আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে কোনো জেল বা জরিমানার দণ্ড আরোপ করতে পারেন না। খালাসের বিরুদ্ধে সরাসরি শাস্তি পেতে হলে সরকারকে ফৌজদারী কার্যবিধির ৪১৭ ধারা মোতাবেক ‘খালাসের বিরুদ্ধে আপিল’ (Appeal against Acquittal) দায়ের করতে হয়।
৪. উচ্চ আদালতের নজিরসমূহ
- Akkel Ali vs. State (39 DLR AD 229): রিভিশন আদালত কোনো অবস্থাতেই খালাসের রায়কে সরাসরি দণ্ডাদেশে রূপান্তর করতে পারে না। এরূপ রূপান্তর ৪৩৯(৪) ধারার সরাসরি লঙ্ঘন।
- Abdul Khaleque vs. The State (46 DLR 188): খালাসের আদেশ স্পষ্টত বেআইনি হলে রিভিশন আদালত তা বাতিলপূর্বক উপযুক্ত অধস্তন আদালতে নতুন করে সাক্ষ্য গ্রহণ বা পুনর্বিচারের আদেশ প্রদান করতে পারেন।
৫. উপসংহার
রিভিশন ক্ষমতা অত্যন্ত উচ্চমানের তত্ত্বাবধানমূলক এখতিয়ার। এটি বিচারিক ত্রুটি সংশোধনের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে, তবে আইনের নির্ধারিত সীমা মেনে রিভিশন আদালত কখনো আপিল আদালতের মতো খালাসকে সরাসরি শাস্তিতে পরিণত করতে পারে না।
📌 সম্পর্কিত আইনি প্রস্তুতি ও সহায়িকা লিংক:
- ২০১১ সালের বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষার সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ মডেল সমাধান দেখুন
- ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা ও আইনি আলোচনা
- বার কাউন্সিল ও জুডিশিয়ারি ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) অনলাইন মডেল টেস্ট দিন
- বার কাউন্সিল বিগত সকল লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নব্যাংক ও ১০০% পূর্ণাঙ্গ সমাধান ব্যাংক
