দখল প্রমাণে ব্যর্থ হলে স্বত্ব ঘোষণার মামলা অচল: ৪২ ধারার বিধানে হাইকোর্টের রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ডিভিশন বেঞ্চ প্রথম আপিল শুনানিতে এক সুনির্দিষ্ট নীতি ঘোষণা করেছেন যে, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারার (Section 42 of the Specific Relief Act, 1877) অধীন স্বত্ব ঘোষণার মামলায় বাদীকে বৈধ স্বত্বের পাশাপাশি জমিতে বাস্তব ও নিরঙ্কুশ দখল (Physical Possession) সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে। জমিতে দখল না থাকা সত্ত্বেও যদি খাস দখলের প্রার্থনা না করে নিছক স্বত্ব ঘোষণার মামলা করা হয়, তবে তা ৪২ ধারার শর্তাংশ (Proviso to Section 42) দ্বারা সরাসরি বারিত হবে এবং মোকদ্দমাটি সরাসরি খারিজযোগ্য। যদিও ২০০৫ সালের পর রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭(১)(কক) ধারা মোতাবেক মুসলিম আইনের মৌখিক হেবা সম্পূর্ণ অবৈধ ও অকার্যকর, তথাপি প্রতিপক্ষের দলিলের ত্রুটি দেখিয়ে বাদী নিজের দখল ছাড়া স্বত্ব ঘোষণার একতরফা ডিক্রি পেতে পারে না।
মামলাটি কুমিল্লা জেলার অতিরিক্ত যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ২০১৯ সালে দায়েরকৃত স্বত্ব মোকদ্দমা Title Suit No. 132 of 2019 থেকে উদ্ভূত। নালিশি ৩৯ শতক জমির মূল মালিক ছিলেন আছিয়া খাতুন।
মামলার মূল প্রেক্ষাপট ও ঘটনাবলী নিম্নরূপ:
- আছিয়া খাতুনের ওয়ারিশ ও বাদীদের আরজি: আছিয়া খাতুন মোট ৪৯ শতক জমির মালিক ছিলেন। তিনি মৃত্যুবরণ করার পর ওয়ারিশ হিসেবে দুই পুত্র (১ নম্বর বাদী মোশাররফ হোসেন ও ২ নম্বর বিবাদী) এবং তিন কন্যা (২-৪ নম্বর বাদীগণ) রেখে যান। বাদীপক্ষের দাবি, তারা ওয়ারিশসূত্রে নালিশি ৩৯ শতক জমির মালিক ও দখলে আছেন এবং তাদের আমমোক্তার কবির হোসেনের মাধ্যমে জমিতে দখল পরিচালনা করছেন।
- মৌখিক হেবা ও ধারাবাহিক কবলা হস্তান্তর: ২ নম্বর বিবাদী (অপর ভাই) দাবি করেন যে, তার মা আছিয়া খাতুন ২০০৬ সালের ১ জুন তাকে মৌখিকভাবে এবং নোটারি পাবলিকের এফিডেভিটের মাধ্যমে জমি হেবা করে দিয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি নিজ নামে নামজারি করিয়ে ২০১৩ সালের ৯ অক্টোবর তার স্ত্রীর (১ নম্বর বিবাদী) অনুকূলে হেবা দলিল সম্পাদন করেন। সেই স্ত্রী আবার ২০১২ ও ২০১৪ সালে দুটি রেজিস্ট্রি কবলা দলিলের মাধ্যমে ২৭ শতক জমি ৩ নম্বর বিবাদী মোহাম্মদ জিন্নাহ মিয়ার কাছে বিক্রি করে দখল বুঝিয়ে দেন।
- দলিল বাতিল ও স্বত্ব ঘোষণার মোকদ্দমা: বাদীরা ২০১৯ সালে আমমোক্তার কবির হোসেনের মাধ্যমে যুগ্ম জেলা জজ আদালতে Title Suit No. 132 of 2019 দায়ের করে ৩৯ শতক জমিতে স্বত্ব ঘোষণা এবং বিবাদীগণের হেবা ও কবলা দলিলসমূহ বেআইনি, অকার্যকর ও তাদের ওপর বাধ্যকর নয় মর্মে ঘোষণার প্রার্থনা জানান।
- ট্রায়াল কোর্টের ডিক্রি প্রদান: যুগ্ম জেলা জজ, অতিরিক্ত আদালত, কুমিল্লা ২০২০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মৌখিক হেবা অবৈধ গণ্য করে বাদীদের পক্ষে মামলাটি পূর্ণ ডিক্রি প্রদান করেন।
- হাইকোর্টে খরিদ্দার বিবাদীর প্রথম আপিল: বিচারিক আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে জমির খরিদ্দার ও দখলদার ৩ নম্বর বিবাদী মোহাম্মদ জিন্নাহ মিয়া গং হাইকোর্ট বিভাগে First Appeal No. 49 of 2021 দায়ের করেন।
🏛️ বাদী মোশাররফ হোসেন গং-এর যুক্তি
- ২০০৬ সালের মৌখিক হেবা সম্পূর্ণ বাতিল: ২০০৫ সালের সংশোধিত রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭(১)(কক) ধারা অনুযায়ী রেজিস্ট্রি দলিল ছাড়া মৌখিক হেবার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। নোটারি এফিডেভিট দিয়ে স্বত্ব জন্মায় না।
- অবৈধ বিক্রেতার নিকট থেকে খরিদ অকার্যকর: ২ নম্বর বিবাদী নিজে যেখানে স্বত্বহীন ছিলেন, সেখানে তার স্ত্রী বা পরবর্তী ক্রেতা ৩ নম্বর বিবাদী কখনোই বৈধ স্বত্ব পেতে পারে না।
- ওয়ারিশান স্বত্ব ও নামজারি: আছিয়া খাতুনের মৃত্যুর পর ওয়ারিশ হিসেবে বাদীরা নামজারি জমাভাগ করিয়েছেন এবং তারা জমিতে স্বত্বাধিকারী হিসেবে বহাল আছেন।
🛡️ আপিলকারী খরিদ্দার বিবাদী জিন্নাহ মিয়ার যুক্তি
- সরল বিশ্বাসে মূল্যবান খরিদ্দার (Bona fide Purchaser): তিনি রেজিস্ট্রি কবলা দলিলের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করে ২৭ শতক জমি কিনে ভোগদখলে আছেন।
- বাদীদের দখলে না থাকা ও ৪২ ধারার বাধা: বাদীরা নালিশি জমিতে দখলে নেই। দখল ছাড়া নিছক স্বত্ব ঘোষণার মামলা সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারার শর্তানুসারে অচল।
- সাক্ষ্যে চরম ব্যর্থতা ও আমমোক্তারনামার ত্রুটি: আরজিতে বর্ণিত আমমোক্তার কবির হোসেন সাক্ষ্য দেননি। কোনো মূল বাদী আদালতে আসেনি এবং বাদীদের সাক্ষীরা জেরায় পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে।
আপিল শুনানিকালে হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ ট্রায়াল কোর্টের নথিপত্র এবং সাক্ষ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখেন। সেখানে বাদীপক্ষের মামলায় একাধিক মারাত্মক পদ্ধতিগত ও বস্তুগত ত্রুটি ধরা পড়ে:
- আমমোক্তার কবির হোসেনের সাক্ষ্য না দেওয়া: আরজির ৫ নম্বর প্যারায় বাদীরা দাবি করেন যে, তাদের নিযুক্ত আমমোক্তার মো: কবির হোসেনের মাধ্যমে তারা জমিতে দখলে আছেন। কিন্তু সেই কবির হোসেন আদালতে এসে বাদীদের পক্ষে কাঠগড়ায় কোনো সাক্ষ্যই প্রদান করেননি!
- সাক্ষী আবুল কাশেমের (PW-1) ক্ষমতার ঘাটতি: বাদীদের পক্ষে আবুল কাশেম নামক এক ব্যক্তি আমমোক্তারনামা (Exhibit-12) দেখিয়ে সাক্ষ্য দেন। কিন্তু সেই আমমোক্তারনামাটি পরীক্ষা করে দেখা যায়— সেটি কেবল ১ নম্বর বাদী মোশাররফ হোসেন একাই সম্পাদন করেছিলেন; ২-৫ নম্বর বাদীগণ তাকে কোনো ক্ষমতাই প্রদান করেননি। তদুপরি, পাঁচজন বাদীর কেউই আদালতে এসে সাক্ষ্য দেননি।
- দখলের বিষয়ে সাক্ষীদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য: আরজিতে বলা হয়েছে কবির হোসেনের মাধ্যমে দখল; কিন্তু ২ নম্বর সাক্ষী (PW-2) কামাল মিয়া বলেন জমি জাকির হোসেনের মাধ্যমে দখলে আছে। আবার ৩ নম্বর সাক্ষী শহীদ মিয়া বলেন জমি জাকির হোসেনকে পত্তন দেওয়া হয়েছে। সেই কথিত পত্তনদার জাকির হোসেনকেও আদালতে সাক্ষী হিসেবে আনা হয়নি। ফলে বাদীদের দখলে থাকার দাবি সম্পূর্ণ ভুয়া ও অপ্রমাণিত প্রমাণিত হয়।
মাননীয় বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান এবং মাননীয় বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদীর ডিভিশন বেঞ্চ সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ও রেজিস্ট্রেশন আইনের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন:
ক. ৪২ ধারার অপরিহার্য শর্ত— স্বত্ব ও দখল উভয়ই প্রমাণ বাধ্যতামূলক:
হাইকোর্ট রায়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে নীতি নির্ধারণ করেন: “In a suit under Section 42 of the Specific Relief Act, 1877 the plaintiff is required to prove valid title as well as possession in the disputed land. In spite of having lawful title if the plaintiffs fail to prove possession in disputed land the suit for declaration of title shall be hit by Section 42 of the Specific Relief Act, 1877 and liable to be dismissed.” জমিতে প্রতিপক্ষের দখল থাকলে খাস দখলের প্রতিকার ছাড়া শুধু ঘোষণার ডিক্রি দেওয়া আইনের বরখেলাপ।
খ. ১৭(১)(কক) ধারায় মৌখিক হেবা বাতিল হলেও বাদীর স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রমাণের আবশ্যকতা:
হাইকোর্ট দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, ২০০৫ সালের সংশোধিত Registration Act, 1908-এর Section 17(1)(aa) অনুযায়ী মুসলিম হেবা ঘোষণা বাধ্যতামূলকভাবে রেজিস্ট্রি হতে হবে। ২০০৬ সালের ১ জুনের কথিত মৌখিক হেবা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং তা ২ নম্বর বিবাদীকে কোনো স্বত্ব দেয়নি। কিন্তু আইনের প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো— বাদীকে নিজের পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে মামলা প্রমাণ করতে হবে (Plaintiff must stand on the strength of his own case); বিবাদীর হেবা অবৈধ হলেও বাদী যদি নিজের দখল প্রমাণে ব্যর্থ হয়, তবে দেওয়ানী আদালত তাকে স্বত্ব ঘোষণার ডিক্রি দিতে পারে না।
গ. সঠিক প্রতিকার ছিল সমগ্র জমির বাটোয়ারা মোকদ্দমা:
যেহেতু ২ নম্বর বিবাদী উত্তরাধিকারসূত্রে আছিয়া খাতুনের সম্পত্তিতে ১০ শতকের বৈধ মালিক ছিলেন এবং তিনি জিন্নাহ মিয়ার কাছে জমি বিক্রি করেছেন, সেহেতু বাদীদের উচিত ছিল সম্পূর্ণ ৪৯ শতক জমি অন্তর্ভুক্ত করে বাটোয়ারা মামলা (Partition Suit) করা। ভুল পদ্ধতিতে একতরফাভাবে স্বত্ব ঘোষণার মামলা করে ডিক্রি নেওয়ার ট্রায়াল কোর্টের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বেআইনি ছিল।
- প্রথম আপিল মঞ্জুর (First Appeal Allowed): খরিদ্দার বিবাদী মোহাম্মদ জিন্নাহ মিয়ার দায়েরকৃত প্রথম আপিলটি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মঞ্জুর করা হলো।
- ট্রায়াল কোর্টের ডিক্রি বাতিল ও মামলা খারিজ: কুমিল্লা অতিরিক্ত যুগ্ম জেলা জজ আদালত কর্তৃক প্রদত্ত Title Suit No. 132 of 2019-এর রায় ও ডিক্রি সম্পূর্ণ বাতিল করা হলো এবং বাদীদের মূল স্বত্ব মোকদ্দমাটি সরাসরি খারিজ করা হলো।
- ওয়ারিশদের বাটোয়ারা মামলা দায়েরের স্বাধীনতা: আছিয়া খাতুনের সন্তানরা যদি আইনগত পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত মনে করেন, তবে তারা নালিশি সম্পূর্ণ ৪৯ শতক সম্পত্তির ওপর নিয়মিত বাটোয়ারা মোকদ্দমা (Partition Suit) দায়েরের পূর্ণ স্বাধীনতায় বহাল থাকবেন।
১. দখল ছাড়া ৪২ ধারার মামলা অচল
দখল প্রমাণ করতে না পারলে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারার শর্তানুসারে কেবল স্বত্ব ঘোষণার মামলা আইনত খারিজযোগ্য।
২. ২০০৫ পরবর্তী মৌখিক হেবা বাতিল
রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭(১)(কক) ধারা অনুযায়ী রেজিস্ট্রি দলিল ছাড়া মৌখিক হেবা বা এফিডেভিট দিয়ে কোনো বৈধ স্বত্ব অর্জিত হয় না।
৩. আমমোক্তারনামায় সকলের অনুমোদন আবশ্যক
একাধিক বাদীর মামলায় একজনের দেওয়া পাওয়ার দিয়ে অন্য বাদীদের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া যায় না; মূল বাদীদের সাক্ষ্য না দেওয়া মামলায় মারাত্মক ত্রুটি।
৪. স্বত্ব বনাম বাটোয়ারার প্রভেদ
ওয়ারিশান সম্পত্তির অংশীদারিত্ব নিয়ে বিরোধ থাকলে শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা না করে সমগ্র সম্পত্তির বাটোয়ারা করাই যথাযথ আইনানুগ পথ।
জমিতে প্রতিপক্ষের দখল থাকলে শুধুমাত্র স্বত্ব ঘোষণার মামলা করবেন না; আরজিতে কোর্ট ফি দিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮/৯ ধারায় খাস দখল ও উচ্ছেদের অনুবর্তী প্রতিকার (Consequential Relief) প্রার্থনা করুন।
রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭(১)(কক) ধারা অনুসারে মৌখিক হেবা সম্পূর্ণ মূল্যহীন; নোটারি পাবলিকের হলফনামা দিয়েও এই অবৈধতা মোছা যায় না।
একজন বাদীর দেওয়া পাওয়ার দিয়ে অন্য বাদীদের পক্ষ হয়ে কোনো ব্যক্তি সাক্ষ্য দিতে পারে না; সকল বাদীর ক্ষমতা অর্পণপত্র নিখুঁত রাখুন।
আরজিতে যার মাধ্যমে ভোগদখল দাবি করবেন (আমমোক্তার বা বর্গা চাষী), তাকেই আদালতে নিয়ে এসে প্রমাণ করুন; অন্যথায় বয়ানের স্ববিরোধিতায় মামলা খারিজ হয়ে যাবে।
শরিকদের মধ্যে জমির হস্তান্তর ও হিস্যা নিয়ে জটিলতা থাকলে আলাদা আলাদা স্বত্ব ঘোষণার মামলা না করে সমস্ত এজমালি জমি একজোট করে বাটোয়ারা মোকদ্দমা দায়ের করুন।

