প্লিডিংসের মূলনীতি: ঘটনা উল্লেখ করতে হবে আইন বা সাক্ষ্য নয় (CPC Order VI Rule 2) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২০

📌 বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২০ | দেওয়ানী কার্যবিধি

প্রশ্ন ১। (ক): “The pleadings should contain facts and not law or evidence.” একটি আদর্শ প্লিডিংস এর বৈশিষ্ট্য উল্লেখপূর্বক মন্তব্যটি The Code of Civil Procedure, 1908 এর Order-VI এর আলোকে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করুন।

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

দেওয়ানী মামলার ভিত্তি রচিত হয় প্লিডিংস (আরজি ও লিখিত বর্ণনা)-এর মাধ্যমে। প্লিডিংসের মূল উদ্দেশ্য হলো বিরোধীয় পক্ষসমূহের দাবি ও আত্মপক্ষ সমর্থনের পরিধি সুস্পষ্টভাবে আদালতের সামনে তুলে ধরা, যাতে কোনো পক্ষই শুনানির সময় অপ্রস্তুত না থাকে। The Code of Civil Procedure, 1908-এর Order VI, Rule 2-এ প্লিডিংসের যে সুবর্ণ মূলনীতি ঘোষণা করা হয়েছে—“Pleading shall contain and contain only, a statement in a concise form of the material facts on which the party pleading relies for his claim or defense, but not the evidence by which they are to be proved”—উক্ত মন্তব্যটির গভীর তাৎপর্য ও একটি আদর্শ প্লিডিংসের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করাই অত্র প্রশ্নের মূল লক্ষ্য।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী

  • The Code of Civil Procedure, 1908:
    • Order VI, Rule 1: প্লিডিংসের সংজ্ঞা (Pleading shall mean Plaint or Written Statement)।
    • Order VI, Rule 2: উপাদানগত ঘটনা উল্লেখের সাধারণ নীতি, আইন বা সাক্ষ্য বাদ দেওয়া।
    • Order VI, Rule 4: বিশেষ ক্ষেত্রে (প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব) বিশদ বিবরণ (Particulars) প্রদানের বাধ্যবাধকতা।
    • Order VI, Rule 16: অপ্রাসঙ্গিক বা অপবাদমূলক বক্তব্য কর্তন (Striking out pleadings)।
    • Order VI, Rule 17: প্লিডিংস সংশোধনের ক্ষমতা (Amendment of pleadings)।

৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও গভীর আইনি ব্যাখ্যা

প্লিডিংস প্রণয়নের ৪টি মৌলিক স্বর্ণসূত্র নিম্নে বিশদভাবে পর্যালোচনা করা হলো:

  1. কেবল ঘটনা বর্ণনা করতে হবে, আইন নয় (Plead Facts, Not Law): পক্ষগণ কেবল তাদের মামলার মূল বাস্তব ঘটনা বা ঘটনার পারম্পর্য উল্লেখ করবেন। কোনো ঘটনার ওপর কোন আইন বা কোন ধারা প্রযোজ্য হবে, তা নির্ধারণ ও প্রয়োগ করা বিজ্ঞ আদালতের এখতিয়ার ও দায়িত্ব (Court takes judicial notice of law)। উদাহরণস্বরূপ, বাদী বলবেন যে বিবাদী তার সম্পত্তিতে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করে দখল করেছে; কিন্তু “বিবাদী trespasser হিসেবে গণ্য হবে” বা দেওয়ানী কার্যবিধির অমুক ধারায় মামলা করা হলো—এরূপ আইনগত যুক্তি প্লিডিংসে লেখা অনাবশ্যক।
  2. উপাদানগত তথ্য উল্লেখ করতে হবে (Material Facts Only – Facta Probanda): যে তথ্যের ওপর বাদীর মামলার কারণ (Cause of Action) অথবা বিবাদীর আত্মপক্ষ সমর্থনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত, তাকেই Material Facts বা উপাদানগত ঘটনা বলে। অপ্রয়োজনীয় ভূমিকা, ঘটনার পূর্বাপর পারিবারিক ইতিহাস বা অপ্রাসঙ্গিক বিবরণ প্লিডিংসে আনা নিষিদ্ধ। উপাদানগত কোনো তথ্য বাদ পড়লে পরবর্তীতে তা প্রমাণের সুযোগ থাকে না।
  3. সাক্ষ্য-প্রমাণ উল্লেখ করা যাবে না (Not Evidence – Facta Probantia): উপাদানগত ঘটনা প্রমাণের জন্য যে সাক্ষ্য, দলিল বা মৌখিক সাক্ষ্য ব্যবহার করা হবে, তা প্লিডিংসে বিবৃত করা নিষিদ্ধ। যেমন—বাদী লিখতে পারেন যে “বিবাদী বাদীর নিকট জমি বিক্রির অঙ্গীকারে বায়না দলিল সম্পাদন করেছেন”—এটি Material Fact; কিন্তু “উক্ত বায়না দলিলের ১ নং সাক্ষী অমুক, ২ নং সাক্ষী অমুক এবং তারা রেজিস্ট্রি অফিসে দাঁড়িয়ে স্বাক্ষর দেখেছেন”—এরূপ সাক্ষ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ প্লিডিংসে দেওয়া চলবে না। সাক্ষ্য শুনানিকালে আদালতে উপস্থাপন করতে হবে।
  4. সংক্ষিপ্ত ও সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন (In a Concise Form): প্লিডিংস হতে হবে সংক্ষেপিত, স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট প্যারাগ্রাফে বিভক্ত। তারিখ, যোগফল ও সংখ্যা কথায় ও অংকে স্পষ্টভাবে লিখতে হবে (Order VI, Rule 2(2))।

একটি আদর্শ প্লিডিংসের আবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • সুনির্দিষ্ট কজ টাইটেল ও এখতিয়ার: আদালতের নাম, মোকদ্দমার নম্বর, পক্ষগণের নাম, পূর্ণ ঠিকানা ও মোকদ্দমার আঞ্চলিক ও আর্থিক এখতিয়ারের সুস্পষ্ট বিবরণ।
  • মোকদ্দমার কারণ উদ্ভব (Cause of Action): মোকদ্দমার কারণ কখন, কোথায় এবং কীভাবে সংঘটিত হয়েছিল তার সুনির্দিষ্ট তারিখ ও স্থান উল্লেখ।
  • প্রার্থিত প্রতিকার (Relief Claimed): স্পষ্টভাবে দাবিকৃত প্রতিকার (খাস দখল, চুক্তি বলবৎ, নিষেধাজ্ঞা বা ক্ষতিপূরণ) উল্লেখ করা।
  • সত্যায়ন ও যাচাইকরণ (Verification): আরজি বা লিখিত বর্ণনার শেষে বাদী বা বিবাদী কর্তৃক নিজ স্বাক্ষরে সত্যপাঠ (Verification Clause) সম্পাদন করা।

৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির

  • বীরেন্দ্র কাশিওয়ানা বনাম বিনায়ক জোশী (1999 1 SCC 534): প্লিডিংসে উপাদানগত তথ্য (Material facts) অনুপস্থিত থাকলে পক্ষগণ পরবর্তীতে কোনো প্রমাণের ওপর নির্ভর করতে পারেন না, কারণ পক্ষগণ তাদের প্লিডিংসের বাইরে যেতে পারেন না (Parties cannot travel beyond their pleadings)।
  • হাজী মফিজুর রহমান বনাম আব্দুল জলিল, ৪৬ ডিএলআর (ডিভিশন বেঞ্চ) ২১২: যদি কোনো পক্ষ প্লিডিংসে কোনো নির্দিষ্ট স্বত্ব বা দখলের সত্য বিবরণ উল্লেখ করতে ব্যর্থ হন, তবে পরবর্তীতে মৌখিক সাক্ষ্য দিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

৫. উপসংহার ও পরীক্ষকের দৃষ্টিতে ১০০/১০০ সারসংক্ষেপ

প্লিডিংস হলো দেওয়ানী বিচার কাঠামোর মেরুদণ্ড। একটি নির্ভুল প্লিডিংস মামলার মেধা নির্ধারণে এবং অপব্যয় ও হয়রানি রোধে আদালতের প্রধান সহায়ক হিসেবে কাজ করে। প্লিডিংসে আইন ও সাক্ষ্যের বাহুল্য বর্জন করে কেবল উপাদানগত তথ্য সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরাই একজন দক্ষ আইনজীবীর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

৪.১. প্লিডিংসের ৪টি সোনালী নীতি (The Four Golden Rules of Pleadings)

দেওয়ানি কার্যবিধির ৬ আদেশের ২ নিয়মে প্লিডিংসের ৪টি মূলনীতি সুপ্রতিষ্ঠিত:

  • ঘটনা উল্লেখ করতে হবে, আইন নয় (Plead Facts, not Law): আইনের ব্যাখ্যা বিচারকের দায়িত্ব; পক্ষগণ কেবল ঘটনার সত্য বিবরণ দেবেন;
  • কেবল উপাদানগত তথ্য দিতে হবে (Plead Material Facts Only): যে তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মামলার জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় কেবল তাই থাকবে;
  • সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করা নিষেধ (Do not plead Evidence): ঘটনার বিবরণ থাকবে, কিন্তু তা কীভাবে প্রমাণিত হবে সেই সাক্ষ্য লেখা যাবে না;
  • সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট হতে হবে (State facts concisely in numbered paragraphs): প্রতিটি অনুচ্ছেদে একটি করে নির্দিষ্ট তথ্য সুস্পষ্টভাবে বিন্যস্ত থাকবে।

Related Articles

Back to top button