বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১১: প্রশ্ন ৯ (খ) এর পূর্ণাঙ্গ মডেল সমাধান
মূল প্রশ্ন:
৯. খ) বেইল বন্ডের জন্য আদালত অধিক পরিমাণে অর্থ, ধরা যাক ১ লক্ষ টাকা, ধার্য করেছে। আপনি বেইল বন্ডের অর্থ যুক্তি সঙ্গত হারে কমানোর জন্য যুক্তি প্রদর্শন করুন: উক্ত অর্থ কমানোর জন্য একটি দরখাস্ত লিখুন।
১. বেইল বন্ডের পরিমাণ নির্ধারণ সংক্রান্ত আইনি বিধান
ফৌজদারী কার্যবিধি, ১৮৯৮ (CrPC)-এর ধারা ৪৯৮ এর অন্যতম মৌলিক বিধান হলো:
“The amount of every bond executed under this Chapter shall be fixed with due regard to the circumstances of the case, and shall not be excessive.”
আইনের এই দ্ব্যর্থহীন নির্দেশনার মূল কথা হলো—বেইল বন্ডের পরিমাণ কোনোভাবেই অতিরিক্ত বা নিপীড়নমূলক (Excessive or Punitive) হতে পারবে না। বেইল বন্ড নির্ধারণের উদ্দেশ্য আসামির হাজিরা নিশ্চিত করা, তাকে অর্থনৈতিকভাবে শাস্তি দেওয়া নয়। বন্ডের পরিমাণ এত বেশি ধার্য করা যা পরিশোধের সাধ্য আসামির নেই, তা কার্যত আসামিকে ‘জামিন নামঞ্জুর’ করারই নামান্তর।
২. বেইল বন্ডের অর্থ কমানোর সমর্থনে যুক্তিমালা (Grounds)
- আসামির আর্থিক অসচ্ছলতা: আসামি দরিদ্র বা সাধারণ আয়ের মানুষ। ১,০০,০০০/- (এক লক্ষ) টাকার জামানতদার বা নগদ মুচলেকা প্রদান করা তার সামর্থ্যের অতীত।
- জামিনের অধিকারের লঙ্ঘন: সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অতিরিক্ত বেইল বন্ড ধার্য করে আসামিকে কারাগারে আটকে রাখা সংবিধানের মৌলিক অধিকার (ব্যক্তিগত স্বাধীনতা) পরিপন্থী।
- পলাতক না হওয়ার নিশ্চয়তা: আসামি সমাজের স্থায়ী বাসিন্দা, তার পরিবার ও ভিটা এখানেই রয়েছে। সামান্য অঙ্কের (যেমন ৫,০০০ বা ১০,০০০ টাকার) বন্ডেই তার উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব।
৩. বিজ্ঞ আদালতে বেইল বন্ডের পরিমাণ কমানোর দরখাস্ত মুসাবিদা
বিজ্ঞ অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ঢাকা
সি.আর. মোকদ্দমা নং ৪৫৬ / ২০১১
জনাব আকবর আলী, পিতা- মৃত সামসুল হক, সাং- সূত্রাপুর, ঢাকা।
…………… আসামি-দরখাস্তকারী
—বনাম—
মোসাঃ ফাতেমা বেগম, স্বামী- আকবর আলী, সাং- সূত্রাপুর, ঢাকা।
…………… বাদী-বিপক্ষ
দরখাস্তের বিষয়: ফৌজদারী কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ধারা ৪৯৮ এর শেষাংশের বিধান অনুযায়ী অতিরিক্ত বেইল বন্ডের পরিমাণ (১,০০,০০০/- টাকা) হ্রাসক্রমে সহনীয় অঙ্কে নির্ধারণের আবেদন।
আসামি-দরখাস্তকারীর পক্ষে বিনীত নিবেদন এই যে:
- বিজ্ঞ আদালত বিগত ১২/০৬/২০১১ ইং তারিখে আসামির জামিন আবেদন মঞ্জুর করেছেন, যার জন্য আসামি বিজ্ঞ আদালতের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ।
- তবে বিজ্ঞ আদালত জামিনের শর্ত হিসেবে ১,০০,০০০/- (এক লক্ষ) টাকার বেইল বন্ড নির্ধারণ করেছেন। আসামি একজন সামান্য দিনমজুর এবং তার মাসিক আয় অনধিক ৬,০০০/- টাকা। তার পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র।
- ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৯৮ ধারা অনুযায়ী বেইল বন্ডের পরিমাণ কখনো অতিরিক্ত (Excessive) হওয়া বিধিসম্মত নয়। উক্ত বিপুল অঙ্কের জামিনদার সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে জামিন আদেশ পাওয়া সত্ত্বেও আসামি জেলহাজতে বন্দি রয়েছেন।
- আদালত যদি বেইল বন্ডের পরিমাণ হ্রাস করে ৫,০০০/- বা ১০,০০০/- টাকা নির্ধারণ করেন, তবে আসামি অবিলম্বে স্থানীয় জামিনদার দাখিলপূর্বক জামিননামা সম্পাদন করতে সক্ষম হবেন এবং তিনি আদালতের প্রতিটি তারিখে নিয়মিত হাজিরা দেবেন।
অতএব বিনীত প্রার্থনা:
বিজ্ঞ আদালত সদয় হয়ে মানবিক ও আইনি বিবেচনায় পূর্বে ধার্যকৃত ১,০০,০০০/- টাকার বেইল বন্ড হ্রাস করে ৫,০০০/- (পাঁচ হাজার) টাকা নির্ধারণ করার সদয় আদেশ দানে সুবিচার করতে মর্জি হয়।
স্বাক্ষর: বিজ্ঞ আইনজীবী মারফত আসামি
তারিখ: ১৫/০৬/২০১১ ইং
📌 বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১১ প্রশ্ন ও সমাধান নেভিগেশন:
আপনি ২০১১ সালের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ৯ (খ)-এর পূর্ণাঙ্গ মডেল আইনি সমাধান পড়ছেন। সম্পূর্ণ প্রশ্নপত্র ও অন্যান্য সকল বিষয়ের প্রশ্নের লিখিত সমাধান দেখতে নিচের বোতামে ক্লিক করুন।
৪.১. অতিরিক্ত বেইল বন্ডের বিরুদ্ধে সংবিধিবদ্ধ আইনি সুরক্ষার রূপরেখা
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারায় বিজ্ঞ দায়রা আদালত এবং মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগকে জামানতের অতিরিক্ত অর্থ হ্রাস করার ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে:
- অতিরিক্ত জামানত কার্যত জামিন প্রত্যাখ্যানের শামিল: সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদালতের নির্দেশ এমন হওয়া উচিত নয় যা আসামির দারিদ্র্যের কারণে তার মুক্তির পথ রুদ্ধ করে দেয়; জামিন মঞ্জুর করে যদি কোটি টাকার বন্ড চাওয়া হয় যা গরিব আসামির পক্ষে দেওয়া অসম্ভব, তবে তা কার্যত জামিন অস্বীকার;
- আসামির আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা: জামানতের পরিমাণ নির্ধারণকালে আদালত অপরাধের আর্থিক মূল্যমানের পাশাপাশি আসামির আর্থিক সামর্থ্য এবং স্থানীয় জামিনদারের বিশ্বাসযোগ্যতা সুবিবেচনায় রাখবেন;
- সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ (আব্দুল জলিল বনাম রাষ্ট্র, 45 DLR 210) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, জামানতের উদ্দেশ্য আসামির আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, তাকে অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করা নয়।
আইনি সিদ্ধান্ত: অতএব, নিম্ন আদালতের ধার্যকৃত মাত্রাতিরিক্ত বেইল বন্ড হ্রাসের জন্য ৪৯৮ ধারায় উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক অপরিহার্য সুরক্ষা।
৪.২. বেইল বন্ডের অতিরিক্ত অর্থ হ্রাসের দরখাস্তের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো
বিজ্ঞ দায়রা জজ আদালতে বেইল বন্ড হ্রাসের আবেদন দাখিলকালে আইনজীবীকে নিম্নোক্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য উপস্থাপন করতে হয়:
- আসামি চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী দিনমজুর বা প্রান্তিক পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি;
- আসামির পক্ষে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ধার্যকৃত লক্ষ টাকার বন্ড প্রদান করা একেবারেই অসম্ভব, যার ফলে জামিন আদেশ বহাল থাকা সত্ত্বেও সে জেলহাজতে পচছে;
- আদালত যদি বন্ডের পরিমাণ হ্রাস করে নামমাত্র ৫০০ বা ১০০০ টাকার বন্ড এবং একজন স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনার বা চেয়ারম্যানের জামানত গ্রহণ করেন, তবে আসামি বিচারে নিয়মিত হাজির থাকবে;
- উচ্চ আদালত অসংখ্য নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, জামানতের টাকার প্রাচীর তুলে দরিদ্র নাগরিককে অধিকারবঞ্চিত রাখা সংবিধানের সমতার ধারণার পরিপন্থী।
৪.৩. সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও পরীক্ষার্থীর জন্য দিকনির্দেশনা
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ (আব্দুল জলিল বনাম রাষ্ট্র, 45 DLR 210) নজিরে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন যে, জামানতের অঙ্ক নির্ধারণকালে বিচারককে অবশ্যই সামাজিক বাস্তবতা ও ন্যায়পরায়ণতার নীতি মনে রাখতে হবে। পরীক্ষায় এই প্রশ্নের সমাধানে ৪৯৮ ধারার ক্ষমতা, দারিদ্র্যের গ্রাউন্ড এবং দরখাস্তের আনুষ্ঠানিক কাঠামো উপস্থাপন করলে পূর্ণমান নিশ্চিত হয়।
আইনি সারসংক্ষেপ: সারসংক্ষেপে, বেইল বন্ডের অতিরিক্ত অর্থ হ্রাসের মাধ্যমে উচ্চ আদালত প্রমাণ করে যে বিচার বিভাগ কেবল ধনী ব্যক্তির জন্য নয়, বরং প্রান্তিক দরিদ্র মানুষের জামিনে মুক্তির পথ সুগম করতেও আদালত সর্বদা ন্যায়পরায়ণ ভূমিকা পালন করে।
📌 সম্পর্কিত আইনি প্রস্তুতি ও সহায়িকা লিংক: