ধর্ষণের পর আত্মহত্যা ও মায়ের নিকট বিবৃতি: মৃত্যুকালীন ঘোষণা ও প্রাসঙ্গিকতা | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৬
প্রশ্ন ৮। (ক): ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে ক তার মাকে জানায় যে ১২ জুলাই ২০২৬ তারিখে খ তাকে ধর্ষণ করেছে। দুই দিন পরে ক আত্মহত্যা করে। ধর্ষণের দায়ে খ এর বিচার শুরু হয়। ক কর্তৃক তার মায়ের নিকট প্রদত্ত বিবৃতিটি কি মৃত্যুকালীন ঘোষণা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে? উক্ত বিবৃতিটি কি The Evidence Act, 1872 এর ৬ ও ৮ ধারা অনুসারে প্রাসঙ্গিক? [৮]
১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট
অত্র সমস্যাটিতে ধর্ষণের শিকার হয়ে অপমানে আত্মহত্যাকারী এক নারীর মৃত্যুর পূর্বে মায়ের নিকট প্রদত্ত বক্তব্যের সাক্ষ্যমূল্য যাচাই করতে বলা হয়েছে। এখানে দুটি সুনির্দিষ্ট আইনি প্রশ্ন জড়িত: প্রথমত, ধর্ষণের মামলায় মায়ের নিকট প্রদত্ত উক্ত বিবৃতিটি কি সাক্ষ্য আইনের ৩২(১) ধারায় ‘মৃত্যুকালীন ঘোষণা’ (Dying Declaration) হিসেবে গ্রাহ্য? এবং দ্বিতীয়ত, এটি কি ধারা ৬ (Res Gestae) ও ধারা ৮ (আচরণ/নালিশ) হিসেবে প্রাসঙ্গিক?
২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইনি বিধানাবলী (Statutory Provisions)
- The Evidence Act, 1872:
- Section 32(1): মৃত্যুকালীন ঘোষণা (Cases in which statement relates to cause of death or transaction resulting in death)।
- Section 6: একই কার্যধারার অংশীভূত ঘটনার প্রাসঙ্গিকতা (Relevancy of facts forming part of same transaction / Res Gestae)।
- Section 8: উদ্দেশ্য, প্রস্তুতি এবং পূর্ববর্তী বা পরবর্তী আচরণ (Conduct and complaint)।
৩. বিশদ আইনি বিশ্লেষণ ও সমস্যার সমাধান
(১) বিবৃতিটি কি মৃত্যুকালীন ঘোষণা (Section 32(1)) হিসেবে ব্যবহার করা যাবে?
না, এটি মৃত্যুকালীন ঘোষণা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
কারণসমূহ নিম্নরূপ:
- বিচারের বিষয়বস্তুর অমিল: সাক্ষ্য আইনের ৩২(১) ধারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে—“when the cause of that person’s death comes into question” (যখন ওই ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ বিচার্য বিষয়ে পরিণত হয়)। কিন্তু বর্তমান মামলায় খ-এর বিচার চলছে ধর্ষণের দায়ে (Trial for rape), নরহত্যা বা আত্মহত্যায় প্ররোচনার দায়ে নয়। ধর্ষণের মামলায় ভিকটিমের মৃত্যুর কারণ কোনো বিচার্য বিষয় নয়।
- মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ নয়: বিবৃতিটি ছিল ১২ জুলাইয়ের ধর্ষণের ঘটনার বর্ণনা। এই বিবৃতি দেওয়ার দুই দিন পর ক নিজ সিদ্ধান্তে আত্মহত্যা করে। ধর্ষণের ঘটনাটি আত্মহত্যার প্রত্যক্ষ লেনদেন বা সরাসরি মৃত্যুর কারণ ছিল না; ফলে এটি ৩২(১) ধারার শর্ত পূরণ করে না।
(২) বিবৃতিটি কি ধারা ৬ (Res Gestae) অনুসারে প্রাসঙ্গিক?
না, ধারা ৬ অনুসারে প্রাসঙ্গিক নয়।
- ধারা ৬ (Res Gestae) প্রযোজ্য হতে হলে বক্তব্যটি ঘটনা সংঘটনের সমসাময়িক (Spontaneous and contemporaneous) হতে হয়, যাতে কোনো প্রকার মনগড়া গল্প তৈরির অবকাশ না থাকে।
- এখানে ঘটনা ঘটেছে ১২ জুলাই এবং ক তার মাকে ঘটনা জানিয়েছে ১৬ জুলাই—অর্থাৎ দীর্ঘ ৪ দিন পর। ৪ দিনের এই দীর্ঘ ব্যবধান সমসাময়িকতার নীতি ভঙ্গ করে; ফলে এটি Res Gestae হিসেবে অগ্রাহ্য।
(৩) বিবৃতিটি কি ধারা ৮ অনুসারে প্রাসঙ্গিক?
হ্যাঁ, এটি ধারা ৮ অনুসারে প্রাসঙ্গিক ও গ্রহণযোগ্য।
- ধারা ৮ এর ব্যাখ্যা ১ ও ২ (Explanation 1 & 2) অনুযায়ী, কোনো অপরাধের শিকার ব্যক্তি কর্তৃক কৃত নালিশ (Complaint) এবং তার পূর্বাপর আচরণ প্রাসঙ্গিক।
- ধর্ষণের শিকার নারী ক তার মায়ের নিকট যে বিবরণ দিয়েছে, তা নিছক গল্প নয় বরং অবিচারের বিরুদ্ধে মায়ের কাছে তার স্বাভাবিক শোক ও নালিশ (Conduct of the outraged victim)। যদিও ৪ দিনের বিলম্ব হয়েছে, তবে বাংলাদেশে সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক ভয় ও ট্রমার কারণে ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশে কয়েকদিনের বিলম্ব সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও ক্ষমার্হ।
- অতএব, ধারা ৮ মোতাবেক ক-এর মায়ের সাক্ষ্য ক-এর আচরণ হিসেবে সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক হবে।
৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স
১. শরদ বিরধিচাঁদ সারদা বনাম মহারাষ্ট্র রাজ্য (AIR 1984 SC 1622): সর্বোচ্চ আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, ৩২(১) ধারায় বক্তব্য প্রাসঙ্গিক হতে হলে যে মামলায় বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে সেই মামলার মূল বিচার্য বিষয় হতে হবে ওই ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ। অন্য কোনো অপরাধের বিচারে তা মৃত্যুকালীন ঘোষণা হয় না।
২. জেনতেলা বিজয়বর্ধন রাও বনাম অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য (AIR 1996 SC 2791): আদালত রায় দেন যে, ঘটনার বেশ কিছুক্ষণ পর বা কয়েকদিন পর প্রদত্ত বিবৃতি ধারা ৬ (Res Gestae)-এর আওতাভুক্ত হয় না, কারণ এতে মনগড়া বক্তব্যের অবকাশ থাকে।
৩. রাষ্ট্র বনাম নুরুল ইসলাম (41 DLR 456): ধর্ষণের শিকার নারীর পরবর্তী আচরণ এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের নিকট নালিশ সাক্ষ্য আইনের ৮ ধারায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক সাক্ষ্য (Corroborative evidence)।
৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত
সারসংক্ষেপে, ক কর্তৃক তার মায়ের নিকট প্রদত্ত বিবৃতিটি ৩২(১) ধারায় মৃত্যুকালীন ঘোষণা নয় এবং ধারা ৬-এ রেস গেস্টাই নয়; কিন্তু এটি সাক্ষ্য আইনের ৮ ধারা অনুসারে সংক্ষুব্ধ ভিকটিমের আচরণ ও নালিশ (Conduct and complaint) হিসেবে খ-এর বিরুদ্ধে আদালতে সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক ও গ্রহণযোগ্য।
🏛️ সম্পর্কিত প্রশ্নপত্র: এই প্রশ্নটি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অ্যাডভোকেট তালিকাভুক্তির লিখিত পরীক্ষা ২০২৬-এর প্রশ্নপত্রে অন্তর্ভুক্ত। সম্পূর্ণ বিগত বছরের প্রশ্নব্যাংক দেখতে আমাদের মূল আর্কাইভে প্রবেশ করুন।
