CrPC ধারা ১৪৪-এর ৩ মাসের আদেশের অবৈধতা ও প্রতিকার | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২০

📌 বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২০ | ফৌজদারি কার্যবিধি

প্রশ্ন ৫। (খ): X ঢাকা মহানগরের মতিঝিলে এক খণ্ড জমি নিয়ে Y এর সাথে বিরোধের সূত্রে পরবর্তী ১৫ দিন পর শান্তিভঙ্গ রোধের প্রার্থনায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকা বরাবরে একটি আবেদন দাখিল করলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট The Code of Criminal Procedure, 1898 এর ১৪৪ ধারার অধীনে আদেশ দ্বারা পরবর্তী ৩ মাস Y কে নালিশী জমিতে প্রবেশ থেকে বিরত থাকার এবং শান্তি বজায় রাখার নির্দেশনা জারি করেন। Y এর আইনজীবী হিসেবে আপনার আইনগত পদক্ষেপ কী হবে? জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশের বিরুদ্ধে আইনানুগ যুক্তি প্রস্তুত করুন।

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

প্রদত্ত সমস্যায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকা কর্তৃক ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারায় প্রদত্ত আদেশে দুটি সুস্পষ্ট ও মারাত্মক এখতিয়ারগত ত্রুটি সংঘটিত হয়েছে: (১) মেট্রোপলিটন এলাকায় (ঢাকা মহানগরের মতিঝিলে) জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কোনো ১৪৪ ধারার এখতিয়ার নেই; সেখানে মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের এখতিয়ার প্রযোজ্য (ধারা ১৪৪(১) ও ডিএমপি অ্যাক্ট); (২) ১৪৪ ধারার আদেশের সর্বোচ্চ মেয়াদ ২ মাস (৬০ দিন), অথচ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ৩ মাসের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন; (৩) জমিতে ভবিষ্যৎ শান্তিভঙ্গের আশঙ্কায় ১৪৫ ধারার বিরোধকে ১৪৪ ধারার আওতায় এনে ভোগদখলে বিঘ্ন ঘটানো হয়েছে। এমতাবস্থায় Y-এর নিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে গৃহীত পদক্ষেপ ও আদেশের বিরুদ্ধে অকাট্য যুক্তিমালা প্রস্তুত করতে হবে।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী

  • The Code of Criminal Procedure, 1898:
    • Section 144(6): ১৪৪ ধারার কোনো আদেশ অনধিক ২ মাস (৬০ দিন) বলবৎ থাকতে পারে। সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন ছাড়া ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক এর অধিক মেয়াদের আদেশ প্রদান সম্পূর্ণ এখতিয়ারবহির্ভূত ও বেআইনি।
    • Section 144(4): ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক স্বতঃপ্রণোদিত বা সংক্ষুব্ধ পক্ষের আবেদনে আদেশ প্রত্যাহার বা পরিবর্তনের ক্ষমতা (Rescind or alter the order)।
    • Section 435 / 439A: দায়রা জজ আদালতে ফৌজদারি রিভিশন দায়ের।
    • Section 145: স্থাবর সম্পত্তির দখল সংক্রান্ত বিরোধে ১৪৪ ধারার পরিবর্তে ১৪৫ ধারার প্রয়োগ।
  • The Dhaka Metropolitan Police Ordinance, 1976: মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য বিশেষ ক্ষমতা।

৩. Y-এর আইনজীবী হিসেবে আইনগত পদক্ষেপসমূহ

Y-এর আইনজীবী হিসেবে অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করতে হবে:

  1. পদক্ষেপ ১ (আদেশ প্রত্যাহারের আবেদন): ফৌজদারি কার্যবিধির Section 144(4) অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট উক্ত ৩ মাসের অবৈধ আদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার (Rescind/Cancel) করার আবেদন পেশ করা।
  2. পদক্ষেপ ২ (ফৌজদারি রিভিশন দায়ের): যদি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবেদন নামঞ্জুর করেন বা তাৎক্ষণিক প্রতিকার না দেন, তবে The Code of Criminal Procedure, 1898-এর Section 435 ও 439A অনুযায়ী বিজ্ঞ মহানগর দায়রা জজ, ঢাকা (Metropolitan Sessions Judge) আদালতে উক্ত এখতিয়ারহীন আদেশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি রিভিশন মোকদ্দমা দায়ের করা।

৪. জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশের বিরুদ্ধে আইনানুগ যুক্তিমালা

  1. আইনি সময়সীমা লঙ্ঘনের যুক্তি (Exceeding Statutory Limit of 2 Months): ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৪৪(৬)-এ দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে যে, ১৪৪ ধারার আদেশ সর্বোচ্চ দুই মাসের বেশি কার্যকর রাখা যাবে না। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ৩ মাসের জন্য প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা পরিষ্কারভাবে আইনের বিধানের চরম লঙ্ঘন এবং উক্ত আদেশ সম্পূর্ণ এখতিয়ারবিহীন ও বাতিল (Void ab initio)।
  2. মেট্রোপলিটন এলাকায় এখতিয়ারের অভাব (Lack of Territorial/Subject Jurisdiction): বিরোধীয় জমিটি ঢাকা মহানগরের মতিঝিল এলাকায় অবস্থিত। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স এবং কার্যবিধির বিশেষ বিধান মতে মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ কমিশনার ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের এখতিয়ার বিদ্যমান; জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক মেট্রোপলিটন এলাকার বিরোধে ১৪৪ ধারা জারি করা এখতিয়ারবহির্ভূত।
  3. জরুরি পরিস্থিতির অনুপস্থিতি (No Urgency of Situation): আবেদনে বলা হয়েছে “পরবর্তী ১৫ দিন পর শান্তিভঙ্গ হতে পারে”। ১৪৪ ধারা কেবল তাৎক্ষণিক ও আকস্মিক চরম জরুরি পরিস্থিতিতে শান্তিভঙ্গ রোধে প্রয়োগ করা হয় (Urgent cases of nuisance or apprehended danger)। ১৫ দিন পরের সম্ভাব্য কাল্পনিক বিরোধের জন্য তাৎক্ষণিক ১৪৪ ধারা প্রয়োগ আইনের অপব্যবহার।
  4. ১৪৫ ধারার স্থলে ১৪৪ ধারার অপপ্রয়োগ: জমিজমা সংক্রান্ত স্থায়ী দখল বিরোধ নিষ্পত্তির ফোরাম হলো ধারা ১৪৫ বা দেওয়ানী আদালত। কোনো ব্যক্তিকে নিজের ভোগদখলীয় সম্পত্তি থেকে বের করে দেওয়ার জন্য সংক্ষিপ্ত ১৪৪ ধারা ব্যবহার করা সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের পরিপন্থী।

৫. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির

  • মকবুল আহমেদ বনাম আব্দুল বারিক, ৩৩ ডিএলআর (এডি) ২৯: আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত প্রদান করেন যে, ১৪৪(৬) ধারার বিধান সংবিধিবদ্ধ বাধ্যবাধকতা। ২ মাসের অধিক মেয়াদের যেকোনো আদেশ সময়োত্তীর্ণ হওয়ার সাথে সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অকার্যকর হয়ে যায় এবং ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ২ মাসের বেশি মেয়াদের আদেশ প্রদান এখতিয়ারহীন।
  • শামসুল হক বনাম রাষ্ট্র, ৪০ ডিএলআর ২৫৪: স্থাবর সম্পত্তির দখল বিরোধে দেওয়ানী আদালতের প্রতিকার এড়িয়ে ১৪৪ ধারার মাধ্যমে কোনো পক্ষকে সম্পত্তি থেকে বেদখল করা বেআইনি।

৬. উপসংহার

জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের জারিকৃত ৩ মাসের আদেশটি সময়সীমা ও ভৌগোলিক এখতিয়ার উভয় দিক থেকেই বেআইনি। ধারা ১৪৪(৪) মতে আদেশ প্রত্যাহার বা ধারা ৪৩৯ক মতে রিভিশন দায়ের করে আদেশটি বাতিল করানোই একমাত্র সঠিক আইনি প্রতিকার।

৪.১. ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারার আদেশের আইনি মেয়াদ ও প্রতিকার

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারার অধীন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক প্রদত্ত আদেশের সংবিধিবদ্ধ মেয়াদ অনধিক ২ মাস (৬০ দিন):

  • ম্যাজিস্ট্রেট যদি ৩ মাসের জন্য আদেশ জারি করেন, তবে ৬০ দিন অতিক্রান্ত পরবর্তী আদেশ সম্পূর্ণ এখতিয়ারবিহীন ও বেআইনি;
  • কেবল সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকার উক্ত আদেশের মেয়াদ বৃদ্ধি করতে পারে; ম্যাজিস্ট্রেটের নিজের কোনো মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষমতা নেই;
  • সংক্ষুব্ধ পক্ষ ১৪৪(৪) ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট আদেশ প্রত্যাহারের আবেদন করতে পারেন অথবা দায়রা জজ আদালত/হাইকোর্ট বিভাগে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৩৫/৪৩৯ ধারায় রিভিশন দায়ের করতে পারেন (আব্দুল বারী বনাম রাষ্ট্র, 44 DLR 280)।

আইনি সিদ্ধান্ত: পরিশেষে, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশের মেয়াদ ৬০ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে আইন সাধারণ নাগরিকের মৌলিক সম্পত্তি ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে।

Related Articles

Back to top button