দণ্ডবিধিতে অ্যাবেটমেন্ট বা সহায়তার সংজ্ঞা ও বিভিন্ন শাস্তির বিধান – বার কাউন্সিল লিখিত ২০১১

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১১: দণ্ডবিধি, ১৮৬০

প্রশ্ন: দণ্ডবিধির আওতায় অপরাধ সংঘটনে সহায়তা (Abetment)-এর সংজ্ঞা দিন। অপরাধে সহায়তাকারীর (Abettor) আইনি পরিচয় ও সহায়তার বিভিন্ন প্রকার শাস্তির বিধান বিশদভাবে আলোচনা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]

১. তাত্ত্বিক ভূমিকা ও বিধানের দর্শন

দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর পঞ্চম অধ্যায়ে (অধ্যায় ৫, ধারা ১০৭-১২০) অপরাধ সংঘটনে সহায়তা বা ‘অ্যাবেটমেন্ট’ (Abetment) সংক্রান্ত আইন বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। ফৌজদারি আইন কেবল সেই ব্যক্তিকেই শাস্তি দেয় না যে সরাসরি অপরাধটি সংঘটন করে, বরং যে ব্যক্তি অপরাধটির পেছনে মূল পরিকল্পনাকারী, পরামর্শদাতা বা সহযোগী হিসেবে কাজ করে, তাকেও সমভাবে অপরাধী সাব্যস্ত করে।

২. সহায়তার তিনটি স্বীকৃত মাধ্যম (ধারা ১০৭)

দণ্ডবিধির ১০৭ ধারা অনুযায়ী একজন ব্যক্তি প্রধানত তিনটি উপায়ে অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করতে পারে:

  1. প্ররোচনা বা উসকানি দিয়ে (By Instigation): কোনো ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট অপরাধ করার জন্য মানসিক প্রেরণা দেওয়া, উসকানি দেওয়া বা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কাজ করানো (Explanation 1)।
  2. ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে (By Conspiracy): দুই বা ততোধিক ব্যক্তি অপরাধ করার জন্য একমত হওয়া এবং সেই ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ সংঘটিত হওয়া।
  3. ইচ্ছাকৃত সাহায্যের মাধ্যমে (By Intentional Aid): কোনো অপরাধ সংঘটনকালে বা তার পূর্বে কোনো কাজ বা দায়িত্বপূর্ণ নীরবতা দিয়ে অপরাধের পথ সহজ করে দেওয়া (Explanation 2)।

৩. সহায়তাকারীর আইনি বৈশিষ্ট্য (ধারা ১০৮)

দণ্ডবিধির ১০৮ ধারা অনুযায়ী সহায়তাকারীর দায় সম্পর্কে কয়েকটি মৌলিক নীতিমালা বিদ্যমান:

  • মূল অপরাধ সংঘটিত হওয়া অনাবশ্যক: প্ররোচিত ব্যক্তি যদি অপরাধটি করতে অস্বীকার করে বা করতে ব্যর্থ হয়, তবুও সহায়তাকারী ১০৮ ধারার ব্যাখ্যা ২ অনুযায়ী পূর্ণ অপরাধী হবে।
  • প্ররোচিত ব্যক্তির অপরাধ করার সক্ষমতা থাকা জরুরি নয়: কোনো পাগল বা শিশুকে দিয়ে খুন করালে শিশুটি দায়মুক্তি পেলেও সহায়তাকারী খুনের সহায়তাকারী হিসেবে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে (ব্যাখ্যা ৩)।
  • সহায়তায় সহায়তাও অপরাধ: অপরাধ সংঘটনে সহায়তাকারীকে প্ররোচিত করাও একটি পৃথক অপরাধ (ব্যাখ্যা ৪)।

৪. অপরাধ সংঘটনে সহায়তার শাস্তির তুলনামূলক বিধান

দণ্ডবিধিতে সহায়তার শাস্তিকে পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত করা হয়েছে:

পরিস্থিতি সংশ্লিষ্ট ধারা নির্ধারিত শাস্তির মাত্রা
অপরাধটি সংঘটিত হলে ধারা ১০৯ সহায়তার ফলে কাজটি সংঘটিত হলে এবং পৃথক কোনো শাস্তি নির্ধারিত না থাকলে মূল অপরাধীর সমপরিমাণ শাস্তি ভোগ করবে।
ভিন্ন কাজ সংঘটিত হলে ধারা ১১১ সহায়তার স্বাভাবিক পরিণতিতে (Probable consequence) ভিন্ন অপরাধ ঘটলে সহায়তাকারী সেই ভিন্ন অপরাধের জন্যও সমানভাবে দায়ী হবে।
মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন অপরাধ সংঘটিত না হলে ধারা ১১৫ সহায়তাকারী অনধিক ৭ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে; কোনো আঘাত ঘটলে অনধিক ১৪ বছর কারাদণ্ড।
কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ সংঘটিত না হলে ধারা ১১৬ মূল অপরাধের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ কারাদণ্ডের এক-চতুর্থাংশ (১/৪) মেয়াদের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড। সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রে অর্ধেক (১/২)।

৫. অপরাধের প্রস্তুতি ও সহায়তার সূক্ষ্ম সীমারেখা

ফৌজদারি আইনের সাধারণ নিয়মে কেবল অপরাধের প্রস্তুতি (Preparation) শাস্তিযোগ্য নয়। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি অন্য কারো অপরাধ সংঘটনের প্রস্তুতিতে স্বেচ্ছায় সাহায্য করে (যেমন: চুরির জন্য গোপন চাবি সরবরাহ বা খুনের জন্য অস্ত্র এনে দেওয়া), তখন তা নিছক প্রস্তুতি থাকে না, বরং দণ্ডবিধির ১০৭ ধারার ৩য় দফায় ‘ইচ্ছাকৃত সাহায্য’ হিসেবে সরাসরি শাস্তিযোগ্য সহায়তায় রূপ নেয়।

৬. উচ্চ আদালতের নজিরসমূহ

  • মকবুল হোসেন বনাম রাষ্ট্র (35 DLR 88): সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, অপরাধ সংঘটনের পর কাউকে আশ্রয় দেওয়া সহায়তা নয়; অপরাধ সংগঠনের পূর্বে বা সময়ে সক্রিয় সাহায্য বা উসকানি থাকতে হবে।
  • আলাউদ্দিন বনাম রাষ্ট্র (29 DLR 140): ১০৯ ধারায় শাস্তি নিশ্চিত করতে অভিযুক্তের প্রত্যক্ষ মানসিক সংযোগ ও অপরাধমূলক অভিপ্রায় (Mens rea) অকাট্যভাবে প্রমাণ করা আবশ্যক।
  • আব্দুল আজিজ বনাম রাষ্ট্র (41 DLR 210): সহায়তাকারী ঘটনাস্থলে শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকলেও যদি তার ষড়যন্ত্র ও প্রত্যক্ষ পরামর্শ প্রমাণিত হয়, তবে সে মূল আসামির অনুরূপ দণ্ডে দণ্ডনীয় হবে।

৭. উপসংহার

দণ্ডবিধিতে অপরাধ সংঘটনে সহায়তা অ্যাবেটমেন্ট সংক্রান্ত বিধানাবলি নেপথ্যের মূল অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে এক কার্যকর হাতিয়ার। মূল কাজের সাথে সহায়তাকারীর ভূমিকা নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করাই বার কাউন্সিল পরীক্ষার মূল চাবিকাঠি।

৪.১. দণ্ডবিধির ১০৭ ধারায় সহায়তার ৩টি পদ্ধতি ও ১০৯ ধারার সাজার নীতিমালা

দণ্ডবিধির ১০৭ ধারায় অপরাধে সহায়তা (Abetment)-এর ৩টি সুস্পষ্ট আইনি মাধ্যম নির্ধারিত রয়েছে:

  • প্ররোচনা দান (Instigation): উসকানি বা প্ররোচিত করে কাউকে অপরাধ সংগঠনের দিকে চালিত করা;
  • ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়া (Conspiracy): এক বা একাধিক ব্যক্তির সাথে কোনো অবৈধ কাজের চক্রান্তে লিপ্ত হওয়া এবং তার ফলে কাজটি সংঘটিত হওয়া;
  • প্রত্যক্ষ সাহায্য করা (Intentional Aiding): কোনো কাজ করে বা অবৈধভাবে কোনো দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থেকে অপরাধীকে সরাসরি সাহায্য করা;
  • ধারা ১০৯ (সাজার বিধান): যদি দণ্ডবিধিতে সহায়তার জন্য কোনো পৃথক শাস্তির উল্লেখ না থাকে, তবে সহায়তাকারী মূল অপরাধীর সমান সমপরিমাণ শাস্তি ভোগ করবে।

আইনি সিদ্ধান্ত: পরিশেষে, প্ররোচনাকারী অপরাধের মূল ক্ষেত্র তৈরি করায় আইনের দৃষ্টিতে সে সরাসরি অপরাধীর সমান অপরাধী এবং সর্বোচ্চ সাজার যোগ্য।

৪.২. সহায়তার ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটিত না হলেও সাজার বিধান (ধারা ১১৫ ও ১১৬)

দণ্ডবিধির একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, প্ররোচনার ফলে যদি মূল অপরাধটি সংঘটিত নাও হয়, তবুও প্ররোচনাকারী দায় এড়াতে পারে না। মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধে সহায়তা করলে এবং অপরাধটি না ঘটলে সহায়তাকারীর সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে (ধারা ১১৫)। প্ররোচনাকারী অপরাধের মূল চক্রান্তকারী হিসেবে সমান দোষী।

৪.৩. সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও পরীক্ষার্থীর জন্য দিকনির্দেশনা

সুপ্রিম কোর্ট (সম্রাট বনাম লাল মিয়া, 50 Cal 120) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, অপরাধের মূল প্ররোচনাকারী মাঠপর্যায়ের অপরাধীর মতোই সমভাবে দায়ী। পরীক্ষায় ১০৭, ১০৮ ও ১০৯ ধারার বিধান এবং সহায়তার বিভিন্ন ধরন বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা আবশ্যক।

আইনি সারসংক্ষেপ: অতএব, দণ্ডবিধির ১০৭ থেকে ১০৯ ধারার সামগ্রিক বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, অপরাধের মূল প্ররোচনাকারী বা সাহায্যকারী পর্দার অন্তরালে থাকলেও আইনের হাত থেকে তার নিস্তার নেই এবং সে মূল অপরাধীর সমপরিমাণ সাজার মুখোমুখি হবে।

সুপ্রিম কোর্ট (আমির হোসেন বনাম রাষ্ট্র, 52 DLR 140) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, অপরাধের প্ররোচনাকারীকেও মূল অপরাধীর সমান কঠোর সাজা ভোগ করতে হবে।

Related Articles

Back to top button