তামাদি আইনের ৫ ধারায় বিলম্ব মওকুফের পরিধি ও যথাযথ কারণ (Sufficient Cause) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৫
প্রশ্ন ১০। (ক): তামাদি আইনের ৫ ধারায় বিলম্ব মওকুফের পরিধি ও যথাযথ কারণ (Sufficient Cause) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৫
১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট
তামাদি আইনের মৌলিক নীতি হলো নির্ধারিত সময়সীমা অতিবাহিত হওয়ার পর দায়েরকৃত মোকদ্দমা তামাদির দায়ে সরাসরি খারিজ হবে (ধারা ৩)। কিন্তু মানুষের জীবনে এমন কিছু অপ্রত্যাশিত, অনিবার্য ও নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত পরিস্থিতি আসতে পারে যার কারণে সে যথাসময়ে আদালতে উপস্থিত হতে পারে না। কঠোর আইন প্রয়োগের কারণে কোনো নিরপরাধ পক্ষ যেন বিচারবঞ্চিত না হয় সেজন্য তামাদি আইনের ৫ ধারায় আদালতকে বিলম্ব মওকুফের (Condonation of delay) সুবিবেচনামূলক এখতিয়ার প্রদান করা হয়েছে। অত্র প্রশ্নে ধারা ৫-এর পরিধি, প্রয়োগের ক্ষেত্রসমূহ এবং ‘যথাযথ কারণ’ (Sufficient Cause)-এর ব্যাখ্যা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী
The Limitation Act, 1908 এর Section 5 এ বিলম্ব মওকুফের বিধান বিবৃত রয়েছে:
“Any appeal or application for a revision or a review of judgment or for leave to appeal or any other application to which this section may be made applicable by or under any enactment for the time being in force may be admitted after the period of limitation prescribed therefor, when the appellant or applicant satisfies the Court that he had sufficient cause for not preferring the appeal or making the application within such period.”
৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও গভীর আইনি ব্যাখ্যা
ধারা ৫ এর পরিধি ও প্রযোজ্যতার ক্ষেত্রসমূহ
১. কোন কোন ক্ষেত্রে ৫ ধারা প্রযোজ্য?
ধারা ৫ কেবল নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে প্রযোজ্য:
- যে কোনো আপিল (Any Appeal);
- রিভিউ আবেদন (Application for Review);
- রিভিশন আবেদন (Application for Revision);
- আপিলের অনুমতির আবেদন (Leave to Appeal);
- অন্য কোনো আবেদন যেখানে বিশেষ আইনের দ্বারা ৫ ধারাকে প্রযোজ্য করা হয়েছে।
২. কোন ক্ষেত্রে ৫ ধারা প্রযোজ্য নয়? (গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা)
- মূল মোকদ্দমা বা আরজি দাখিলের ক্ষেত্রে (Original Suits): ৫ ধারা কখনোই কোনো মূল দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ মূল মামলার তামাদির মেয়াদ একদিন পার হলেও ৫ ধারায় তা মওকুফ করা যায় না।
- ডিক্রি জারির দরখাস্তের ক্ষেত্রে (Execution Applications – Order XXI): বিশেষ বিধান না থাকলে ডিক্রি জারির ক্ষেত্রেও ৫ ধারা প্রযোজ্য নয়।
৩. ‘যথাযথ কারণ’ (Sufficient Cause) কী?
বিলম্ব মওকুফের মূল চাবিকাঠি হলো আদালতকে সন্তুষ্ট করা যে আবেদনকারী উপযুক্ত কারণে নির্ধারিত সময়ে আসতে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল। আইন কোনো বাঁধাধরা তালিকা দেয়নি, তবে আদালতের নজির অনুযায়ী নিম্নোক্ত কারণগুলো ‘যথাযথ কারণ’ হিসেবে গণ্য হয়:
- আবেদনকারীর গুরুতর অসুস্থতা বা হাসপাতালে ভর্তি থাকা (মেডিকেল সার্টিফিকেট সমর্থিত);
- আইনজীবীর সরল বিশ্বাসে কৃত আইনগত ভুল (Mistake of advocate in good faith);
- কারাগারে আটক থাকা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা;
- রায় বা আদেশের প্রত্যায়িত নকল পেতে সরকারি দপ্তরের অপ্রত্যাশিত বিলম্ব;
- পক্ষগণের মধ্যে মধ্যস্থতা বা আপসের সদুদ্দেশ্যমূলক প্রচেষ্টা।
যা যথাযথ কারণ নয়:
নিছক অলসতা, অবহেলা, গাফিলতি বা আর্থিক অসচ্ছলতা সাধারণ নিয়মে ৫ ধারার বিলম্ব মওকুফের জন্য যথেষ্ট কারণ নয়। আবেদনকারীকে প্রতিটি দিনের বিলম্বের যৌক্তিক ব্যাখ্যা (Day-to-day delay explanation) প্রদান করতে হয়।
৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স
১. কালেক্টর বনাম কাটিজি (AIR 1987 SC 1353): আদালত রায় দেন যে, ৫ ধারার ‘যথাযথ কারণ’ শব্দাবলীকে উদারভাবে (Liberally) ব্যাখ্যা করতে হবে যাতে ন্যায়বিচার প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে পরাজিত না হয়; কোনো পক্ষ জেনেশুনে ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করে নিজের ক্ষতি করতে চায় না।
২. সিরাজুল ইসলাম বনাম ফরিদ আহমেদ (44 DLR AD 245): সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ অভিমত দেন যে, বিলম্ব মওকুফ আদালতের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা হলেও তা বিচারিক নীতি মেনে প্রয়োগ করতে হবে এবং অতিরিক্ত চরম গাফিলতি থাকলে আদালত বিলম্ব মওকুফ করবেন না।
৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত
তামাদি আইনের ৫ ধারা আদালতের হাতে ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের একটি অনন্য ভারসাম্যমূলক ক্ষমতা। মূল মামলায় প্রযোজ্য না হলেও আপিল ও রিভিশন পর্যায়ে বাস্তব কারণে বিলম্বিত পক্ষকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে এটি আইনের উদ্দেশ্যকে সার্থক করে।
🏛️ সম্পর্কিত প্রশ্নপত্র: এই প্রশ্নটি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অ্যাডভোকেট তালিকাভুক্তির লিখিত পরীক্ষা ২০২৫-এর প্রশ্নপত্রে অন্তর্ভুক্ত। সম্পূর্ণ বিগত বছরের প্রশ্নব্যাংক দেখতে আমাদের মূল আর্কাইভে প্রবেশ করুন।
