৩২৩ ধারার মামলায় নালিশকারী ও আসামীর আপোস কিন্তু নাবালক ভিকটিমের অসম্মতি | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৬

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২৬
প্রশ্ন ৫। (গ): আদালতে বিচারাধীন একটি মামলায় গ এর বিরুদ্ধে The Penal Code, 1860 এর ৩২৩ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। মামলার নালিশকারী ক এবং ভিকটিম তার নাবালক পুত্র খ। মামলার বিচারকালীন ক এবং গ আদালতকে অবহিত করে যে তারা উক্ত অপরাধের আপোস মীমাংসা করেছে। কিন্তু খ আপোসে সম্মত নয়। উক্ত আপোস মীমাংসার আইনগত ফলাফল কী? [৫]

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

দণ্ডবিধির ৩২৩ ধারার (স্বেচ্ছাকৃতভাবে আঘাত দান) অপরাধে মামলাটি আপোসযোগ্য হলেও, যখন সরাসরি ভিকটিম বা আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তি একজন নাবালক এবং নালিশকারী পিতা আসামীর সাথে আপোস করলেও নাবালক নিজে সেই আপোসে অসম্মতি জানায়, তখন ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারার আলোকে উক্ত আপোস কার্যকর হবে কি না—তা নির্ধারণ করাই অত্র সমস্যার মূল বিষয়বস্তু।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইনি বিধানাবলী (Statutory Provisions)

  • The Penal Code, 1860: Section 323 (Voluntarily causing hurt)।
  • The Code of Criminal Procedure, 1898:
    • Section 345(1): সারণিতে ৩২৩ ধারার অপরাধ কার দ্বারা আপোসযোগ্য তা বলা হয়েছে—“The person to whom the hurt is caused” (যাকে আঘাত করা হয়েছে, অর্থাৎ ভিকটিম)।
    • Section 345(4): ভিকটিম অপ্রাপ্তবয়স্ক (নাবালক), উন্মাদ বা জড়বুদ্ধিসম্পন্ন হলে কে আপোস করতে পারবে তার বিধান—“Any person competent to contract on his behalf may, with the permission of the Court, compound such offence.”
    • Section 345(6): বৈধ আপোসের পরিণতি হলো আসামীর খালাস (Acquittal)।

৩. বিশদ আইনি বিশ্লেষণ ও সমস্যার সমাধান

(১) আপোস করার আইনসঙ্গত অধিকারী কে?

ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫(১) ধারার টেবিল স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, ৩২৩ ধারায় আঘাতের অপরাধ আপোস করার আইনগত অধিকার কেবলমাত্র সেই ব্যক্তির যাকে আঘাত করা হয়েছে (Person to whom hurt is caused)। এখানে নালিশকারী ক কেবল মামলার সূচনাকারী; কিন্তু মূল আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তি হলো তার নাবালক পুত্র খ। সুতরাং, নালিশকারী পিতা হিসেবে ক-এর একার কোনো স্বাধীন অধিকার নেই নিজের ইচ্ছায় আপোস করার।

(২) নাবালক ভিকটিমের ক্ষেত্রে ৩৪৫(৪) ধারার শর্তাবলি:

ধারা ৩৪৫(৪) অনুযায়ী ভিকটিম খ নাবালক হওয়ায় তার পক্ষে তার বৈধ অভিভাবক (পিতা ক) আপোস করতে পারেন, তবে তার জন্য দুটি আবশ্যিক শর্ত পূরণ হতে হবে:

  1. আদালতের সুস্পষ্ট অনুমতি (Permission of the Court): সাধারণ ক্ষেত্রে ৩২৩ ধারায় আদালতের অনুমতির প্রয়োজন না হলেও, ধারা ৩৪৫(৪) এর অধীনে নাবালকের পক্ষে আপোসের জন্য আদালতের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক।
  2. নাবালকের সর্বোত্তম স্বার্থ (Best Interest of the Minor): আদালতকে সন্তুষ্ট হতে হবে যে এই আপোসটি নাবালকের স্বার্থের অনুকূলে হচ্ছে।

(৩) খ-এর অসম্মতির আইনি ফলাফল:

সমস্যায় বলা হয়েছে, “কিন্তু খ আপোসে সম্মত নয়।”

  • যদিও আইনগতভাবে নাবালক সরাসরি চুক্তি করতে পারে না, কিন্তু ফৌজদারি বিচারে ভিকটিম যখন নিজে আদালতে উপস্থিত হয়ে আপোসে তীব্র অসম্মতি জানায়, তখন আদালত ধরে নেবেন যে পিতার আপোসটি নাবালকের কল্যাণে নয়, বরং পিতার কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে বা চাপের মুখে হচ্ছে।
  • যেহেতু আদালতের অনুমতি ব্যতীত ৩৪৫(৪) কার্যকর হয় না, তাই আদালত নাবালকের প্রকাশ্য অসম্মতি বিবেচনায় নিয়ে পিতা ক ও আসামী গ-এর মধ্যকার আপোসের আবেদন সরাসরি প্রত্যাখ্যান বা নামঞ্জুর করবেন।
চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত: ক ও গ-এর মধ্যকার আপোস মীমাংসাটি আইনত অকার্যকর ও বাতিল হবে। আদালত আসামী গ-কে খালাস প্রদান করবেন না, বরং ৩২৩ ধারার মামলার বিচার কার্যক্রম যথারীতি অব্যাহত রাখবেন।

৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স

১. রাষ্ট্র বনাম বাবুল (37 DLR 224): সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন যে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারায় আপোস করার অধিকার আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত অধিকার। নালিশকারী পিতা হলেও ভিকটিমের অধিকার খর্ব করে আপোস করতে পারে না, বিশেষ করে যেখানে আদালত সন্তুষ্ট নয়।

২. রহিম বনাম রাষ্ট্র (45 DLR 120): ধারা ৩৪৫(৪)-এ আদালতের অনুমতি শর্তহীন নয়। নাবালক ভিকটিম অসম্মতি প্রকাশ করলে আদালত আপোসের অনুমতি দিতে বাধ্য নন।

৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত

অতএব, নালিশকারী ক ও আসামী গ-এর মধ্যকার আপোস আইনি ভিত্তি পাবে না; আদালতের অনুমতি না মেলায় আসামী খালাস পাবে না এবং মামলার বিচার আইনানুযায়ী চলবে।

Related Articles

Back to top button