মামলা খারিজের ৩ মাস পর পুনর্জীবিত করতে তামাদি মওকুফের আইনি কৌশল – বার কাউন্সিল ২০১১

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১১: দেওয়ানী কার্যবিধি ও তামাদি আইন

সৃজনশীল সমস্যাভিত্তিক প্রশ্ন: বাদীর অনুপস্থিতির কারণে দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ আদেশের ৮ বিধি অনুযায়ী একটি মূল মোকদ্দমা খারিজ (Dismissed for default) হয়ে যায়। উক্ত খারিজের কথা বাদী জানতে পারেন খারিজের ৩ (তিন) মাস পর। বাদীর জন্য উক্ত খারিজ আদেশ রদ করে মোকদ্দমাটি পুনর্জীবিত করার কি কি আইনি পথ রয়েছে? তামাদি মওকুফের আইনি কৌশল বিস্তারিত ব্যাখ্যা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]

১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও ৯ আদেশের বিধানাবলী

দেওয়ানী কার্যবিধি, ১৯০৮-এর আদেশ ৯, বিধি ৮ (Order IX, Rule 8) অনুযায়ী শুনানির তারিখে বিবাদী উপস্থিত থাকলে এবং বাদী অনুপস্থিত থাকলে আদালত মোকদ্দমাটি বাদীর খেলাপের দায়ে খারিজ (Dismissal for default) করবেন।

একই আদেশের বিধি ৯ (Order IX, Rule 9) অনুযায়ী বাদী উক্ত খারিজ আদেশ রদের (Setting aside dismissal) জন্য আদালতে দরখাস্ত করতে পারেন। বিধি ৯-এর প্রধান উপাদান হলো—বাদী আদালতকে সন্তুষ্ট করবেন যে শুনানির দিন আদালতে উপস্থিত না হওয়ার পেছনে তার উপযুক্ত ও যথেষ্ট কারণ (Sufficient cause) ছিল।

২. তামাদির জটিলতা ও তামাদি আইনের ৫ ধারার প্রয়োগ কৌশল

এখানে প্রধান আইনি সংকট হলো তামাদির মেয়াদ:

  • নির্ধারিত তামাদি: তামাদি আইন, ১৯০৮-এর প্রথম তফসিলের ১৬৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ৯ আদেশের ৯ বিধি মতে মোকদ্দমা পুনরুজ্জীবিত করার দরখাস্ত মোকদ্দমা খারিজ হওয়ার তারিখ হতে ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে দাখিল করতে হয়।
  • বর্তমান পরিস্থিতি: বাদী ৩ মাস (৯০ দিন) পর খারিজের কথা জানতে পেরেছেন, ফলে মূল ৩০ দিনের তামাদির মেয়াদ ইতোমধ্যেই অতিক্রান্ত হয়েছে।
  • আইনি সমাধান: তামাদি আইনের ৫ ধারা মূল মামলায় প্রযোজ্য না হলেও, যে কোনো দরখাস্তের (Application) ক্ষেত্রে ৫ ধারা শতভাগ প্রযোজ্য। অতএব, ৯ আদেশের ৯ বিধির দরখাস্তের সাথে তামাদি আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী বিলম্ব মওকুফের দরখাস্ত (Condonation of delay petition) সংযুক্ত করতে হবে।

৩. দরখাস্তে উপস্থাপনযোগ্য আইনি কৌশল ও যুক্তি

দেরি মওকুফের সফলতার জন্য বাদীকে নিম্নলিখিত কৌশলসমূহ অবলম্বন করতে হবে:

  1. বিলম্বের প্রতিটি দিনের সন্তোষজনক কৈফিয়ত: বাদীকে এফিডেভিট সহকারে প্রমাণ করতে হবে যে শুনানির দিনে এবং তৎপরবর্তী সময়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন বা তার আইনজীবী তাকে ভুল তারিখ দিয়েছিলেন বা আইনজীবীর মৃত্যু ঘটেছিল।
  2. খারিজের তারিখ জানার দিন হতে হিসাব: বাদী যেদিন সর্বপ্রথম বিশ্বস্ত সূত্রে খারিজের আদেশ জানতে পারলেন, সেই দিন হতে অবিলম্বে কালক্ষেপণ না করে দরখাস্ত দাখিল করেছেন তা প্রমাণ করা।
  3. আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা (Section 151 CPC): ৯ আদেশের ৯ বিধির সাথে অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে ধারা ১৫১ সংযুক্ত করা যায়, যাতে আদালত সুবিচারের স্বার্থে সহজাত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন।

৪. বিকল্প প্রতিকার: নতুন মামলা কি সম্ভব?

দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ আদেশের ৯(১) বিধিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ৯ বিধির অধীনে খারিজ হওয়া মোকদ্দমার একই কারণের ওপর নতুন মোকদ্দমা দায়ের সম্পূর্ণ বারিত (Fresh suit barred)। অতএব, ৯ আদেশের ৯ বিধি সহ তামাদি আইনের ৫ ধারার দরখাস্তই বাদীর একমাত্র আইনি মুক্তির উপায়।

৫. উচ্চ আদালতের যুগান্তকারী নজিরসমূহ

  • আব্দুল লতিফ বনাম জহিরুদ্দিন (48 DLR 312): হাইকোর্ট বিভাগ রায় দেন যে, ৯ আদেশের ৯ বিধির দরখাস্তে তামাদি আইনের ৫ ধারা সম্পূর্ণ প্রযোজ্য এবং আবেদনকারী যুক্তিসঙ্গত অসুস্থতা প্রমাণ করলে বিলম্ব মওকুফ করে মামলা পুনরুজ্জীবিত করা আদালতের দায়িত্ব।
  • মকবুল হোসেন বনাম বাংলাদেশ (37 DLR 240): আইনজীবীর অবহেলার কারণে মক্কেল ক্ষতিগ্রস্ত হলে এবং মক্কেল সরল বিশ্বাসে আদালতে এলে ৫ ধারায় বিলম্ব মওকুফ ন্যায়সঙ্গত।

৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

পরিশেষে, ৩ মাস বিলম্ব হলেও বাদীর অধিকার বিলুপ্ত হয়নি। উপযুক্ত মেডিকেল সার্টিফিকেট ও হলফনামা সহকারে দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ আদেশ, ৯ বিধি এবং তামাদি আইনের ৫ ধারার যৌথ দরখাস্ত দাখিল করলেই বিজ্ঞ আদালত বিলম্ব মওকুফপূর্বক খারিজ হওয়া মূল মোকদ্দমাটি পুনরুজ্জীবিত করে শুনানির দিন ধার্য করবেন।

৪.১. দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৯ নিয়ম ৯ এবং তামাদি আইনের ৫ ধারার সমন্বয়

বাদীর অনুপস্থিতির কারণে মোকদ্দমা খারিজ হলে দেওয়ানি কার্যবিধির ৯ আদেশের ৯ নিয়ম অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে পুনর্বহালের আবেদন করতে হয়। কিন্তু ৩ মাস অতিক্রান্ত হলে করণীয়:

  • বাদীপক্ষকে একইসাথে দুটি আবেদন দাখিল করতে হবে: মূল মোকদ্দমা পুনরুজ্জীবনের জন্য ৯ আদেশের ৯ নিয়মে দরখাস্ত এবং মধ্যবর্তী বিলম্ব মওকুফের জন্য তামাদি আইনের ৫ ধারায় আবেদন;
  • বাদীকে দেখাতে হবে যে তিনি আকস্মিক গুরুতর অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা অপর কোনো অনিবার্য বাধার কারণে আদালতে হাজির হতে পারেননি এবং এই বিলম্ব অনিচ্ছাকৃত;
  • আদালত প্রতিপক্ষকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণমূলক খরচ (Costs) প্রদানের শর্ত সাপেক্ষে বিলম্ব মওকুফপূর্বক মোকদ্দমাটি পুনর্বহালের আদেশ প্রদান করতে পারেন।

আইনি সিদ্ধান্ত: সুতরাং, ৫ ধারার সন্তোষজনক কারণ দর্শিয়ে এবং খরচের শর্ত পূরণ করে ৩ মাস পর খারিজকৃত দেওয়ানি মোকদ্দমা পুনরুজ্জীবিত করা সম্পূর্ণ আইনসঙ্গত।

৪.২. প্রতিপক্ষকে খরচের টাকা প্রদান ও মোকদ্দমার ট্রায়াল নিশ্চিতকরণ

বিজ্ঞ আদালত যখন ৩ মাস পর খারিজ মোকদ্দমা পুনরুজ্জীবিত করেন, তখন তিনি সাধারণ বিবাদীর সুবিধার জন্য এবং তার সময় অপচয়ের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাদীর ওপর ১০০০ থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত খরচ ধার্য করেন। উক্ত খরচ বিবাদীকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করার পরই মোকদ্দমাটি তার পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে এবং পুনরায় শুনানির দিন ধার্য হয়।

৪.৩. সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও পরীক্ষার্থীর জন্য দিকনির্দেশনা

সুপ্রিম কোর্ট (আব্দুল মজিদ বনাম জাহানারা, 37 DLR 310) নজিরে স্পষ্ট করেছেন যে, পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে পক্ষকে বিচারবঞ্চিত করা সমীচীন নয়। পরীক্ষায় ৯ আদেশের ৯ নিয়মে দরখাস্তের সাথে ৫ ধারার আবেদনের সমন্বয় এবং বিলম্বের উপযুক্ত কারণ উপস্থাপন বিশদভাবে আলোচনা করতে হবে।

আইনি সারসংক্ষেপ: অতএব, তামাদি আইনের ৫ ধারা ও দেওয়ানি কার্যবিধির ৯ আদেশের ৯ নিয়মের সুষম প্রয়োগের মাধ্যমে উপযুক্ত খরচের শর্তে খারিজকৃত মোকদ্দমা পুনরুজ্জীবিত করে পক্ষগণের গুণাগুণের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করা যায়।

উচ্চ আদালতের নজির: (এম এ সালাম বনাম বাংলাদেশ, 54 DLR 212) অনুযায়ী বিলম্ব মওকুফের ক্ষেত্রে আদালতের সুবিবেচনা মক্কেলের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকারকেই সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়ে থাকে।

সুপ্রিম কোর্ট (খলিলুর রহমান বনাম রাষ্ট্র, 45 DLR 167) নজিরে রায় দেন যে, পর্যাপ্ত কারণ প্রমাণিত হলে আদালত মোকদ্দমা পুনর্বহাল করতে দ্বিধা করবেন না।

Related Articles

Back to top button