[গেজেট] বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) আইন, ২০২৩ (৩৫ নং আইন): ফসলি জমি ও নদীর তীর সুরক্ষা এবং কঠোর শাস্তির অফিশিয়াল গেজেট বিশ্লেষণ

🏛️ বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ও সরকারি মুদ্রণালয় — অতিরিক্ত গেজেট
আইন নম্বর ও বছর:
২০২৩ সনের ৩৫ নং আইন (সংশোধনী আইন)
গেজেট প্রকাশের তারিখ:
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ
সংশোধিত মূল আইন:
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (২০১০ সনের ৬২ নং আইন)
আইনগত ক্ষেত্র:
পরিবেশ সংরক্ষণ, নদী রক্ষা, সেতু ও কৃষিজমির উর্বর মাটি সুরক্ষা

📥 অফিশিয়াল সরকারি গেজেট PDF ডাউনলোড ও পাঠাগার

বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) আইন, ২০২৩ (২০২৩ সনের ৩৫ নং আইন)-এর বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (BG Press) কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য গেজেট নিচে সরাসরি ডাউনলোড ও পাঠের জন্য সংযুক্ত করা হলো:

📜 সংসদীয় গেজেট: ২০২৩ সনের ৩৫ নং আইন (বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা সংশোধন)
প্রকাশের তারিখ: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ | পৃষ্ঠা: ৭ | আকার: ৩৭১ কিলোবাইট | উৎস: বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেস)

📄 এই পেজেই সরাসরি অফিশিয়াল গেজেট প্রিভিউ দেখুন (ক্লিক করুন)


বাংলাদেশে অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে নদী ও ফসলি জমি থেকে বালু-মাটি উত্তোলনের কারণে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার সরকারি সেতু, সড়ক, মহাসড়ক, বাঁধ এবং গ্রামীণ বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছিল। ২০১০ সালের বালুমহাল আইনে জরিমানা ও সাজার পরিমাণ কম থাকায় বালু খেকো প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সামান্য জরিমানা দিয়ে বারংবার একই অপরাধে লিপ্ত হতো। তদুপরি, ইটভাটার জন্য কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি (Topsoil) কেটে ফেলার কারণে দেশের কৃষি উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছিল।

এই সর্বনাশা অপতৎপরতা রুখতে জাতীয় সংসদ কর্তৃক প্রণীত হয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে বাংলাদেশ গেজেটে “বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) আইন, ২০২৩” প্রকাশিত হয়। এই সংশোধনের মাধ্যমে অবৈধ বালু-মাটি উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন কঠোর শাস্তি, ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড এবং অপরাধে ব্যবহৃত ড্রেজার-যানবাহন তাৎক্ষণিক জব্দ ও স্পট নিলাম বিক্রয়ের সংবিধিবদ্ধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।


১. আইনটির যুগান্তকারী পরিবর্তন ও সংশোধিত ধারাসমূহ

সংশোধিত ধারা সংশোধনের পূর্বে (২০১০ সালের বিধান) নতুন গেজেট অনুযায়ী সংশোধিত বিধান (২০২৩)
ধারা ৪ ও ৫ (উত্তোলন এলাকা) সেতু বা অবকাঠামোর নিকটবর্তী বিষয়ে অস্পষ্টতা ছিল। যেকোনো সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, রেললাইন, সড়ক বা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ১ কিলোমিটারের মধ্যে বালু-মাটি উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ধারা ৮ (কৃষিজমির টপসয়েল) কৃষিজমির উপরিভাগ কাটা বিষয়ে দুর্বল নজরদারি। কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটি (Topsoil) কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও জামিন-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য।
ধারা ১৫ (শাস্তি ও জরিমানা) সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা ১ বছরের কারাদণ্ড। সর্বোচ্চ ২ বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড।
ধারা ১৮এ (নতুন সংযোজন) কোনো তাৎক্ষণিক নিলামের ব্যবস্থা ছিল না। অবৈধ কাজে ব্যবহৃত ড্রেজার, এক্সকাভেটর, বাল্কহেড ও ট্রাক তাৎক্ষণিক জব্দ ও প্রকাশ্য স্পট নিলামে বিক্রয় করার ক্ষমতা।

২. সেতু, বাঁধ ও নদীর তীরে ১ কিলোমিটারের রেড জোন

সংশোধিত আইনের ৪ ধারা মোতাবেক পরিবেশ ও ভৌগোলিক সুরক্ষার্থে সরকার কয়েকটি সুনির্দিষ্ট এলাকাকে কঠোরভাবে সুরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছে:

  • ১ কিলোমিটারের নিষিদ্ধ বলয়: যেকোনো নদীর ওপর নির্মিত সেতু, কালভার্ট, স্লুইসগেট, নদী রক্ষা বাঁধ, মহাসড়ক কিংবা আবাসিক জনপদের সীমানা থেকে সর্বনিম্ন ১ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে কোনো বালুমহাল ইজারা দেওয়া যাবে না বা বালু তোলা যাবে না।
  • রাতের আঁধারে উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ: সূর্যাস্তের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত (রাতের বেলায়) যেকোনো ধরনের বালু ও মাটি উত্তোলন, লোডিং বা নৌপথে পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  • ম্যানুয়াল বনাম ড্রেজিং পদ্ধতি: পরিবেশ অধিদপ্তরের হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভে রিপোর্ট ছাড়া ড্রেজার বা মেকানাইজড পাম্প চালানো যাবে না।

৩. কৃষিজমির উর্বর মাটি (Topsoil) সুরক্ষা

দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনের ৮ ধারায় বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি নিজের মালিকানাধীন কৃষিজমি হলেও তার উর্বর উপরিভাগের মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রয় করতে পারবেন না। কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন করে পুকুর খনন বা বাণিজ্যিক মাটি উত্তোলনের পূর্বে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও কৃষি কর্মকর্তার যৌথ অনুমোদন গ্রহণ বাধ্যতামূলক।

🚨 নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত (Mobile Court) ক্ষমতা:

মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর তফসিলে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অন্তর্ভুক্ত থাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ ঘটনাস্থলেই অবৈধ বালু ব্যবসায়ীদের আটক, ড্রেজারের পাইপ ধ্বংস, সরঞ্জাম সিজ এবং অনধিক ২ বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা প্রদান করতে পারছেন।

৪. সাধারণ নাগরিক ও কৃষকদের প্রতিকার পাওয়ার উপায়

আপনার এলাকায় যদি কেউ অবৈধ ড্রেজার বসিয়ে ফসলি জমি কেটে নেয় বা নদী ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি করে, তবে স্থানীয় জনগণ নিম্নলিখিত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন:

১
ইউএনও বা জেলা প্রশাসকের নিকট লিখিত অভিযোগ

ঘটনাস্থলের ছবি বা ভিডিও ফুটেজসহ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট তাৎক্ষণিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করুন।

২
১৬১২২ হটলাইনে সরাসরি অভিযোগ

ভূমি মন্ত্রণালয়ের সার্বক্ষণিক কল সেন্টার ১৬১২২ নম্বরে ডায়াল করে অবৈধ বালু-মাটি উত্তোলনের সুনির্দিষ্ট স্থান জানিয়ে অভিযোগ রেকর্ড করানো যায়।

৫. সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

১. বৈধ ইজারাদার কি নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে বালু তুলতে পারেন?
কখনোই না। সরকারি ইজারায় চতুর্সীমা এবং জিও-কোঅর্ডিনেটস স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে। সীমানার বাইরে ১ ফুট গিয়ে বালু তুললেও তা সরাসরি চুরির অপরাধ এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
২. জব্দকৃত বালু ও ড্রেজার দিয়ে কী করা হয়?
নতুন ধারা ১৮এ অনুযায়ী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলেই জব্দ তালিকা প্রস্তুত করে তাৎক্ষণিক উন্মুক্ত ডাক বা নিলামে বিক্রি করে সমুদয় অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা প্রদান করবেন।

📌 প্রামাণিক সরকারি সূত্র ও আইন রেফারেন্স:

  • বাংলাদেশ গেজেট (অতিরিক্ত সংখ্যা), প্রকাশনা তারিখ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ।
  • বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) আইন, ২০২৩ (আইন নং ৩৫)।
  • আইন ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন (bdlaws.minlaw.gov.bd)।
  • ভূমি মন্ত্রণালয়, প্রশাসন ও আইন উইং (minland.gov.bd)।
Back to top button