পুলিশ রিপোর্ট ও সুরতহাল প্রতিবেদনে আবশ্যিকভাবে উল্লেখ্য বিষয়সমূহ | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৬
প্রশ্ন ৪। (খ): পুলিশ রিপোর্ট এবং সুরতহাল প্রতিবেদনে কোন বিষয়গুলো আবশ্যিকভাবে উল্লেখ করতে হয়? [৭]
১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট
ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত প্রক্রিয়ায় দুটি দালিলিক ভিত্তি অত্যন্ত সংবেদনশীল—একটি হলো মামলার তদন্ত শেষে ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট দাখিলকৃত ‘পুলিশ রিপোর্ট’ (Police Report under Section 173) এবং অন্যটি হলো অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্রাথমিক কারণ অনুসন্ধানে প্রস্তুতকৃত ‘সুরতহাল প্রতিবেদন’ (Inquest Report under Section 174)। অত্র প্রশ্নে এই দুটি নথিতে আবশ্যিকভাবে কোন কোন উপাদান অন্তর্ভুক্ত করতে হয়—তা সুনির্দিষ্টভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইনি বিধানাবলী (Statutory Provisions)
- The Code of Criminal Procedure, 1898:
- Section 173: তদন্ত সমাপ্তির পর পুলিশ অফিসারের রিপোর্ট (Report of police officer on completion of investigation)।
- Section 174: পুলিশ কর্তৃক অপমৃত্যু বা আত্মহত্যার তদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদন (Police to inquire and report on suicide, etc.)।
- Police Regulations Bengal, 1943 (PRB): রেগুলেশন ২৫৩ ও ২৯৯।
৩. বিশদ আইনি বিশ্লেষণ ও প্রশ্নের উত্তর
(১) পুলিশ রিপোর্টে (Section 173 CrPC) আবশ্যিকভাবে উল্লেখ্য বিষয়সমূহ:
তদন্তকারী কর্মকর্তা (I.O.) তদন্ত সমাপ্তির পর ধারা ১৭৩(১) অনুযায়ী সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ফরমে পুলিশ রিপোর্ট (চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্ট) দাখিল করবেন। এতে আবশ্যিকভাবে নিম্নলিখিত তথ্যসমূহ উল্লেখ করতে হবে:
- পক্ষগণের নাম ও পরিচয়: নালিশকারী/বাদী এবং আসামীগণের পূর্ণাঙ্গ নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা।
- সংবাদের প্রকৃতি: অপরাধ বা ঘটনার মূল সংক্ষিপ্ত বিবরণী।
- সাক্ষীদের তালিকা: ঘটনা সম্পর্কে অবহিত আছেন এমন সকল সাক্ষীর নাম ও ঠিকানা (যাদের আদালতে উপস্থাপন করা হবে)।
- অপরাধ সংঘটনের প্রাথমিক সত্যতা: কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় কি না এবং হয়ে থাকলে তা কোন ব্যক্তি কর্তৃক সংঘটিত হয়েছে।
- গ্রেফতার বা জামিন স্থিতি: আসামী গ্রেফতার হয়েছে কি না, পলাতক রয়েছে কি না, কিংবা জামিনে মুক্ত আছে কি না।
- হাজতে প্রেরণ বা মুক্তি: ধারা ১৭০ অনুসারে আসামীকে ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে কি না, বা ধারা ১৬৯ অনুসারে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কি না।
- আলামত ও অস্ত্রশস্ত্রের বিবরণ: জব্দকৃত মালামাল বা আলামতসমূহ আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে কি না।
(২) সুরতহাল প্রতিবেদনে (Section 174 CrPC – Inquest Report) আবশ্যিকভাবে উল্লেখ্য বিষয়সমূহ:
অস্বাভাবিক, আত্মহত্যা বা আকস্মিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে পুলিশ অফিসার দুই বা ততোধিক গণ্যমান্য প্রতিবেশীর উপস্থিতিতে মৃতদেহের বাহ্যিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করবেন। এতে আবশ্যিকভাবে থাকবে:
- লাশের সুরত ও বাহ্যিক অবস্থান: মৃতদেহ কোন অবস্থায়, কোন ভঙ্গিতে এবং কোথায় পাওয়া গেছে তার বর্ণনা।
- আঘাত ও ক্ষতের বিশদ বিবরণ: শরীরে কোনো দাগ, ক্ষতচিহ্ন, হাড়ভাঙা, রক্তপাত বা আঘাতের চিহ্ন আছে কি না এবং তা কী ধরনের অস্ত্র বা বস্তুর দ্বারা সৃষ্ট বলে মনে হয়।
- মৃত্যুর আপাত কারণ: আঘাত, ফাঁসি, পানিতে ডোবা, বিষপ্রয়োগ, নাকি কোনো বন্য পশুর আক্রমণ বা দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটেছে—তার দৃশ্যমান অভিমত।
- পোশাক-পরিচ্ছদ ও শনাক্তকরণ: লাশের পরনে থাকা পোশাকের বিবরণ এবং লাশ শনাক্তকারী ব্যক্তিদের নাম।
- সুরতহালকারী ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর: তদন্তকারী পুলিশ অফিসার এবং সুরতহালে উপস্থিত স্থানীয় সাক্ষীদের যৌথ স্বাক্ষর।
৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স
১. হাসেম আলী বনাম রাষ্ট্র (35 DLR 142): সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন যে, সুরতহাল প্রতিবেদন হলো মৃত্যুর দৃশ্যমান শারীরিক আঘাতের নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ। এতে যদি কোনো আঘাতের উল্লেখ না থাকে অথচ পোস্টমর্টেম রিপোর্টে গভীর জখম থাকে, তবে তদন্তের বস্তুনিষ্ঠতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
২. রাষ্ট্র বনাম আবুল কাশেম (42 DLR 28): হাইকোর্ট বিভাগ অভিমত দেন যে, ১৭৩ ধারার পুলিশ রিপোর্টে সাক্ষীদের নাম ও আসামীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের অনুপস্থিতি ম্যাজিস্ট্রেটের কগনিজেন্স গ্রহণকে ব্যাহত করে।
৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত
সুতরাং, ১৭৩ ধারার পুলিশ রিপোর্ট হলো সমগ্র মামলার বিচার শুরু করার আনুষ্ঠানিক রোডম্যাপ, আর ১৭৪ ধারার সুরতহাল প্রতিবেদন হলো লাশের বাহ্যিক আঘাত ও মৃত্যুর দৃশ্যমান প্রাথমিক কারণ নিশ্চিতকরণের ভিত্তিপ্রস্তর।
🏛️ সম্পর্কিত প্রশ্নপত্র: এই প্রশ্নটি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অ্যাডভোকেট তালিকাভুক্তির লিখিত পরীক্ষা ২০২৬-এর প্রশ্নপত্রে অন্তর্ভুক্ত। সম্পূর্ণ বিগত বছরের প্রশ্নব্যাংক দেখতে আমাদের মূল আর্কাইভে প্রবেশ করুন।
