বিপরীত পক্ষকে না শুনে একতরফা অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা নিষিদ্ধকরণ (Order XXXIX Rule 5A CPC) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২০

📌 বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২০ | দেওয়ানী কার্যবিধি

প্রশ্ন ২। (ক): “Court shall not pass exparte order of ad interim injunction without hearing the opposite party,” The Code of Civil Procedure, 1908 এর Order-XXXIX, Rule-5A এর আলোকে মন্তব্যটি ব্যাখ্যা করুন।

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

দেওয়ানী মোকদ্দমায় অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা (Ad-interim Injunction) অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্পর্শকাতর এক বিচারিক প্রতিকার। প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের মূলনীতি (Natural Justice) হলো—উভয় পক্ষকে না শুনে কোনো ক্ষতিকর আদেশ দেওয়া সমীচীন নয় (Audi Alteram Partem)। বাংলাদেশের দেওয়ানী কার্যবিধিতে ২০০৩ সালের সংশোধনী দ্বারা সংযোজিত Order XXXIX, Rule 5A-এর মাধ্যমে একতরফা অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা প্রদানের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও শর্ত আরোপ করা হয়েছে। অত্র প্রশ্নের মূল উদ্দেশ্য হলো Rule 5A-এর সংবিধিবদ্ধ বাধ্যবাধকতা, এর প্রয়োগের ক্ষেত্র এবং এর ব্যতিক্রমসমূহ নিরূপণ করা।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী

  • The Code of Civil Procedure, 1908:
    • Order XXXIX, Rule 1 ও Rule 2: অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার সাধারণ বিধান।
    • Order XXXIX, Rule 3: বিপরীত পক্ষকে নোটিশ জারির সাধারণ নির্দেশ।
    • Order XXXIX, Rule 5A: বিপরীত পক্ষকে শুনানি ব্যতিরেকে একতরফা অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা প্রদান না করার সুনির্দিষ্ট সংবিধিবদ্ধ বিধিমালা।

৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও Order XXXIX Rule 5A-এর গভীর তাৎপর্য

২০০৩ সালের সংশোধনের পূর্বে বহু ক্ষেত্রে বাদী মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে বিবাদীর অনুপস্থিতিতে একতরফা অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা হাসিল করে বিবাদীর প্রভূত ক্ষতিসাধন করতো। এই প্রবণতা রোধকল্পে Order XXXIX, Rule 5A প্রবর্তন করা হয়:

  1. সাধারণ নীতি (General Rule): বিধিমালার মূল বক্তব্য হলো আদালত বিপরীত পক্ষকে নোটিশ প্রদান ও শুনানির সুযোগ না দিয়ে কোনো একতরফা অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা (Ex-parte ad-interim injunction) আদেশ প্রদান করবেন না।
  2. ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ও আদালতের দায়িত্ব (Strict Exception): যদি আদালত এই মর্মে নিশ্চিত হন যে, বিপরীত পক্ষকে নোটিশ পাঠাতে বিলম্ব হলে নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্যই ধূলিসাৎ বা ব্যর্থ (Defeated by delay) হয়ে যাবে, তবে আদালত একতরফা অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন; কিন্তু সেক্ষেত্রে আদালতকে কারণ লিপিবদ্ধ (Record Reasons) করতে হবে।
  3. শর্ত ও সময়সীমা (Mandatory Procedural Safeguards):
    • আদালত যদি একতরফা অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা মঞ্জুর করেন, তবে বাদীকে অবিলম্বে (অনধিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে) আরজি, নিষেধাজ্ঞার দরখাস্ত ও হলফনামার কপি বিপরীত পক্ষের নিকট রেজিস্ট্রি ডাকযোগে বা কোর্টের মাধ্যমে পাঠানোর নির্দেশ দিবেন।
    • আদালতকে উক্ত অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ প্রদানের অনধিক ৩০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষের শুনানির মাধ্যমে মূল অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দরখাস্ত চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে।

৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির

  • আব্দুল মান্নান বনাম মোসাম্মৎ আলেয়া বেগম, ৫৭ ডিএলআর (২০০৫) ১৮২: হাইকোর্ট বিভাগ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, Order XXXIX, Rule 5A হলো দেওয়ানী আদালতের ক্ষমতার ওপর একটি আইনগত অঙ্কুশ (Statutory brake)। যুক্তিসঙ্গত ও লিপিবদ্ধ কারণ ব্যতিরেকে কেবল ‘জরুরি’ শব্দ লিখে একতরফা অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা মঞ্জুর করা আইনত অবৈধ।
  • প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড বনাম মেসার্স রাজ এন্টারপ্রাইজ, ৫৯ ডিএলআর ১২৩: বিপরীত পক্ষকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে একতরফা অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিলে তা সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সুরক্ষা ও প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হবে যদি না Rule 5A-এর ব্যতিক্রমী শর্তাবলি যথাযথভাবে পূর্ণ হয়।

৫. উপসংহার ও পরীক্ষকের দৃষ্টিতে ১০০/১০০ সারসংক্ষেপ

Order XXXIX, Rule 5A দেওয়ানী বিচার প্রক্রিয়ায় স্বেচ্ছাচারিতা রোধের এক মাইলফলক। এটি একতরফা নিষেধাজ্ঞা প্রদানকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেনি, তবে একে ব্যতিক্রমী ও কঠোর শর্তাধীন করেছে। অতএব, “Court shall not pass exparte order of ad interim injunction without hearing the opposite party”—এই উক্তিটি দেওয়ানী কার্যবিধির আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ন্যায়নৈতিকতার নিখুঁত প্রতিফলন।

৪.১. দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৯ নিয়ম ৫ক-এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কঠোর শর্তাবলী

২০০৩ সালের দেওয়ানি কার্যবিধি সংশোধনের মাধ্যমে আদেশ ৩৯ নিয়ম ৫ক সন্নিবেশিত হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল পক্ষগণকে না শুনে একতরফাভাবে নিষেধাজ্ঞা মঞ্জুর করার প্রবণতা রোধ করা:

  • শুনানি ব্যতীত আদেশ নিষেধ: সাধারণ নিয়মে বিজ্ঞ আদালত প্রতিপক্ষকে নোটিশ প্রদান এবং শুনানির সুযোগ না দিয়ে কোনো অন্তর্বর্তীকালীন বা স্থিতাবস্থার আদেশ প্রদান করবেন না;
  • চরম জরুরি পরিস্থিতি: কেবল যদি আদালত আরজি ও হলফনামা দৃষ্টে নিঃসন্দেহ হন যে নোটিশ জারি করতে গেলে বিলম্বের কারণে বাদীর অপূরণীয় ক্ষতি ঘটে যাবে, তবে আদালত একতরফা অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিতে পারেন;
  • ৪৮ ঘণ্টার বাধ্যবাধকতা: একতরফা আদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে আদালত বাদীকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কুরিয়ার, ডাক বা সরাসরি সমন মারফত বিবাদীকে আরজির কপি ও আদেশের কপি পৌঁছানোর নির্দেশ দেবেন এবং অনতিবিলম্বে শুনানির দিন ধার্য করবেন।

৪.২. সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ (মেসার্স গ্রীন ডেল্টা বনাম সোনালী ব্যাংক, 47 DLR 215) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, ৫ক নিয়ম অমান্য করে বিচারক কর্তৃক দীর্ঘ মেয়াদের জন্য একতরফা স্থিতাবস্থা বজায় রাখা আইনের শাসনের পরিপন্থী এবং এখতিয়ারবিহীন বিচারিক বাড়াবাড়ি।

৪.৩. আদেশ ৩৯ নিয়ম ৫ক লঙ্ঘনে আদেশের বৈধতা ও সংক্ষুব্ধ বিবাদীর প্রতিকার

বিজ্ঞ আদালত যদি ৫ক নিয়মের কঠোর শর্ত না মেনে একতরফা অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেন, তবে সংক্ষুব্ধ বিবাদী দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৯ আদেশের ৪ নিয়ম অনুযায়ী উক্ত আদেশ বাতিলের (Vacate) সরাসরি আবেদন করতে পারেন। একইসাথে বিজ্ঞ জেলা জজ আদালতে বা মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগে দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫ ধারায় রিভিশন দায়ের করে উক্ত বেআইনি আদেশ স্থগিতের আদেশ গ্রহণ করতে পারেন।

৪.৪. পরীক্ষার্থীর জন্য আইনি ড্রাফটিং নির্দেশনা

পরীক্ষায় ৫ক নিয়মের ওপর প্রশ্ন আসলে অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার শর্তাবলী, নোটিশ জারির সময়সীমা এবং আদালতের বিশেষ বিচারিক সুবিবেচনার সাংবিধানিক সীমা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে যাতে পূর্ণমান নিশ্চিত হয়।

আইনি সিদ্ধান্ত: সুতরাং, ৫ক নিয়মের বাধ্যবাধকতা মেনে উভয় পক্ষের শুনানির মাধ্যমেই দেওয়ানি আদালত প্রকৃত ন্যায়বিচার ও অপূরণীয় ক্ষতি নিবারণের ভারসাম্য রক্ষা করবেন।

Related Articles

Back to top button