প্লিডিংস কেবল উপাদানগত তথ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হবে (Order VI Rule 2 CPC) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৩

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২৩
প্রশ্ন ১। (ক): প্লিডিংস কেবল উপাদানগত তথ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হবে (Order VI Rule 2 CPC) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৩

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

দেওয়ানী বিচার ব্যবস্থায় আরজি (Plaint) এবং লিখিত জবাব (Written Statement)—উভয়কে একত্রে প্লিডিংস (Pleadings) বলা হয় (Order VI, Rule 1)। প্লিডিংসের মাধ্যমেই পক্ষগণ তাদের বিরোধের পরিধি আদালতে সুনির্দিষ্ট করে। পক্ষগণ প্লিডিংসে যা দাবি করবেন না, শুনানীর সময় তা কোনো সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণ করার অধিকার থাকে না। দেওয়ানী কার্যবিধির ৬ আদেশের ২ বিধিতে প্লিডিংস প্রণয়নের এক সুবর্ণ মূলনীতি বিধিবদ্ধ রয়েছে: “Pleading shall contain only material facts”। অত্র প্রশ্নে এই আইনি ম্যাক্সিমের অন্তর্নিহিত অর্থ, ৪টি মৌলিক উপাদান এবং ব্যতিক্রমসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী

The Code of Civil Procedure, 1908 এর Order VI, Rule 2 এ প্লিডিংসের মৌলিক বিধান বিবৃত রয়েছে:

“Every pleading shall contain, and contain only, a statement in a concise form of the material facts on which the party pleading relies for his claim or defence, as the case may be, but not the evidence by which they are to be proved, and shall, when necessary, be divided into paragraphs, numbered consecutively.”

৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও গভীর আইনি ব্যাখ্যা

প্লিডিংসের ৪টি মৌলিক সুবর্ণ নীতি (Golden Rules of Pleadings)

Order VI, Rule 2 বিশ্লেষণ করলে চারটি সুনির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা পাওয়া যায়:

  1. ১. কেবল তথ্য উল্লেখ করতে হবে, আইন নয় (Plead facts, not Law):
    • পক্ষগণের দায়িত্ব হলো তাদের বিরোধের সাথে সংশ্লিষ্ট বাস্তব তথ্যসমূহ (Facts) আদালতের সামনে উপস্থাপন করা।
    • কোন আইনে কোন ধারায় বিচার হবে, তামাদির মেয়াদ কত বা আইনের ব্যাখ্যা কী হবে—তা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের। প্লিডিংসে আইনের ধারা বা দীর্ঘ আইনি নজির উদ্ধৃত করা নিষিদ্ধ ও বাহুল্য।
  2. ২. উপাদানগত তথ্য উল্লেখ করতে হবে (Material facts only):
    • যে তথ্য বাদীর মোকদ্দমার কারণ (Cause of Action) প্রতিষ্ঠা করে অথবা বিবাদীর আত্মপক্ষ সমর্থনের মূল ভিত্তি তৈরি করে, তাকে Material Facts (Facta Probanda) বলে।
    • অপ্রাসঙ্গিক কোনো ঐতিহাসিক পটভূমি, পারিবারিক কলহের অপ্রয়োজনীয় বিবরণ প্লিডিংসে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। কোনো উপাদানগত তথ্য বাদ পড়লে পরবর্তীতে আদালত তা বিবেচনা করবেন না।
  3. ৩. সাক্ষ্য-প্রমাণ উল্লেখ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (Not Evidence):
    • তথ্য প্রমাণের জন্য যে সাক্ষ্য (Facta Probantia) শুনানীর সময় আদালতে উপস্থাপন করা হবে, তা প্লিডিংসে লেখার প্রয়োজন নেই।
    • যেমন: “বাদী অমুক তারিখে জমি ক্রয় করিয়াছেন”—এটি উপাদানগত তথ্য; কিন্তু দলিলে কে কে সাক্ষী ছিলেন বা কোন কলম দিয়ে স্বাক্ষর করা হয়েছে তা সাক্ষ্য-প্রমাণ, যা শুনানীর সময় সাক্ষ্য হিসেবে আসবে।
  4. ৪. সংক্ষিপ্ত ও সুস্পষ্টভাবে পরিচ্ছেদ আকারে প্রকাশ (In a concise form):
    • প্লিডিংস হতে হবে পরিমিত, সুস্পষ্ট এবং পর্যায়ক্রমিক সংখ্যাযুক্ত সংক্ষিপ্ত অনুচ্ছেদে (Paragraphs) বিভক্ত। তারিখ, সংখ্যা ও পরিমাণ কথায় ও অঙ্কে লিখতে হবে।

৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স

১. বীরেন্দ্র কাশিওয়ানা বনাম বিনায়ক জোশী (1999 1 SCC 534): আদালত রায় দেন যে, প্লিডিংসে কোনো উপাদানগত তথ্য না থাকলে শুনানীর পর্যায়ে সাক্ষ্য দিয়ে তা প্রতিস্থাপন করা যায় না; পক্ষগণ নিজেদের প্লিডিংসের গণ্ডির বাইরে কোনো নতুন সাক্ষ্য উপস্থাপন করতে পারেন না।

২. হাজী মফিজুর রহমান বনাম আব্দুল জলিল (46 DLR 212): প্লিডিংসে অপ্রাসঙ্গিক বা সাক্ষ্যমূলক বিষয় সন্নিবেশিত হলে প্রতিপক্ষ দেওয়ানি কার্যবিধির ৬ আদেশের ১৬ বিধি অনুযায়ী তা কেটে বাদ দেওয়ার (Striking out pleadings) আবেদন করতে পারেন।

৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত

দেওয়ানি কার্যবিধির ৬ আদেশের ২ বিধি দেওয়ানি মুসাবিদার মূল দর্শন। প্লিডিংসে কেবল উপাদানগত তথ্যের পরিমিত সন্নিবেশ বিচারিক সময় সাশ্রয় করে এবং মামলার প্রকৃত বিরোধীয় বিষয়কে নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করতে সহায়তা করে।

৪. উপাদানগত তথ্য বনাম সাক্ষ্যের পার্থক্য: Facta Probanda ও Facta Probantia

দেওয়ানি কার্যবিধির ৬ আদেশের ২ নিয়মের মূলে রয়েছে দুটি ল্যাটিন আইনশাস্ত্রীয় ধারণা:

  • Facta Probanda (উপাদানগত তথ্য): যে সকল মৌলিক তথ্য বাদী বা বিবাদীকে তার দাবি প্রমাণের জন্য প্লিডিংসে আবশ্যিকভাবে উল্লেখ করতে হয়। যেমন- চুক্তির তারিখ, জমি জবরদখলের তারিখ ইত্যাদি;
  • Facta Probantia (সাক্ষ্য-প্রমাণ): যে সকল দালিলিক বা মৌখিক সাক্ষ্য দ্বারা উক্ত তথ্য আদালতে প্রমাণিত হবে। এগুলো আরজিতে বা লিখিত জবাবে লেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ;
  • প্লিডিংস বাতিলের আদেশ (আদেশ ৬ নিয়ম ১৬): প্লিডিংসে অপ্রয়োজনীয় সাক্ষ্য, কুৎসা বা অবান্তর বিষয় লিপিবদ্ধ করলে আদালত তা কর্তন বা বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন।

৫. সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির

সুপ্রিম কোর্ট (মজিবুর রহমান বনাম মোস্তফা, 48 DLR 210) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, প্লিডিংসের বাইরে কোনো সাক্ষ্য আদালত গ্রহণ করবেন না; আবার প্লিডিংসে সাক্ষ্য বর্ণনা করে আরজির কলেবর অনর্থক বৃদ্ধি করা আইনি ড্রাফটিংয়ের মৌলিক নীতি পরিপন্থী।

৬. আরজি বা জবাব সংশোধনে উপাদানগত তথ্যের গুরুত্ব (আদেশ ৬ নিয়ম ১৭)

মোকদ্দমার যেকোনো পর্যায়ে পক্ষগণ আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে প্লিডিংস সংশোধন করতে পারেন। তবে সংশোধনের ক্ষেত্রে আদালতের প্রতিষ্ঠিত অনুশাসন হলো:

  • সংশোধনের মাধ্যমে কোনো নতুন মোকদ্দমার সৃষ্টি বা দাবির মূল প্রকৃতির (Fundamental Nature) পরিবর্তন ঘটানো যাবে না;
  • যে তথ্য বাদ পড়েছিল তা যদি মোকদ্দমার গুণাগুণ বিচারের জন্য অপরিহার্য উপাদানগত তথ্য (Material Fact) হয়, তবে বিলম্ব হলেও আদালত শর্তসাপেক্ষে সংশোধনের অনুমতি দেবেন;
  • সুপ্রিম কোর্ট (আমির হোসেন বনাম মমতাজ বেগম, 44 DLR 170) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে আরজি বা লিখিত জবাব সংশোধন আদালতের এক উদার সুবিবেচনামূলক ক্ষমতা।

আইনি সিদ্ধান্ত: অতএব, দেওয়ানি কার্যবিধির ৬ আদেশের ২ নিয়মের অনুশাসন অক্ষরে অক্ষরে পালন করে আরজিতে কেবল সারসংক্ষেপ ও উপাদানগত তথ্য লিপিবদ্ধ করা এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ শুনানির জন্য সংরক্ষণ করাই একজন দক্ষ আইনজীবীর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

Related Articles

Back to top button