আদালত বন্ধ ও ছুটি পরবর্তী সময়ে তামাদি গণনা সমস্যা সমাধান (Limitation Act Section 4) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২০

📌 বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২০ | তামাদি আইন

প্রশ্ন ১১। (খ): ধরুন, একটি দেওয়ানী মোকদ্দমা দায়ের করার নির্ধারিত তামাদির মেয়াদ শেষ ছিল ১৪/১০/২০২০ খ্রিঃ তারিখ। ১৫/১০/২০২০ খ্রিঃ তারিখ দেওয়ানী আদালত খোলা ছিল এবং সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ বিচারক ঐদিন পর্যন্ত ছুটিতে ছিলেন। ১৫/১০/২০২০ খ্রিঃ তারিখে বাদীর বাবাও মৃত্যুবরণ করেন। ১৩/১০/২০২০ ও ১৪/১০/২০২০ খ্রিঃ তারিখ সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছিল। ১৬/১০/২০২০ খ্রিঃ তারিখ সরকার ঘোষিত দেশব্যাপী বিশেষ ছুটি ছিল। ১২/১০/২০২০ ও ১৭/১০/২০২০ খ্রিঃ তারিখ কর্মদিবস ছিল। এই অবস্থায় সংশ্লিষ্ট আইন উল্লেখে মোকদ্দমাটি দায়ের করার সর্বশেষ তারিখ নির্ধারণ করুন।

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

প্রদত্ত সমস্যাটি তামাদি আইন, ১৯০৮-এর ধারা ৪ (আদালত বন্ধ থাকার দিনে তামাদির মেয়াদ শেষ হওয়া) এবং ধারা ৫ (বিলম্ব মওকুফ)-এর সূক্ষ্ম বিচারিক প্রয়োগের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তামাদির শেষ দিন আদালত বন্ধ থাকলে পরবর্তী আদালত খোলার দিনে মামলা দায়েরের অধিকার জন্মায়। কিন্তু বিচারক ছুটিতে থাকা, বাদীর পিতার মৃত্যু এবং পরবর্তী সাধারণ ছুটির দিনগুলোর মধ্যে দেওয়ানী আদালতের কার্যপদ্ধতি অনুসারে মামলাটি দায়েরের সর্বশেষ আইনসম্মত তারিখ কোনটি হবে—তা নির্ধারণ করাই অত্র সমস্যার লক্ষ্য।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী

  • The Limitation Act, 1908:
    • Section 4: Expiry of period when court is closed (আদালত বন্ধ থাকাকালে তামাদির মেয়াদ শেষ হলে আদালত খোলার প্রথম দিন মামলা দায়ের করা যাবে)।
    • Section 5: মূল মোকদ্দমায় (Suit) প্রযোজ্য নয়; ফলে পিতার মৃত্যুতে বিলম্ব মওকুফের আবেদন চলে না।
    • Civil Courts Act, 1887: বিচারক ছুটিতে থাকলেও দেওয়ানী আদালতের অফিস খোলা থাকলে আরজি গ্রহণকারী কর্মকর্তা (Sheristadar) আরজি গ্রহণ করতে পারেন।

৩. দিনভিত্তিক ঘটনাপ্রবাহ ও গাণিতিক বিশ্লেষণ

  • ১৪/১০/২০২০: তামাদির নির্ধারিত শেষ দিন ছিল। কিন্তু ১৩ ও ১৪ তারিখ সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছিল (Court was closed)।
  • ধারা ৪-এর প্রত্যক্ষ সুবিধা: যেহেতু তামাদির শেষ দিন (১৪/১০/২০২০) আদালত বন্ধ ছিল, সেহেতু The Limitation Act, 1908-এর ধারা ৪ অনুযায়ী আদালত খোলার প্রথম দিনেই মোকদ্দমাটি দাখিল করার অধিকার বাদী লাভ করেন।
  • ১৫/১০/২০২০-এর অবস্থা: প্রশ্নে স্পষ্ট বলা হয়েছে—“১৫/১০/২০২০ খ্রিঃ তারিখ দেওয়ানী আদালত খোলা ছিল”। যদিও বিচারক ছুটিতে ছিলেন, কিন্তু সিভিল কোর্টস অ্যাক্ট ও সিভিল রুলস অ্যান্ড অর্ডারস (CRO) অনুযায়ী আদালতের সেরেস্তাদার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিকট আরজি দাখিল করা যায়; বিচারক ছুটিতে থাকা মানে আদালত বন্ধ থাকা নয়।
  • বাদীর বাবার মৃত্যুর প্রভাব: ১৫/১০/২০২০ তারিখে বাদীর বাবা মারা যান। পারিবারিক ট্র্যাজেডি অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও তামাদি আইনের ৫ ধারা মূল মোকদ্দমা (Suit) দায়েরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ফলে পারিবারিক কারণে তামাদি বৃদ্ধির কোনো আইনি সুযোগ নেই।

বিকল্প বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি (যদি ১৫ তারিখও কার্যকরভাবে বন্ধ ধরা হয়):

যদি ধরে নেওয়া হয় যে সংশ্লিষ্ট এখতিয়ারসম্পন্ন বিচারক ছুটিতে থাকায় এবং কোনো ভারপ্রাপ্ত বিচারক না থাকায় বিচারপ্রার্থীর জন্য আদালত সেদিন কার্যত বন্ধ (Deemed closed) ছিল, তবে ঘটনা দাঁড়ায় নিম্নরূপ:

  • ১৬/১০/২০২০: সরকার ঘোষিত দেশব্যাপী বিশেষ ছুটি (Court Closed)।
  • ১৭/১০/২০২০: প্রশ্নে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—“১৭/১০/২০২০ খ্রিঃ তারিখ কর্মদিবস ছিল” (Court was Open)।

৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির

  • মকবুল আহমেদ বনাম অনোয়ার আলী, ৮ ডিএলআর (এডি) ২২: আদালত খোলা থাকা বলতে আদালতের অফিস বা আরজি গ্রহণের ব্যবস্থা খোলা থাকাকে বোঝায়। বিচারক এজলাসে না বসলেও সেরেস্তাদার আরজি গ্রহণের জন্য উপস্থিত থাকলে আদালত খোলা ছিল বলেই গণ্য হবে এবং সেদিনই মামলা দায়ের করতে হবে।
  • আব্দুল গফুর বনাম আব্দুল খালেক, ৩৫ ডিএলআর ৪২০: মূল মোকদ্দমায় তামাদি আইনের ৫ ধারা প্রযোজ্য নয়; সুতরাং ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বা আত্মীয়ের মৃত্যুর কারণে মূল মামলার তামাদি তামাদি আইনের ৫ ধারায় মওকুফ করা যায় না।

৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও মোকদ্দমা দাখিলের সর্বশেষ তারিখ

  1. মূল আইনি সিদ্ধান্ত: যেহেতু ১৪ তারিখ ছুটি শেষে ১৫/১০/২০২০ তারিখে আদালত খোলা ছিল এবং মূল মোকদ্দমায় ৫ ধারার সুবিধা পাওয়া যায় না, সেহেতু তামাদি আইনের ধারা ৪ অনুসারে মোকদ্দমাটি দাখিলের সর্বশেষ তারিখ ছিল ১৫/১০/২০২০ খ্রিষ্টাব্দ।
  2. যদি বিচারকের ছুটিতে থাকাকে আদালত বন্ধ গণ্য করা হয়: তবে ১৬ তারিখ বিশেষ ছুটির পর পরবর্তী উন্মুক্ত প্রথম কর্মদিবস অর্থাৎ ১৭/১০/২০২০ খ্রিষ্টাব্দ হবে মোকদ্দমাটি দাখিলের সর্বশেষ বৈধ তারিখ।

৪.১. আদালত বন্ধ পরবর্তী দিনে মোকদ্দমা দায়ের (তামাদি আইন ধারা ৪)

তামাদি আইনের ৪ ধারা বিচারপ্রার্থীদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সংবিধিবদ্ধ অধিকার:

  • মোকদ্দমা বা আপিল দায়েরের শেষ দিনে যদি আদালত বন্ধ থাকে (সাপ্তাহিক ছুটি, সরকারি ছুটি বা অবকাশকালীন ছুটি), তবে আদালত পুনরায় খোলার প্রথম দিনে মামলা দায়ের করলে তা সম্পূর্ণ মেয়াদভুক্ত বলে গণ্য হবে;
  • ৪ ধারা বনাম ৫ ধারার মৌলিক পার্থক্য: ৪ ধারার সুবিধা পাওয়ার জন্য তামাদি মওকুফের কোনো আবেদন করতে হয় না বা কোনো কারণ দর্শাতে হয় না; এটি আইনের স্বয়ংসক্রিয় সুবিধা (Matter of Right); পক্ষান্তরে ৫ ধারায় আনুষ্ঠানিক আবেদন ও ‘যথেষ্ট কারণ’ প্রমাণ আবশ্যক;
  • সুপ্রিম কোর্ট (মোহাম্মদ হোসেন বনাম সোনালী ব্যাংক, 52 DLR 188) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, আদালত বন্ধ থাকায় নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে না (Actus curiae neminem gravabit)।

৪.২. ছুটি চলাকালে দরখাস্ত দাখিলের অবকাশকালীন বিচারিক ব্যবস্থা

যদিও আদালত বন্ধের দিনে মামলা দায়ের আবশ্যক নয়, তবে চরম জরুরি পরিস্থিতিতে (যেমন- সম্পত্তি ধ্বংস রোধে জরুরি নিষেধাজ্ঞা প্রার্থনা) অবকাশকালীন ছুটি চলাকালে বিজ্ঞ ভ্যাকেশন জজ (Vacation Judge)-এর খাস কামরায় বিশেষ আবেদন দাখিলের সুযোগ রয়েছে, যা বিচারপ্রার্থীর অপূরণীয় ক্ষতি নিবারণ করে।

আইনি সিদ্ধান্ত: অতএব, তামাদি আইনের ৪ ধারার স্বয়ংসক্রিয় সুবিধা গ্রহণ করে আদালত খোলার প্রথম দিনেই মামলা দায়ের নিশ্চিত করা প্রতিটি সচেতন আইনজীবীর প্রাথমিক কর্তব্য।

Related Articles

Back to top button