১৫ বছর বিদেশে থাকা সহ-শরিকের পৈত্রিক সম্পত্তি দাবি ও আইনি বিশ্লেষণ – বার কাউন্সিল ২০১১

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১১: দেওয়ানী, তামাদি ও সাক্ষ্য আইন

সৃজনশীল সমস্যাভিত্তিক প্রশ্ন: ‘ক’ এবং ‘খ’ দুই ভাই পৈত্রিক সূত্রে একটি স্থাবর সম্পত্তির সমান অংশের সহ-শরিক। জীবিকার তাগিদে ‘খ’ বিগত ১৫ বছর যাবৎ বিদেশে অবস্থান করছিল। এই দীর্ঘ সময়ে ‘ক’ একাকী সম্পূর্ণ সম্পত্তি ভোগদখল করে এবং বাড়িঘর নির্মাণ করে। ১৫ বছর পর ‘খ’ দেশে ফিরে নিজের অংশ দাবি করলে ‘ক’ দাবি করে যে—(১) ১৫ বছর বিরুদ্ধ দখলের (Adverse Possession) কারণে ‘খ’-এর স্বত্ব বিলুপ্ত হয়েছে এবং (২) দীর্ঘ নীরবতার কারণে এস্টোপেল নীতিতে ‘খ’-এর দাবি বারিত। ‘খ’-এর আইনজীবী হিসেবে ‘ক’-এর দাবিসমূহের আইনি অসারতা প্রমাণ করে পরামর্শ দিন। [পূর্ণমান: ১৫]

১. তাত্ত্বিক পটভূমি ও সহ-শরিকানার মৌলিক আইনি নীতিমালা

ভূমি আইন ও সম্পত্তি আইনের এক চিরন্তন সর্বজনীন নীতি হলো—“এক সহ-শরিকের দখল সকল সহ-শরিকের দখল” (Possession of one co-sharer is the possession of all co-sharers)। সম্পত্তি আইন, ১৮৮২ এবং বণ্টন সংক্রান্ত বিধিমালার মূল ভিত্তি হলো, যে পর্যন্ত না উপযুক্ত আদালতের ডিক্রির মাধ্যমে বা পক্ষগণের বৈধ রেজিস্ট্রি বণ্টন দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তি আনুষ্ঠানিকভাবে ভাগ বা বণ্টন হচ্ছে, সে পর্যন্ত সম্পত্তির প্রতি ইঞ্চিতে সকল সহ-শরিকের অবিভক্ত মালিকানা ও অধিকার বজায় থাকে।

২. বিরুদ্ধ দখলের (Adverse Possession) দাবির অসারতা

তামাদি আইন, ১৯০৮-এর ২৮ ধারা এবং অনুচ্ছেদ ১৪৪ অনুযায়ী ১২ বছর বিরুদ্ধ দখলের কারণে মূল মালিকের স্বত্ব বিলুপ্ত হয়ে দখলদারের অনুকূলে স্বত্ব সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু সহ-শরিকদের ক্ষেত্রে এই নীতি সহজে প্রযোজ্য নয়:

  • উচ্ছেদ বা বেদখলের প্রমাণ (Ouster): সাধারণ ব্যক্তির ক্ষেত্রে নিছক দীর্ঘ দখলই বিরুদ্ধ দখল হতে পারে, কিন্তু সহ-শরিকের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধ দখল দাবি করতে হলে দখলদারকে প্রমাণ করতে হবে যে সে অন্য সহ-শরিককে তার স্বত্ব প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার করে সম্পত্তি থেকে চূড়ান্তভাবে উচ্ছেদ বা বহিষ্কার (Ouster) করেছিল।
  • প্রকাশ্য শত্রুভাবাপন্ন দখল (Hostile Possession): সহ-শরিক ‘ক’-কে প্রমাণ করতে হবে যে সে ‘খ’-এর অধিকার প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার করেছিল এবং সেই অস্বীকৃতির কথা ‘খ’ পরিষ্কারভাবে জানতে পেরেছিল। যেহেতু ‘খ’ বিদেশে ছিল এবং ভাই হিসেবে ‘ক’ জমিতে ছিল, তাই ‘ক’-এর দখলকে ‘খ’-এর পক্ষে ট্রাস্টি বা আমানতদার হিসেবে দখল গণ্য করা হবে।
  • সিদ্ধান্ত: নিছক ১৫ বছর একাকী ভোগদখল বা বাড়ি নির্মাণ সহ-শরিকের বিরুদ্ধে কখনই বিরুদ্ধ দখল হিসেবে গণ্য হবে না।

৩. এস্টোপেল (Estoppel) নীতির দাবির অসারতা

সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ১১৫ ধারা অনুযায়ী এস্টোপেল প্রযোজ্য হতে হলে ‘খ’ কর্তৃক কোনো প্রত্যক্ষ মিথ্যা উপস্থাপনা বা প্ররোচনা থাকতে হতো যার ওপর ভিত্তি করে ‘ক’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

  • নিছক বিদেশে থাকা বা নীরব থাকা কোনো সম্মতি বা এস্টোপেল নয়।
  • ‘খ’ কোনো লিখিত বা মৌখিক বিবৃতির মাধ্যমে তার পৈত্রিক অংশ পরিত্যাগ (relinquish) করেনি।
  • আইনের সুস্পষ্ট নীতি হলো—কোনো ব্যক্তির সম্পত্তিতে স্বত্ব নিছক নীরবতার কারণে বিলুপ্ত হয় না।

৪. ‘খ’-এর জন্য আইনগত প্রতিকার ও করণীয়

‘খ’-এর আইনজীবী হিসেবে তাকে নিম্নলিখিত পরামর্শ প্রদান করতে হবে:

  1. বাটোয়ারা বা বণ্টন মোকদ্দমা দায়ের (Suit for Partition): দেওয়ানী আদালতের আশ্রয় নিয়ে ‘খ’-কে অবিলম্বে পৈত্রিক সম্পত্তির ৫০% হিস্যা বা অর্ধেক অংশ সাহাম অনুযায়ী পৃথক বণ্টনের জন্য বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে বাটোয়ারা মামলা দায়ের করতে হবে।
  2. অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Temporary Injunction): মোকদ্দমা চলাকালে ‘ক’ যাতে সম্পূর্ণ জমি বিক্রি বা রূপান্তর করতে না পারে, সেজন্য আদেশ ৩৯, বিধি ১-২ অনুযায়ী স্থিতাবস্থার বা নিষেধাজ্ঞার আদেশ প্রার্থনা করতে হবে।

৫. উচ্চ আদালতের যুগান্তকারী নজিরসমূহ

  • কোরবান আলী বনাম মোসলেম উদ্দিন (43 DLR (AD) 201): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, “সহ-শরিকদের মধ্যে নিছক দীর্ঘদিনের দখল বা একা একা ভোগদখল বিরুদ্ধ দখল নয়, যে পর্যন্ত না প্রকাশ্য উচ্ছেদ (Ouster) অকাট্য দালিলিক সাক্ষ্যে প্রমাণিত হয়।”
  • আব্দুল জলিল বনাম ফজলুল হক (39 DLR 342): এক ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে অন্য ভাইয়ের জমিতে ভবন নির্মাণ স্বত্ব ধ্বংস করে না; বাটোয়ারা মোকদ্দমায় ইকুইটি নীতিতে উক্ত ভবন সমন্বয় করা হবে।

৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

অতএব, সহ-শরিকের জমি দাবি ও বিরুদ্ধ দখল সম্পর্কিত ‘ক’-এর দুটি দাবিই আইনত অসার ও ভিত্তিহীন। ‘খ’ নির্দ্বিধায় বাটোয়ারা মোকদ্দমা দায়েরের মাধ্যমে পৈত্রিক সম্পত্তিতে তার নিরঙ্কুশ অর্ধেক অংশ ও খাস দখল পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবেন।

৪.১. সহ-শরিকদের মধ্যে বিরুদ্ধ দখল ও উচ্ছেদের (Ouster) কঠোর আইনগত পরীক্ষা

১৫ বছর বিদেশে থাকা সহ-শরিকের সম্পত্তি দাবি ও বিরুদ্ধ দখলের বিষয়ে উচ্চ আদালতের সুপ্রতিষ্ঠিত অনুশাসন নিম্নরূপ:

  • সহ-শরিকের দখল সকলের দখল: একজনের ভোগদখল আইনত সকল সহ-শরিকের ভোগদখল হিসেবে গণ্য হয়; বিদেশে অবস্থান বা খাজনা না দেওয়া কোনো বিরুদ্ধ দখল নয়;
  • উচ্ছেদ (Ouster) প্রমাণের দায়: বিরুদ্ধ দখল দাবিদার ভাইকে প্রমাণ করতে হবে যে সে প্রকাশ্য দলিল বা নোটিশ মারফত বিদেশে থাকা ভাইয়ের স্বত্ব সরাসরি অস্বীকার করেছিল এবং তাকে শারীরিকভাবে উচ্ছেদ করেছিল;
  • সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ (নূর মোহাম্মদ বনাম সোলেমান, 50 DLR 332) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, সহ-শরিকদের মধ্যে নিছক দীর্ঘকালীন ভোগদখল কখনোই তামাদি আইনের ১৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিকূল স্বত্ব তৈরি করতে পারে না।

আইনি সিদ্ধান্ত: অতএব, ১৫ বছর পর বিদেশ থেকে ফিরে আসা ভাই পৈত্রিক সম্পত্তিতে তার বৈধ অংশীদারিত্ব দাবি করতে সম্পূর্ণ হকদার এবং তার বিরুদ্ধে কোনো এস্টপেল প্রযোজ্য হবে না।

৪.২. বণ্টন মোকদ্দমার (Partition Suit) মাধ্যমে বিরোধের স্থায়ী অবসান

বিদেশে অবস্থানরত সহ-শরিক দেশে ফিরে সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য সহকারী জজ বা যুগ্ম জেলা জজ আদালতে বাটোয়ারা মোকদ্দমা দায়ের করবে। আরজিতে সাহাম (Share) নির্ধারণের প্রার্থনা জানাতে হবে। আদালত প্রাথমিক ডিক্রির পর সার্ভেয়ার কমিশনার নিয়োগ করে সরজমিনে ফিতা টেনে পৃথক দখল বুঝিয়ে দিয়ে চূড়ান্ত ডিক্রি প্রদান করবেন।

৪.৩. সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও পরীক্ষার্থীর জন্য দিকনির্দেশনা

সুপ্রিম কোর্ট (নূর মোহাম্মদ বনাম সোলেমান, 50 DLR 332) নজিরে রায় দেন যে, সহ-শরিকদের মধ্যে স্বত্বের প্রশ্নে তামাদি আইনের ১৪৪ অনুচ্ছেদ অত্যন্ত কঠোরভাবে বিচার করতে হবে। পরীক্ষায় উচ্ছেদ প্রমাণের বাধ্যবাধকতা এবং বাটোয়ারা মামলার প্রতিকার স্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।

আদালতের নজির: (মজিবুর রহমান বনাম মোস্তফা, 48 DLR 210) অনুযায়ী বিদেশে অবস্থানরত সহ-শরিকের অংশ সুরক্ষায় প্রতিকূল দখলের কঠোর শর্ত পালন বাধ্যতামূলক।

Related Articles

Back to top button