দেওয়ানী রিভিশন এখতিয়ার ও আবেদন করার আইনি ক্ষেত্রসমূহ | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৬

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২৬
প্রশ্ন ২। (ক): বিভিন্ন আদালতের রিভিশন এর এখতিয়ার এবং যে সকল কারণে একটি রিভিশন আবেদন করা যায় তা আলোচনা করুন। [৫]

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

দেওয়ানী বিচার ব্যবস্থায় যেসকল আদেশের বিরুদ্ধে কোনো বিধিবদ্ধ আপিল চলে না, সেসকল ক্ষেত্রে অধস্তন আদালতের এখতিয়ারগত ত্রুটি বা বিচারিক বিচ্যুতি সংশোধনের সর্বোচ্চ আইনি রক্ষাকবচ হলো ‘রিভিশন’ (Revision)। দেওয়ানী কার্যবিধির ১১৫ ধারায় দেওয়ানী আদালতের রিভিশন এখতিয়ার এবং এর কঠোর শর্তাবলি বিধিবদ্ধ করা হয়েছে।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইনি বিধানাবলী (Statutory Provisions)

  • The Code of Civil Procedure, 1908 (Section 115):
    • ধারা ১১৫(১): হাইকোর্ট বিভাগের রিভিশন এখতিয়ার।
    • ধারা ১১৫(২): জেলা জজ আদালতের রিভিশন এখতিয়ার।
    • ধারা ১১৫(৩) ও (৪): দ্বিতীয় রিভিশন বারিত হওয়ার বিধান ও স্থানান্তরের নিয়ম।

৩. বিশদ আইনি বিশ্লেষণ ও প্রশ্নের উত্তর

(১) বিভিন্ন আদালতের রিভিশন এখতিয়ার (Revisional Jurisdiction)

দেওয়ানী কার্যবিধির ১১৫ ধারা অনুযায়ী দুটি আদালত দেওয়ানী রিভিশন এখতিয়ার প্রয়োগ করে থাকে:

আদালতের নাম রিভিশন এখতিয়ারের পরিধি শর্তাবলি
১. জেলা জজ আদালত [Section 115(2)] সিনিয়র সহকারী জজ, সহকারী জজ বা যুগ্ম জেলা জজ কর্তৃক প্রদত্ত কোনো আদেশের বিরুদ্ধে যার বিরুদ্ধে কোনো আপিল চলে না। আদেশটি অধস্তন আদালত কর্তৃক প্রদত্ত হতে হবে এবং বিধিবদ্ধ কোনো আপিলের প্রতিকার থাকা চলবে না।
২. হাইকোর্ট বিভাগ [Section 115(1)] জেলা জজ বা অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে (যেখানে আপিল নেই), অথবা সরাসরি যে কোনো অধস্তন দেওয়ানী আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। জেলা জজ রিভিশন নিষ্পত্তি করলে তার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে দ্বিতীয় রিভিশন চলবে না (Sec 115(4))।

(২) যে সকল কারণে রিভিশন আবেদন করা যায় (Grounds for Revision)

দেওয়ানী কার্যবিধির ১১৫(১) ধারা মোতাবেক রিভিশন কেবল ‘এখতিয়ারগত ভুলের’ (Jurisdictional Error) বিরুদ্ধে চলে। তিনটি নির্দিষ্ট গ্রাউন্ডে রিভিশন দায়ের করা যায়:

  1. আইনত অর্পিত নয় এমন এখতিয়ার প্রয়োগ করা (Exercised a jurisdiction not vested in it by law): যদি অধস্তন আদালত এমন কোনো বিষয়ে আদেশ প্রদান করে যা পরিচালনা করার আর্থিক, আঞ্চলিক বা বিষয়বস্তুগত আইনি এখতিয়ার ওই আদালতের ছিল না।
  2. আইনত অর্পিত এখতিয়ার প্রয়োগে ব্যর্থ হওয়া (Failed to exercise a jurisdiction so vested): যদি আদালতের স্পষ্ট বিচারিক এখতিয়ার থাকা সত্ত্বেও আদালত ভুলবশত তা প্রয়োগ করতে অস্বীকৃতি জানায় বা আবেদন প্রত্যাখ্যান করে।
  3. এখতিয়ার প্রয়োগকালে বেআইনিভাবে বা গুরুতর অনিয়মের সাথে কাজ করা (Acted in the exercise of its jurisdiction illegally or with material irregularity): আদালত এখতিয়ারের সীমা লঙ্ঘন করেনি কিন্তু বিচার পরিচালনা করতে গিয়ে আইনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশক বিধান অমান্য করেছে বা ন্যাচারালাইজড জাস্টিস লঙ্ঘন করেছে যা ফলাফলে গুরুতর অবিচার ঘটিয়েছে।
স্মরণীয় সত্য: তথ্যগত ভুল (Question of Fact) পর্যালোচনার জন্য রিভিশন চলে না; এটি নিছক এখতিয়ারগত ত্রুটি নিরাময়ের একটি পরিদর্শক ক্ষমতা (Supervisory power)।

৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স

১. মেজর জেনারেল এম.এ. মতিন বনাম বাংলাদেশ (41 DLR 34): সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পর্যবেক্ষণ করেন যে, রিভিশন কোনো আপিল নয়। অধস্তন আদালত যদি আইনসম্মত এখতিয়ারের ভেতরে থেকে কোনো ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, তবে কেবল ভিন্ন সিদ্ধান্তের সম্ভাবনার কারণে রিভিশন আদালত হস্তক্ষেপ করবে না, যদি না গুরুতর বেআইনি পদ্ধতিগত ব্যত্যয় ঘটে থাকে।

২. আবুল হোসেন বনাম নুরুল ইসলাম (52 DLR 245): যেক্ষেত্রে কোনো আদেশের বিরুদ্ধে আপিল চলে, সে আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন সরাসরি অগ্রহণযোগ্য। আপিল না থাকলেই কেবল ১১৫ ধারা প্রযোজ্য হয়।

৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত

সুতরাং, দেওয়ানী রিভিশন হলো অধস্তন আদালতের বিচারিক এখতিয়ারের সীমাবদ্ধতা ও বৈধতা তদারকির একটি অনন্য বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা, যা ১১৫ ধারার কঠোর ৩টি এখতিয়ারগত শর্ত সাপেক্ষে জেলা জজ বা হাইকোর্ট বিভাগে প্রয়োগযোগ্য।

Related Articles

Back to top button