মানি স্যুটে রায়ের পূর্বে ক্রোক (Attachment before Judgment Order 38 Rule 5) দরখাস্ত মুসাবিদা | বার কাউন্সিল লিখিত ২০১২
বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১২: দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮
প্রশ্ন: ২ দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৮ নিয়ম ৫ অনুযায়ী রায়ের পূর্বে ক্রোক (Attachment before Judgment) বলিতে কি বুঝায়? রায়ের পূর্বে ক্রোক আদেশের আবশ্যিক আইনি উপাদান ও শর্তাবলী কি কি? একটি মানি স্যুটে (Money Suit) বিবাদী কর্তৃক সম্পত্তি গোপনে বিক্রয়ের আশঙ্কায় রায়ের পূর্বে ক্রোকের দরখাস্ত এবং এফিডেভিটের পূর্ণাঙ্গ ড্রাফট প্রস্তুত করুন। [পূর্ণমান: ১৫]
১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও আইনি উদ্দেশ্য
দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর আদেশ ৩৮ নিয়ম ৫ (Order XXXVIII Rule 5) অনুযায়ী রায়ের পূর্বে ক্রোকের বিধান প্রণীত হয়েছে। কোনো বাদী দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার পর ডিক্রি লাভ করল, কিন্তু ডিক্রি জারির সময় দেখা গেল যে বিবাদী তার সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি গোপনে বিক্রি বা হস্তান্তর করে নিঃস্ব হয়ে গেছে—তাহলে উক্ত ডিক্রিটি একটি কাগজের টুকরোয় পরিণত হবে। ডিক্রি জারির ফলপ্রসূতা রক্ষা করতে এবং অসৎ বিবাদীর চাতুর্য রুখতে বিচার চলাকালীন অবস্থাতেই বিবাদীর সম্পত্তিকে আদালতের জিম্মায় নিয়ে আসাই হলো ‘রায়ের পূর্বে ক্রোক (Attachment before Judgment)’।
২. রায়ের পূর্বে ক্রোক আদেশের ৩টি আবশ্যিক আইনি উপাদান
বিজ্ঞ আদালত হতে ৩৮ আদেশের ৫ নিয়মের কঠোর আদেশ লাভ করতে হলে বাদীকে ৩টি বিষয় অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে হয়:
- ডিক্রি কার্যকরীকরণে বাধা সৃষ্টির অসৎ উদ্দেশ্য: বিবাদী মামলার সম্ভাব্য ডিক্রি কার্যকরীকরণে বাধা সৃষ্টি (Obstruction) বা বিলম্বিত (Delay) করার দুরভিসন্ধি গ্রহণ করেছে।
- সম্পত্তি হস্তান্তর বা অপসারণের বাস্তব উদ্যোগ: বিবাদী তার সমস্ত বা কোনো সম্পত্তি গোপনে হস্তান্তর (Disposing of) করছে, অথবা আদালতের আঞ্চলিক এখতিয়ারভুক্ত এলাকা থেকে অপসারণ (Removing from jurisdiction) করার বাস্তব প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
- নিরাপত্তা জামানত প্রদানে ব্যর্থতা: আদালত প্রথমে বিবাদীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেবেন এবং নির্ধারিত অঙ্কের জামানত (Security) দাখিল করার নির্দেশ দেবেন। বিবাদী জামানত দাখিলে ব্যর্থ হলে তবেই চূড়ান্ত ক্রোকের আদেশ কার্যকর হবে।
৩. বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ আদালতে রায়ের পূর্বে ক্রোকের আনুষ্ঠানিক দরখাস্ত ও এফিডেভিটের ড্রাফট
বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালত, ঢাকা
মানি মোকদ্দমা নং ৪৫ / ২০২৪
বাদী: মেসার্স আল-আমিন ট্রেডার্স, পক্ষে স্বত্বাধিকারী মো: রফিকুল ইসলাম
— বনাম —
বিবাদী: মো: কামরুল হাসান, পিতা- মৃত হাজী জমির উদ্দিন, সাং- গুলশান, ঢাকা।
দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৮ নিয়ম ৫ এবং ধারা ১৫১ মতে রায়ের পূর্বে বিবাদীর সম্পত্তি ক্রোকের দরখাস্ত
বাদী পক্ষ বিজ্ঞ আদালত সমীপে বিনীত নিবেদন করিতেছে যে—
- বাদী বিবাদীর নিকট সরবরাহকৃত পণ্যের বকেয়া বাবদ সর্বমোট ৫০,০০,০০০/- (পঞ্চাশ লক্ষ) টাকা আদায়ের জন্য অত্র মানি মোকদ্দমা দায়ের করিয়াছেন, যাহার পক্ষে অকাট্য ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও রসিদ দাখিল রহিয়াছে।
- বিবাদী অত্র মোকদ্দমার সমন জারির পর আদালতে হাজির হইয়া কালক্ষেপণ করিতেছেন এবং বাদী নির্ভরযোগ্য সূত্রে ও স্থানীয় জমি কেনাবেচার ব্রোকারদের মাধ্যমে অবগত হইয়াছেন যে, বিবাদী অত্র মামলার সম্ভাব্য ডিক্রি ফাঁকি দেওয়ার কু-অভিপ্রায়ে নিম্ন তপশিল বর্ণিত তাহার একমাত্র মূল্যবান বাণিজ্যিক ফ্ল্যাটটি গোপনে অন্যত্রে বিক্রি ও হস্তান্তরের জন্য বায়না গ্রহণ করিয়াছেন।
- বিবাদী যদি উক্ত সম্পত্তি বিক্রি করিয়া অর্থ পাচার করিতে সক্ষম হন, তবে অত্র মামলার ডিক্রি কার্যকর করা সম্পূর্ণ অসম্ভব হইবে এবং বাদী অপূরণীয় আর্থিক ক্ষতির শিকার হইবেন।
প্রার্থনা: অতএব বিনীত প্রার্থনা এই যে, বিবাদীকে ৫০,০০,০০০/- টাকার সন্তোষজনক জামানত দাখিলের নির্দেশ প্রদান করিতে এবং জামানত দাখিলে ব্যর্থতায় নিম্ন তপশিল সম্পত্তি রায়ের পূর্বে ক্রোকের আদেশদানে মর্জি হয়।
তপশিল সম্পত্তি: ঢাকা জেলা, গুলশান থানাধীন, গুলশান-২ বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত ‘সিটি সেন্টার’-এর ৫ম তলার ৫/এ নং বাণিজ্যিক স্পেস (আয়তন ২০০০ বর্গফুট)।
হলফনামা (Affidavit)
আমি মো: রফিকুল ইসলাম, পিতা- মৃত আব্দুল আলী, বয়স- ৫০ বছর, পেশা- ব্যবসা, সাং- ঢাকা, এই মর্মে শপথপূর্বক ঘোষণা করিতেছি যে, অত্র দরখাস্তের সকল বিবরণ আমার জ্ঞান ও তথ্যমতে সত্য। অদ্য নোটারি পাবলিকের সামনে স্বাক্ষর করিলাম।
৩.১. আদেশ ৩৮ নিয়ম ৫-এর অধীনে জারিযোগ্য পরোয়ানার শর্তাবলি ও নোটিশ (Notice & Conditional Attachment)
বিজ্ঞ আদালত বাদীর দরখাস্ত প্রাপ্তিমাত্রই সরাসরি ঢালাওভাবে ক্রোকের আদেশ প্রদান করেন না। দেওয়ানি কার্যবিধির বিধান অনুযায়ী আদালত প্রথমে বিবাদীর ওপর কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show Cause Notice) জারি করেন এবং বিবাদীকে নির্দেশ দেন—(১) হয় দাবিকৃত অর্থের সমপরিমাণ জামানত আদালতে দাখিল করতে, (২) অথবা কেন জামানত দাখিল করা হবে না তার সন্তোষজনক কারণ দর্শাতে। যদি বিবাদী নোটিশ পাওয়া সত্ত্বেও জামানত প্রদানে ব্যর্থ হয়, অথবা আদালত যদি স্পষ্ট দেখেন যে নোটিশ জারির আগেই সম্পত্তি পাচার হয়ে যাবে, কেবল তখনই আদালত শর্তসাপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন ক্রোকের (Conditional Attachment) নির্দেশ দেন (কবির আহমেদ বনাম ব্যাংক, 32 DLR 210)।
৩.২. দেওয়ানি কার্যবিধির ৪৩ আদেশ অনুযায়ী আপিলের অধিকার
যদি আদালত ৩৮ আদেশের ৫ নিয়মের আবেদন অন্যায়ভাবে খারিজ করে দেন অথবা বিবাদীর বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে ক্রোকের আদেশ মঞ্জুর করেন, তবে উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৪৩ নিয়ম ১(ণ) (Order XLIII Rule 1(q)) অনুযায়ী সংক্ষুব্ধ পক্ষ বিজ্ঞ জেলা জজ আদালতে মিস আপিল (Miscellaneous Appeal) দায়ের করতে পারেন।
৪. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ (Landmark Case Laws)
- মেসার্স বাংলাদেশ ব্যাংক বনাম মো: সোলায়মান (48 DLR (AD) 154): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, নিছক বাদীর ধারণার ওপর ভিত্তি করে ক্রোক আদেশ দেওয়া যায় না; বিবাদী যে সম্পত্তি গোপনে হস্তান্তর করছে তার বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য দাখিল করতে হবে।
- কবির আহমেদ বনাম জনতা ব্যাংক (32 DLR 210): আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, ৩৮ আদেশের ৫ নিয়ম একটি অসাধারণ ক্ষমতা; আদালতকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে যাতে সৎ ব্যবসায়ীর সুনাম অযথা ক্ষুণ্ণ না হয়।
৫. উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, মানি স্যুটে রায়ের পূর্বে ক্রোক ডিক্রির বাস্তবায়ন নিশ্চিতের একটি অপরিহার্য আইনি রক্ষাকবচ। সঠিক শর্তে এর প্রয়োগ বিচার ব্যবস্থার ওপর ঋণদাতা ও ব্যবসায়ীদের আস্থা অটুট রাখে।
৩.১. আদেশ ৩৮ নিয়ম ৫-এর অধীনে জারিযোগ্য পরোয়ানার শর্তাবলি ও নোটিশ (Notice & Conditional Attachment)
বিজ্ঞ আদালত বাদীর দরখাস্ত প্রাপ্তিমাত্রই সরাসরি ঢালাওভাবে ক্রোকের আদেশ প্রদান করেন না। দেওয়ানি কার্যবিধির বিধান অনুযায়ী আদালত প্রথমে বিবাদীর ওপর কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show Cause Notice) জারি করেন এবং বিবাদীকে নির্দেশ দেন—(১) হয় দাবিকৃত অর্থের সমপরিমাণ জামানত আদালতে দাখিল করতে, (২) অথবা কেন জামানত দাখিল করা হবে না তার সন্তোষজনক কারণ দর্শাতে। যদি বিবাদী নোটিশ পাওয়া সত্ত্বেও জামানত প্রদানে ব্যর্থ হয়, অথবা আদালত যদি স্পষ্ট দেখেন যে নোটিশ জারির আগেই সম্পত্তি পাচার হয়ে যাবে, কেবল তখনই আদালত শর্তসাপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন ক্রোকের (Conditional Attachment) নির্দেশ দেন (কবির আহমেদ বনাম ব্যাংক, 32 DLR 210)।
৩.২. দেওয়ানি কার্যবিধির ৪৩ আদেশ অনুযায়ী আপিলের অধিকার
যদি আদালত ৩৮ আদেশের ৫ নিয়মের আবেদন অন্যায়ভাবে খারিজ করে দেন অথবা বিবাদীর বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে ক্রোকের আদেশ মঞ্জুর করেন, তবে উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৪৩ নিয়ম ১(ণ) (Order XLIII Rule 1(q)) অনুযায়ী সংক্ষুব্ধ পক্ষ বিজ্ঞ জেলা জজ আদালতে মিস আপিল (Miscellaneous Appeal) দায়ের করতে পারেন।
📌 সম্পর্কিত আইনি প্রস্তুতি ও সহায়িকা লিংক:
- ২০১২ সালের বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষার সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ মডেল সমাধান দেখুন
- বার কাউন্সিল রুলস ও প্রফেশনাল এথিক্স সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা ও আইনি আলোচনা
- বার কাউন্সিল ও জুডিশিয়ারি বার কাউন্সিল রুলস ও প্রফেশনাল এথিক্স অনলাইন মডেল টেস্ট দিন
- বার কাউন্সিল বিগত সকল লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নব্যাংক ও ১০০% পূর্ণাঙ্গ সমাধান ব্যাংক

