সকল গ্রাহ্য সাক্ষ্যই প্রাসঙ্গিক কিন্তু সকল প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য গ্রহণীয় নয় (Evidence Act) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২০
📌 বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২০ | সাক্ষ্য আইন
প্রশ্ন ৯। (ক): ”সকল গ্রাহ্য সাক্ষ্যই প্রাসঙ্গিক, কিন্তু সকল প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্যই গ্রহণীয় নয়” — ব্যাখ্যা করুন।
১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট
সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে দুটি প্রধান আইনি স্তম্ভের ওপর: (১) প্রাসঙ্গিকতা (Relevancy) এবং (২) গ্রহণীয়তা বা গ্রাহ্যতা (Admissibility)। সাধারণ বুদ্ধিতে যা কোনো ঘটনার সাথে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়, আইনের চোখে তা সর্বদাই আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। বিখ্যাত ইংরেজ আইনবিদ উইগমোর এবং স্টিফেন চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন যে—“Relevancy is the test of logic, while admissibility is the test of law” (প্রাসঙ্গিকতা হলো যুক্তির পরীক্ষা, আর গ্রহণীয়তা হলো আইনের পরীক্ষা)। এই গভীর আইনের মূল উক্তিটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা করাই অত্র প্রশ্নের মূল উদ্দেশ্য।
২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী
- The Evidence Act, 1872:
- Section 5: শুধুমাত্র বিচার্য বিষয় (Facts in issue) এবং প্রাসঙ্গিক ঘটনা (Relevant facts) সম্পর্কেই সাক্ষ্য দেওয়া যায়, অন্য কিছু নয়।
- Sections 6 to 55: প্রাসঙ্গিক ঘটনার সংবিধিবদ্ধ ক্ষেত্রসমূহ।
- Section 24, 25, 26: প্রাসঙ্গিক স্বীকারোক্তি হলেও পুলিশ হেফাজতে বা প্রলোভনে দেওয়া স্বীকারোক্তি আদালতে অগ্রাহ্য (Inadmissible)。
- Sections 121 to 131: বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত যোগাযোগ (Privileged communications)—যা প্রাসঙ্গিক হওয়া সত্ত্বেও গ্রহণীয় নয়।
৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও উক্তিটির যৌক্তিক ব্যাখ্যা
- ১. “সকল গ্রাহ্য সাক্ষ্যই প্রাসঙ্গিক” (All Admissible Evidence is Relevant):
সাক্ষ্য আইনের ৫ ধারার মূল বিধান হলো—আদালত কেবল সেই সাক্ষ্যই গ্রহণ করবেন যা ৫ থেকে ৫৫ ধারায় বর্ণিত কোনো না কোনো ক্যাটাগরিতে প্রাসঙ্গিক (Relevant)। কোনো তথ্য যদি যুক্তিসঙ্গতভাবে বা আইনগতভাবে মামলার বিচার্য বিষয়ের সাথে সম্পর্কিতই না হয়, তবে তা আদালতে গ্রাহ্য (Admissible) হওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। সুতরাং, গ্রাহ্য হওয়ার প্রথম ও পূর্বশর্ত হলো প্রাসঙ্গিক হওয়া। তাই যা গ্রাহ্য হয়, তা নিশ্চিতভাবেই প্রাসঙ্গিক। - ২. “কিন্তু সকল প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য গ্রহণীয় নয়” (All Relevant Evidence is NOT Admissible):
কোনো ঘটনা সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক এবং যৌক্তিকভাবে সত্য হওয়া সত্ত্বেও সাক্ষ্য আইনের বিশেষ বাধার (Statutory exclusion) কারণে তা আদালতে অগ্রাহ্য হতে পারে। এর সুস্পষ্ট প্রমাণসমূহ নিম্নে প্রদত্ত হলো:- পুলিশের নিকট স্বীকারোক্তি (Section 25): আসামী যদি স্বেচ্ছায় পুলিশের নিকট নিজের সব অপরাধের কথা কবুল করে, তবে তা সত্য উদঘাটনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক; কিন্তু সাক্ষ্য আইনের ২৫ ধারায় তা সরাসরি অগ্রাহ্য (Inadmissible)।
- পুলিশ হেফাজতে স্বীকারোক্তি (Section 26): ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি ছাড়া পুলিশ হেফাজতে প্রদত্ত দোষস্বীকার প্রাসঙ্গিক হলেও আদালতে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
- স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক যোগাযোগ (Section 122): বিবাহকালীন সময়ে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যকার আলাপচারিতা খুনের ঘটনা উদ্ঘাটনে দারুণ প্রাসঙ্গিক হতে পারে; কিন্তু আইনের ১২২ ধারা পরিবারিক সুরক্ষার স্বার্থে তা প্রকাশ নিষিদ্ধ ও অগ্রাহ্য করেছে।
- আইনজীবী ও মক্কেলের পেশাগত যোগাযোগ (Section 126): মক্কেল আইনজীবীকে যা কিছু বলেন তা মোকদ্দমায় অতি প্রাসঙ্গিক হলেও আইনের ১২৬ ধারা তাকে পরম সুরক্ষা দিয়ে আদালতে উপস্থাপন অগ্রাহ্য করেছে।
- জনশ্রুতিমূলক সাক্ষ্য (Hearsay Evidence – Section 60): প্রত্যক্ষদর্শীর নিকট থেকে শুনে বলা কথা প্রাসঙ্গিক মনে হলেও মৌখিক সাক্ষ্য প্রত্যক্ষ হওয়ার কঠোর নিয়মে তা অগ্রাহ্য।
৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির
- কবির হোসেন বনাম রাষ্ট্র, ৫২ ডিএলআর (এডি) ৯১: আপিল বিভাগ সুস্পষ্ট রায় প্রদান করেন যে, কোনো তথ্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হলেই তা সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না যদি না তা সাক্ষ্য আইনের নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও বিধান মেনে উপস্থাপিত হয়। পুলিশের নিকট কোনো স্বীকারোক্তি আসামীর অপরাধের সাথে প্রাসঙ্গিক হলেও ২৫ ধারার কারণে তা আদালতে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য।
- রমেশ চন্দ্র বনাম রাজ্য, এআইআর ১৯৫৮ সুপ্রিম কোর্ট ২৯: Relevancy এবং Admissibility সমার্থক নয়। Relevancy হলো কার্যকারণ সম্পর্কের বিচার; আর Admissibility হলো জননীতি ও বিচারিক শৃঙ্খলার স্বার্থে আইনের কঠোর বিধিনিষেধ।
৫. উপসংহার ও পরীক্ষকের দৃষ্টিতে ১০০/১০০ সারসংক্ষেপ
সংক্ষেপে বলা যায়, প্রাসঙ্গিকতা হলো একটি উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ, আর গ্রহণীয়তা হলো একটি নিয়ন্ত্রিত প্রবেশদ্বার। কোনো তথ্য প্রাসঙ্গিকতার ছাড়পত্র না পেলে যেমন প্রবেশদ্বারে পৌঁছাতে পারে না, তেমনি প্রবেশদ্বারের আইনি ফিল্টারে উত্তীর্ণ না হলে প্রাসঙ্গিক হয়েও তা আদালতের নথিতে সাক্ষ্য হিসেবে ঠাঁই পায় না।
৪.১. প্রাসঙ্গিকতা (Relevancy) বনাম গ্রাহ্যতা (Admissibility)-এর গভীর আইনি বিভাজন
সাক্ষ্য আইনের মৌলিক দর্শন হলো লজিক্যাল প্রাসঙ্গিকতা এবং লিগ্যাল গ্রহণযোগ্যতা এক নয়:
- প্রাসঙ্গিক কিন্তু গ্রাহ্য নয় (Relevant but not Admissible): অনেক ঘটনা যুক্তির দৃষ্টিতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হওয়া সত্ত্বেও আদালত তা সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন না। উদাহরণস্বরূপ— পুলিশের নিকট আসামির কৃত স্বীকারোক্তি (ধারা ২৫), জনস্বার্থে বা রাষ্ট্রীয় গোপনীয় দলিল (ধারা ১২৩), অথবা স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক গোপন যোগাযোগ (ধারা ১২২);
- গ্রাহ্য কিন্তু প্রাসঙ্গিক নয়: জেরা করার সময় সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংসের জন্য তার পূর্বের আচরণ বা চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা সরাসরি মামলার বিষয়ের সাথে প্রাসঙ্গিক না হলেও ধারা ১৪৬ ও ১৫৫ মতে তা সাক্ষ্য হিসেবে গ্রাহ্য;
- আদালতের প্রাথমিক দায়িত্ব: কোনো সাক্ষ্য গ্রহণের পূর্বেই বিচারককে সাক্ষ্য আইনের ১৩৬ ধারা অনুযায়ী তার প্রাসঙ্গিকতা ও গ্রাহ্যতা নিরূপণ করতে হয়।
৪.২. সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির
সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক নজিরে ঘোষণা করা হয়েছে যে, প্রমাণের সত্যতা ও গ্রাহ্যতার কঠোর ছাঁকনিতেই সাক্ষ্য আইন বিচার বিভাগের পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রাখে।
৪.৩. ডিজিটাল যুগে গ্রাহ্যতার নতুন দিগন্ত
সাক্ষ্য আইনের আধুনিক সংশোধনীতে ডিজিটাল প্রমাণাদির গ্রাহ্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনো প্রাসঙ্গিক ইমেইল, ফেসবুক চ্যাট বা সিসিটিভি ভিডিও আদালতে তখনই গ্রাহ্য হবে যখন তার সোর্স ও মেটাডাটা অক্ষুণ্ণ রয়েছে মর্মে ফরেনসিক ল্যাবের প্রত্যয়নপত্র উপস্থাপন করা হবে। ফলে সত্য উদঘাটনের পথ আরও আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত হয়েছে।
৪.৪. সাক্ষ্য আইনের ১৩৬ ধারায় বিচারকের প্রাথমিক দায়িত্ব
সাক্ষ্য আইনের ১৩৬ ধারা বিচারককে এই ক্ষমতা প্রদান করে যে, কোনো পক্ষ সাক্ষ্য উপস্থাপনের পূর্বে বিচারক প্রশ্ন করবেন উক্ত সাক্ষ্যটি আইনের কোন ধারায় প্রাসঙ্গিক; সন্তুষ্ট হলেই কেবল তা নথিতে অন্তর্ভুক্ত করবেন।

