ফৌজদারি মামলায় আসামীর অব্যাহতির দরখাস্ত মুসাবিদা (Section 241A CrPC) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২০
📌 বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২০ | ফৌজদারি কার্যবিধি ও দণ্ডবিধি
প্রশ্ন ৪। (খ): X এই মর্মে ১৫/১২/২০২০ তারিখ স্থানীয় থানায় এজাহার দায়ের করে যে, ০১/১২/২০২০ তারিখ রাত অনুমান ১১.৩০ টায় নবাবপুর মোড়ে Y ও Z ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বাধা দিলে Y চাইনিজ কুড়াল দিয়ে X এর মুখমণ্ডলে কোপ দেয় এবং ৫০,০০০ টাকা ছিনিয়ে নেয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা ১৬১ ধারার জবানবন্দিতে সাক্ষীদের স্বাক্ষর নেন। চিকিৎসা সনদে লেখা আছে “one lacerated wound on the left cheek”। তদন্তকারী কর্মকর্তা ৩২৬, ৩৪১, ৩৭৯, ৩৮৬ ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করেন এবং আলামত হিসেবে চাপাতি উদ্ধার দেখানো হয়। আসামী Z ঘটনার সময় বাঁশখালি উচ্চ বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরী হিসেবে চাকরির প্রত্যয়নপত্র জমা দেয়। আসামী Y ও Z এর পক্ষে একটি অব্যাহতির দরখাস্ত প্রস্তুত করুন।
১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট
প্রদত্ত সমস্যায় তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্ত প্রক্রিয়ায় একাধিক মারাত্মক পদ্ধতিগত ও আইনি ত্রুটি (Procedural and substantive flaws) বিদ্যমান: (১) ১৫ দিনের চরম বিলম্বিত এজাহার; (২) ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারার জবানবন্দিতে সাক্ষীদের স্বাক্ষর নেওয়া বেআইনি (ধারা ১৬২ দ্বারা বারিত); (৩) এজাহারে চাইনিজ কুড়ালের কোপের অভিযোগ থাকলেও চিকিৎসা সনদে ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতজনিত চেরা জখম (Lacerated wound) পাওয়া গেছে এবং আলামত দেখানো হয়েছে চাপাতি; (৪) আসামী Z-এর ঘটনাস্থল হতে শত মাইল দূরে বাঁশখালিতে অবস্থানরত থাকার প্রত্যক্ষ প্রত্যয়নপত্র। এই সকল অসঙ্গতির ভিত্তিতে চার্জ গঠনের স্তরে আসামীদের অব্যাহতির (Discharge) একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া দরখাস্ত প্রস্তুত করতে হবে।
২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী
- The Code of Criminal Procedure, 1898:
- Section 241A: ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে বিচারকালে আসামীর অব্যাহতির আবেদন (বা দায়রা আদালত হলে Section 265C)।
- Section 162: পুলিশের নিকট প্রদত্ত জবানবন্দিতে সাক্ষীর স্বাক্ষর গ্রহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও অপ্রাসঙ্গিক।
- The Penal Code, 1860: Sections 326, 341, 379, 386.
৩. অব্যাহতির জোরালো আইনি যুক্তিসমূহ
- ১৬২ ধারার মারাত্মক লঙ্ঘন: তদন্তকারী কর্মকর্তা ১৬১ ধারার জবানবন্দিতে সাক্ষীদের স্বাক্ষর নিয়ে কার্যবিধির ১৬২ ধারার সুস্পষ্ট ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন, যা সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতাকে আইনি দৃষ্টিতে অকার্যকর করেছে।
- চিকিৎসা সনদের সাথে এজাহার ও আলামতের আকাশ-পাতাল অমিল: এজাহারে চাইনিজ কুড়ালের কোপের কথা বলা হয়েছে, অথচ ডাক্তার পেয়েছেন ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতজনিত “Lacerated wound” (যা কোনো ধারালো অস্ত্রের কোপে সম্ভব নয়); আবার পুলিশ আলামত জব্দ দেখিয়েছে চাপাতি! এই অসঙ্গতি বাদীর পুরো গল্প সাজানো ও অসত্য প্রমাণ করে।
- ১৫ দিনের দীর্ঘ বিলম্ব: ০১/১২/২০২০ তারিখের কথিত ঘটনার জন্য ১৫/১২/২০২০ তারিখে এজাহার দায়েরের কোনো সংগত কারণ দেখানো হয়নি।
- আসামী Z-এর নির্দোষিতা ও অকাট্য আলিবাই (Plea of Alibi): ঘটনাস্থল ঢাকা নবাবপুর মোড়, অথচ আসামী Z চট্টগ্রামের বাঁশখালিতে বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী হিসেবে দায়িত্ব পালনরত ছিলেন।
৪. আসামীদের অব্যাহতির পূর্ণাঙ্গ খসড়া মুসাবিদা (Legal Drafting)
মেট্রোপলিটন দায়রা / জি.আর মোকদ্দমা নং …………. / ২০২০
(সূত্র: বংশাল/কোতোয়ালী থানা মামলা নং ০৫, তারিখ ১৫/১২/২০২০)
রাষ্ট্র ………………………………………………………….. বাদীপক্ষ
বনাম
১. Y এবং ২. Z …………………………………………….. অভিযুক্ত আসামীদ্বয়
The Code of Criminal Procedure, 1898-এর ২৪১ক (Section 241A) ধারা মতে আসামী Y ও Z এর পক্ষে চার্জ গঠন হইতে অব্যাহতির (Discharge) দরখাস্ত।
আসামীদ্বয়ের পক্ষে বিনীত নিবেদন এই যে—
- আসামীদ্বয় সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং পূর্বশত্রুতার জেরে তাহাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলা সাজানো হইয়াছে।
- কথিত ঘটনার দীর্ঘ ১৫ দিন পর কোনো ব্যাখ্যা ব্যতিরেকে বিলম্বে এজাহার দায়ের করা হইয়াছে, যাহা পরিষ্কারভাবে পরামর্শ সাপেক্ষে মিথ্যা কাহিনী ফাঁদার প্রমাণ বহন করে।
- এজাহারে আসামী Y কর্তৃক ধারালো চাইনিজ কুড়াল দ্বারা বাদীর মুখমণ্ডলে আঘাতের দাবি করা হইলেও চিকিৎসা সনদে পরিষ্কারভাবে “One lacerated wound on left cheek” লেখা হইয়াছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান মতে চেরা জখম কেবল ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতেই সম্ভব, কোনো ধারালো চাইনিজ কুড়ালের দ্বারা নয়। অধিকন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তা আলামত কলামে চাপাতি উদ্ধার দেখাইয়া মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করিয়াছেন।
- তদন্তকারী কর্মকর্তা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণকালে তাহাতে সাক্ষীদের স্বাক্ষর লইয়া কার্যবিধির ১৬২ ধারার সংবিধিবদ্ধ বিধান সরাসরি লঙ্ঘন করিয়াছেন। সুপ্রিম কোর্টের সুপ্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এরূপ স্বাক্ষরিত জবানবন্দি আইনি ভিত্তিহীন।
- আসামী Z ঘটনার সময় ঘটনাস্থল ঢাকা নবাবপুর মোড় হইতে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রামের বাঁশখালি উচ্চ বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরী হিসাবে কর্মরত ছিলেন, যাহার দালিলিক প্রত্যয়নপত্র নথিভুক্ত রহিয়াছে।
- অভিযোগপত্র ও নথিতে সংরক্ষিত কোনো উপাদানেই আসামীদ্বয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মতো কোনো প্রাথমিক সারবস্তু (Prima facie case) বিদ্যমান নাই। এমতাবস্থায় চার্জ গঠন ন্যায়বিচারের চরম পরিপন্থী হইবে।
প্রার্থনা:
অতএব বিনীত প্রার্থনা এই যে, বিজ্ঞ আদালত অনুগ্রহপূর্বক ন্যায়বিচারের স্বার্থে নথির সামগ্রিক উপাদান বিবেচনা করিয়া আসামী ১. Y এবং ২. Z-কে মোকদ্দমার অভিযোগের দায় হইতে অব্যাহতি (Discharge) প্রদানে মর্জি হয়।
আসামীদ্বয়ের পক্ষে অ্যাডভোকেট
৫. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির
- আনিসুল হক বনাম রাষ্ট্র, ৫৫ ডিএলআর (২০০৩) ৪৬১: এজাহারের বিবরণের সাথে যদি চিকিৎসা সনদ ও জব্দ তালিকার মৌলিক ও অপূরণীয় স্ববিরোধ থাকে এবং অভিযোগের কোনো উপাদানই আইনত প্রমাণিত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তবে আদালত আসামীকে ২৪১ক ধারায় অব্যাহতি প্রদানে বাধ্য।
- আব্দুল লতিফ বনাম রাষ্ট্র, ৪০ ডিএলআর (এডি) ১৭১: ১৬১ ধারার জবানবন্দিতে স্বাক্ষর গ্রহণ তদন্তকে দূষিত করে এবং উক্ত সাক্ষ্যকে অবিশ্বস্ত করে তোলে।
৬. উপসংহার
অভিযোগে প্রাথমিক ভিত্তিহীনতা ও চিকিৎসাগত অসঙ্গতি বিদ্যমান থাকলে বিচারিক ট্রায়ালে সময় নষ্ট না করে চার্জ গঠনের স্তরেই আসামীদের অব্যাহতি লাভ আইনসম্মত অধিকার।
