কোন কোন চুক্তি সুনির্দিষ্টভাবে কার্যকর করা যায় না?

চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা (Specific Performance of a Contract) একটি বিশেষ আইনগত বিধান যা আদালতকে একটি চুক্তি বাস্তবায়ন করতে বাধ্য করার ক্ষমতা দেয়। তবে, কিছু চুক্তি সুনির্দিষ্টভাবে কার্যকর করা যায় না। এই ধরনের চুক্তিগুলি সাধারণত নির্দিষ্ট শর্ত এবং পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে, এবং সেগুলির বাস্তবায়ন অযৌক্তিক, অসম্ভব, বা অন্যান্য আইনি কারণে সম্ভব নয়।

আইনি ভিত্তি:

বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা আইনটি সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর অধীনে চলে, বিশেষত ধারা ১১-২১ পর্যন্ত। এই আইনে বলা হয়েছে, আদালত চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার আদেশ দেয় যখন চুক্তির বাস্তবায়ন যথার্থভাবে সম্ভব। তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা প্রদান করা হয় না।

সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা না দেওয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ:

১. অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট হলে: সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা কেবল তখনই প্রদান করা হয় যখন এটি অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে পূর্ণ করা সম্ভব না হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি চুক্তির বিষয়টি একক বা বিশেষ ধরনের কোনো সম্পত্তি হয়, তাহলে আদালত সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার আদেশ দিতে পারে। তবে, যদি কোনো চুক্তি সাধারণ পণ্য বা পরিষেবা সংক্রান্ত হয় এবং তা সহজেই বাজারে পাওয়া যায়, তাহলে আদালত কেবল আর্থিক ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে তা সমাধান করতে পারে।

উদাহরণ: কোনো ব্যক্তি যদি একটি বাড়ি কিনে এবং বিক্রেতা বাড়ি বিক্রি করতে অস্বীকার করে, তাহলে আদালত বিক্রেতাকে সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার মাধ্যমে বাড়ি হস্তান্তর করতে আদেশ দিতে পারে। কিন্তু, যদি কোনো চুক্তি সাধারণ পণ্যের বিক্রির জন্য হয়, তাহলে আদালত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে পারে, সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা নয়।

  1. যে চুক্তির শর্ত সম্পূর্ণরূপে অস্পষ্ট বা অবৈধ: আদালত সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা প্রদান করতে পারে না যদি চুক্তির শর্ত অবৈধ, অস্পষ্ট বা অযৌক্তিক হয়। এই ধরনের চুক্তি আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং এর কার্যকরতা কোনো অবস্থাতেই সুনির্দিষ্টভাবে মান্য করা যায় না।

    উদাহরণ: যদি কোন ব্যক্তি অপরের বিরুদ্ধে শর্তযুক্ত একটি চুক্তি করে যার শর্ত আইনগতভাবে অস্পষ্ট বা অবৈধ হয়, তবে আদালত সেই চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা প্রদান করবে না।

  2. যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে: চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা তখনই কার্যকর হতে পারে যখন চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সময় এবং পরিস্থিতি উপস্থিত থাকে। তবে, চুক্তির বিষয়টি দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবায়ন না হলে, বা একপক্ষ যদি চুক্তি বাস্তবায়ন করতে দীর্ঘ সময় নিয়ে থাকে, তখন আদালত সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা দিতে পারেন না।

    উদাহরণ: যদি এক পক্ষ বছরের পর বছর চুক্তি বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আদালত চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা দিতে পারে না।

  3. ব্যক্তিগত পরিষেবা সংক্রান্ত চুক্তি: ব্যক্তিগত পরিষেবা সম্পর্কিত চুক্তির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা প্রযোজ্য নয়। কারণ, কোনো ব্যক্তি যদি তার সেবা প্রদানে ব্যর্থ হয়, তাহলে আদালত তাকে জোর করে সেবা প্রদান করতে আদেশ দিতে পারে না। এটি মানুষের স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকারকে লঙ্ঘন করবে।

    উদাহরণ: যদি একজন শিল্পী কোনো চুক্তি করে একটি বিশেষ শিল্পকর্ম তৈরির জন্য এবং সে শিল্পী শিল্পকর্ম তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তবে আদালত তাকে সুনির্দিষ্টভাবে কাজ করতে বাধ্য করবে না। সেক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতিপূরণই একমাত্র উপায় হবে।

  4. যে চুক্তি ক্রিয়া বা পদক্ষেপের বাস্তবায়ন অসম্ভব বা অযৌক্তিক: যদি চুক্তির বাস্তবায়ন কোনো কারণে সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে যায়, তাহলে আদালত তার সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা প্রদান করবে না। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো পক্ষ চুক্তির শর্তাবলী বাস্তবায়ন করার জন্য শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে থাকে, তাহলে আদালত তাকে বাধ্য করতে পারে না।

    উদাহরণ: যদি কোনো ব্যক্তি চুক্তি অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট স্থানে জায়গা প্রদান করতে চায়, তবে সেক্ষেত্রে যদি সেই জায়গাটি অনুপস্থিত হয়ে যায় বা ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা প্রদান করা সম্ভব নয়।

কেস রেফারেন্স:

M. C. Chockalingam v. N. Natarajan (AIR 1964 SC 101) – এই মামলায়, আদালত একটি চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানায়, কারণ চুক্তির শর্তগুলি অস্পষ্ট ছিল এবং পক্ষগুলোর মধ্যে কোনো যৌক্তিকতা ছিল না।

উপসংহার:

চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা সব ক্ষেত্রে প্রদান করা সম্ভব নয়। আদালত সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা কেবল তখনই প্রদান করে যখন চুক্তির বাস্তবায়ন সম্ভব এবং তা ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে পূর্ণ করা সম্ভব নয়। এছাড়া, কোনো চুক্তি যদি অবৈধ, অস্পষ্ট, অসম্ভব বা অযৌক্তিক হয়, তাহলে আদালত সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা প্রদান করতে অস্বীকার করবে।