সিভিল প্রসিডিউর কোড (CPC), ১৯০৮ অনুসারে দেওয়ানি মামলার প্রক্রিয়া মোট ১৮টি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রতিটি ধাপের জন্য নির্দিষ্ট আদেশ (Order) এবং বিধান রয়েছে, যা মামলার যথাযথ পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রতিটি ধাপের বিস্তারিত ব্যাখ্যা, আইনি বিধান এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলার রেফারেন্সসহ আলোচনা করা হলো:
দেওয়ানি মামলার ১৮ টি ধাপঃ সিভিল প্রসিডিউর কোড, ১৯০৮ অনুযায়ী বিস্তারিত বিবরণ
১. আরজি দাখিল (Filing of Plaint) – Order 7
প্রক্রিয়া:
দেওয়ানি মামলার সূচনা হয় বাদী কর্তৃক আদালতে লিখিত আরজি (Plaint) দাখিলের মাধ্যমে।
আইনি বিধান:
Order 7 অনুযায়ী আরজিতে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো থাকতে হবে—
- বাদী ও বিবাদীর নাম, ঠিকানা
- মামলার কারণ (Cause of Action)
- দাবিকৃত প্রতিকার (Relief Sought)
- আদালতের এখতিয়ার (Jurisdiction)
প্রত্যাখ্যানের কারণ (Order 7 Rule 11):
আদালত নিম্নলিখিত কারণে আরজি খারিজ করতে পারেন—
- মামলার কারণ (Cause of Action) অনুপস্থিত
- আদালত ফি পরিশোধ না করা
- মামলাটি সময়সীমার বাইরে (Limitation Barred)
গুরুত্বপূর্ণ মামলা:
Rooplal Sathi vs. Nachhattar Singh (1983)—এই মামলায় বলা হয়েছে, আদালত পুরো আরজি খারিজ করতে পারেন তবে আংশিকভাবে খারিজ করতে পারেন না।
২. সমন জারি (Issuance of Summons) – Order 5
প্রক্রিয়া:
আদালত বিবাদীকে সমন জারি করে মামলার কথা জানায় এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবাব দাখিলের নির্দেশ দেয়।
আইনি বিধান:
Order 5 Rule 1 অনুযায়ী—
- সমনের মাধ্যমে বিবাদীকে মামলার বিষয় জানানো হয়।
- বিবাদীকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লিখিত জবাব (Written Statement) দাখিল করতে হয়।
বিকল্প পদ্ধতি (Order 5 Rule 20):
যদি বিবাদী সমন গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় বা লুকিয়ে থাকেন, তাহলে—
- দরজায় সমন টাঙিয়ে দেওয়া যায়।
- সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা যায়।
৩. পক্ষগণের উপস্থিতি (Appearance of Parties) – Order 9
প্রক্রিয়া:
- সমনে উল্লিখিত তারিখে বাদী ও বিবাদী আদালতে হাজির হন।
- বিবাদী হাজির না হলে মামলার শুনানি একতরফাভাবে হতে পারে।
আইনি বিধান (Order 9 Rule 6):
- বিবাদী অনুপস্থিত থাকলে আদালত একতরফা শুনানি করতে পারেন।
- যথাযথ কারণ দেখালে বিবাদী পরবর্তী সময়ে মামলায় অংশ নিতে পারেন।
৪. একতরফা ডিক্রি (Ex-parte Decree) – Order 9 Rule 6 & Order 8 Rule 10
প্রক্রিয়া:
- যদি বিবাদী সময়মতো হাজির না হন বা লিখিত জবাব দাখিল না করেন, তবে আদালত একতরফাভাবে মামলার রায় ঘোষণা করতে পারেন।
গুরুত্বপূর্ণ মামলা:
UCO Bank vs. M/S Iyengar Consultancy Services (1994)—এই মামলায় বলা হয়েছে, যদি বিবাদী একতরফা ডিক্রি বাতিল করতে চান, তবে তাকে “যুক্তিসঙ্গত কারণ” (Sufficient Cause) দেখাতে হবে।
৫. অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ (Interim Orders) – Orders 38, 39, 40
প্রক্রিয়া:
মামলা চলাকালীন আদালত প্রয়োজনীয় অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিতে পারেন, যা নিম্নলিখিত হতে পারে—
- সম্পত্তি ক্রোক (Attachment Before Judgment) – Order 38: মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে যদি বিবাদী সম্পত্তি লুকানোর চেষ্টা করেন, তাহলে বাদী আদালতের অনুমতি নিয়ে সেই সম্পত্তি ক্রোক করতে পারেন।
- অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Temporary Injunction) – Order 39: মামলার চলাকালীন কোনও পক্ষ যাতে অন্যায়ভাবে সুবিধা না নেয় বা ক্ষতি না করে, সে জন্য অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
- রিসিভার নিযুক্তি (Appointment of Receiver) – Order 40: আদালত বিতর্কিত সম্পত্তির দেখভালের জন্য নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে নিয়োগ করতে পারেন।
গুরুত্বপূর্ণ মামলা:
Dalpat Kumar vs. Prahlad Singh (1992)—এই মামলায় অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার শর্তাবলি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
৬. লিখিত জবাব দাখিল (Written Statement) – Order 8
প্রক্রিয়া:
- বিবাদীকে সমন পাওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে লিখিত জবাব (Written Statement) দাখিল করতে হয়।
- প্রয়োজনে এই সময়সীমা সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
আইনি বিধান:
- Order 8 Rule 1: লিখিত জবাব দাখিলের সময়সীমা ও নিয়মাবলি উল্লেখ করা হয়েছে।
- Order 8 Rule 5: যদি বিবাদী মামলার অভিযোগ অস্বীকার না করেন, তবে অভিযোগগুলো সত্য বলে গণ্য হতে পারে।
৭. দলিলপত্র জমা (Document Submission) – Order 13
প্রক্রিয়া:
- উভয় পক্ষ তাদের পক্ষে থাকা প্রয়োজনীয় ও প্রাসঙ্গিক দলিল আদালতে জমা দেন।
- Order 13 Rule 1: যদি কোনো পক্ষ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় দলিল দাখিল না করেন, তবে মামলার কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
৮. পক্ষগণের জেরা (Examination of Parties) – Order 10
প্রক্রিয়া:
- আদালত উভয় পক্ষকে মৌখিকভাবে জেরা করতে পারেন।
- Order 10 Rule 1: আদালত নিজে বা উভয় পক্ষের আইনজীবী প্রশ্ন করতে পারেন, যা মামলার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৯. প্রমাণ আবিষ্কার (Discovery & Inspection) – Order 11
প্রক্রিয়া:
- উভয় পক্ষ আদালতের অনুমতিক্রমে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।
- Order 11 Rule 1: পক্ষগণ লিখিত প্রশ্নাবলি (Interrogatories) পাঠিয়ে একে অপরের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।
১০. স্বীকৃতি নেওয়া (Admission of Facts) – Order 12
প্রক্রিয়া:
- এক পক্ষ অপর পক্ষকে নির্দিষ্ট তথ্য স্বীকার করতে বাধ্য করতে পারেন।
- Order 12 Rule 2: যদি কোনো পক্ষ সত্যতা স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং পরে তা সত্য প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হতে পারে।
১১. ইস্যু নির্ধারণ (Framing of Issues) – Order 14
প্রক্রিয়া:
- বিচারক মামলার মূল প্রশ্ন বা বিষয়গুলো চিহ্নিত করেন, যা বিচারকার্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
- Order 14 Rule 1: ইস্যুগুলো নির্ধারণ করা হয় মামলার অভিযোগ ও লিখিত জবাব বিশ্লেষণ করে।
- ইস্যুগুলো প্রধানত দুই প্রকার—
- প্রাথমিক ইস্যু (Issues of Law): যেমন, মামলাটি চলতে পারে কি না বা তা সময়সীমার মধ্যে দাখিল হয়েছে কি না।
- প্রমাণ নির্ভর ইস্যু (Issues of Fact): যেমন, “চুক্তি ভঙ্গ করা হয়েছে কি না?” বা “প্রতারণা সংঘটিত হয়েছে কি না?”
গুরুত্বপূর্ণ মামলা:
Kashi Nath v. Jaganath (1911)—এ বলা হয়েছে, ইস্যুগুলো অবশ্যই যথাযথভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে মামলার সুষ্ঠু নিষ্পত্তি হয়।
১২. সাক্ষী তলব (Summoning Witnesses) – Order 16
প্রক্রিয়া:
- পক্ষগণ তাদের পক্ষে সাক্ষী তালিকা আদালতে দাখিল করেন।
- আদালত সাক্ষীদের জবানবন্দি নেওয়ার জন্য সমন জারি করে।
- Order 16 Rule 1: সাক্ষীদের নাম ও তাদের সাক্ষ্যের প্রয়োজনীয়তা আদালতে জমা দিতে হয়।
- Order 16 Rule 10: সাক্ষী যদি সমন পেয়েও হাজির না হন, তবে আদালত তার বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারেন।
গুরুত্বপূর্ণ মামলা:
State of U.P. v. Raj Narain (1975)—এ বলা হয়েছে, প্রত্যেক পক্ষের সাক্ষী তলবের অধিকার থাকলেও আদালত অপ্রাসঙ্গিক সাক্ষী বাতিল করতে পারেন।
১৩. শুনানি ও সাক্ষ্য গ্রহণ (Hearing & Evidence) – Order 18
প্রক্রিয়া:
- বাদী প্রথমে তার সাক্ষীদের উপস্থাপন করেন এবং প্রমাণাদি আদালতে জমা দেন।
- সাক্ষ্য গ্রহণের সময়—
- প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য (Examination-in-Chief)
- জেরা (Cross-Examination)
- পুনরায় জেরা (Re-Examination)
- Order 18 Rule 1: বাদী সাধারণত প্রথমে সাক্ষ্য উপস্থাপন করেন, তবে বিশেষ ক্ষেত্রে বিবাদী আগে সাক্ষ্য দিতে পারেন।
- Order 18 Rule 4: সাক্ষ্যগ্রহণ লিখিত আকারে সংরক্ষণ করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ মামলা:
Laxmibai v. Bhagwantbuva (2013)—এ বলা হয়েছে, সাক্ষ্য নেওয়ার সময় নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি।
১৪. যুক্তিতর্ক (Final Arguments)
প্রক্রিয়া:
- উভয় পক্ষ তাদের আইনগত যুক্তি উপস্থাপন করেন।
- সাক্ষ্য ও উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতে আইনজীবীরা আদালতের কাছে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
- যদিও কোনো নির্দিষ্ট আদেশ নেই, তবে Order 18 Rule 2(3)-এ বলা হয়েছে, বিচারক চাইলে যুক্তিতর্কের পর লিখিত বক্তব্য (Written Submission) গ্রহণ করতে পারেন।
গুরুত্বপূর্ণ মামলা:
Balraj Taneja v. Sunil Madan (1999)—এ বলা হয়েছে, যুক্তিতর্কের সময় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা বিচারকের দায়িত্ব।
১৫. রায় প্রদান (Judgment) – Order 20
প্রক্রিয়া:
- বিচারক উভয় পক্ষের যুক্তি ও সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন।
- Order 20 Rule 1: সাধারণত ৩০ দিনের মধ্যে রায় লিখিত আকারে প্রকাশ করতে হয়। বিশেষ পরিস্থিতিতে ৬০ দিন পর্যন্ত সময় বাড়ানো যেতে পারে।
- রায়ে আদালত যুক্তি (Reasoning) ও ফলাফল (Findings) তুলে ধরেন।
গুরুত্বপূর্ণ মামলা:
Balraj Taneja vs. Sunil Madan (1999)—এ বলা হয়েছে, রায় অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত হতে হবে এবং কোনো পক্ষের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হওয়া যাবে না।
১৬. ডিক্রি প্রস্তুত (Decree Preparation) – Order 20 Rule 6
প্রক্রিয়া:
- রায়ের ভিত্তিতে আদালত ডিক্রি (Decree) প্রস্তুত করেন, যা মামলার চূড়ান্ত আদেশের লিখিত রূপ।
- Order 20 Rule 6: ডিক্রিতে প্রতিকারের বিবরণ ও আদেশের শর্তাবলি উল্লেখ থাকতে হবে।
- মামলায় কে জয়ী হলো এবং কী প্রতিকার পাবে তা ডিক্রিতে নির্ধারিত হয়।
গুরুত্বপূর্ণ মামলা:
Phoolchand vs. Gopal Lal (1967)—এ বলা হয়েছে, ডিক্রি অবশ্যই স্পষ্ট ও কার্যকর হতে হবে।
১৭. আপিল/পুনর্বিবেচনা (Appeal/Review) – Section 96-99, Order 47
প্রক্রিয়া:
- যদি কোনো পক্ষ রায়ে সন্তুষ্ট না হয়, তবে তারা উচ্চতর আদালতে আপিল করতে পারে।
- Section 96-99, Order 41: প্রথম আপিলের (First Appeal) সময়সীমা ৩০-৯০ দিন।
- Order 47 Rule 1: পুনর্বিবেচনার (Review) আবেদন দাখিল করা যায়, যদি নতুন প্রমাণ পাওয়া যায় বা আইনি ত্রুটি থাকে।
গুরুত্বপূর্ণ মামলা:
Arunachalam vs. P.S.R. Sadhanantham (1979)—এ বলা হয়েছে, আপিল করার অধিকার গুরুত্বপূর্ণ তবে এটি যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
১৮. ডিক্রি কার্যকর (Execution) – Order 21
প্রক্রিয়া:
- ডিক্রি কার্যকর করার জন্য আদালত বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে পারে, যেমন—
- সম্পত্তি ক্রোক (Attachment)
- সম্পত্তি বিক্রয় (Sale)
- গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (Arrest & Detention)
- Order 21 Rule 32: যদি কোনো পক্ষ আদালতের আদেশ মানতে ব্যর্থ হয়, তবে আদালত কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ মামলা:
Gajraj vs. IVth Addl. District Judge (1991)—এ কার্যকর প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
উপসংহার:
এই ১৮টি ধাপে দেওয়ানি মামলার ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা হয়। প্রতিটি ধাপে CPC-এর বিধান ও বিচারিক নজির (Judicial Precedents) অনুসরণ করা জরুরি।