[t4b-ticker]

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ এর উদ্দেশ্য ও প্রয়োগ

ভূমিকা:

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ (The Specific Relief Act, 1877) মূলত চুক্তি লঙ্ঘন, বেআইনি দখল এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রতিকার প্রদান করে। দেওয়ানি আইনগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইন, যা ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে আদালতের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রতিকার (specific relief) পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে।


আইনের উদ্দেশ্য:

এই আইনের মূল উদ্দেশ্য নিম্নরূপ—

১. ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার প্রদান

অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট প্রতিকার হয় না। তাই এই আইন আদালতকে ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে নির্দিষ্ট প্রতিকার প্রদানের ক্ষমতা দেয়।

🔹 উদাহরণ: যদি একজন বিক্রেতা চুক্তি অনুযায়ী জমি হস্তান্তর করতে ব্যর্থ হয়, তবে ক্রেতা ক্ষতিপূরণের বদলে জমি হস্তান্তরের জন্য আদালতের আদেশ চাইতে পারেন।


২. চুক্তির সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা

এই আইনের মাধ্যমে পক্ষগণকে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা পালন করাতে আদালত আদেশ দিতে পারে।

🔹 ধারা ১২-৩০: চুক্তির সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন সংক্রান্ত বিধান রয়েছে।
🔹 রায়: Ardeshir H. Mama v. Flora Sassoon (1928)— যেখানে আদালত বলেন, “যদি ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট না হয়, তবে সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার আদেশ দেওয়া যেতে পারে।”


৩. বেআইনি দখল থেকে সম্পত্তির পুনরুদ্ধার

কোনো ব্যক্তি যদি বেআইনিভাবে অন্যের সম্পত্তি দখল করে, তবে এই আইন মালিককে সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের প্রতিকার প্রদান করে।

🔹 ধারা ৮-১১: স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির পুনরুদ্ধারের বিধান রয়েছে।
🔹 রায়: K.K. Verma v. Union of India (1954)— এই মামলায় বলা হয় যে প্রকৃত মালিক আদালতের অনুমতি ছাড়া জোরপূর্বক কাউকে উচ্ছেদ করতে পারে না।


৪. প্রতিষেধক আদেশ (Injunction) প্রদান

এই আইনের অধীনে আদালত কোনো অবৈধ কাজ সম্পাদন বা সম্পত্তির ক্ষতি প্রতিরোধে প্রতিষেধক আদেশ দিতে পারে।

🔹 ধারা ৩৬-৪২: অস্থায়ী ও স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার বিধান রয়েছে।
🔹 রায়: American Cyanamid Co. v. Ethicon Ltd. (1975)— যেখানে আদালত বলেন, “অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘balance of convenience’ নীতি অনুসরণ করতে হবে।”


৫. ঘোষণামূলক প্রতিকার প্রদান

কোনো ব্যক্তির অধিকার সম্পর্কে সন্দেহ থাকলে আদালত এই আইনের আওতায় ঘোষণামূলক ডিক্রি দিতে পারে।

🔹 ধারা ৪২: ঘোষণামূলক প্রতিকারের বিধান রয়েছে।
🔹 রায়: Ganga Bai v. Vijay Kumar (1974)— যেখানে বলা হয়, “কোনো ব্যক্তি যদি তার অধিকার সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চান, তবে তিনি ঘোষণামূলক ডিক্রির জন্য আদালতে আবেদন করতে পারেন।”


৬. দলিল সংশোধন ও বাতিলকরণ

যদি কোনো দলিলে ভুল থেকে থাকে বা প্রতারণার মাধ্যমে দলিল প্রস্তুত করা হয়, তবে এই আইনের অধীনে দলিল সংশোধন বা বাতিল করা যেতে পারে।

🔹 ধারা ৩১-৩৫: দলিল সংশোধন ও বাতিল সংক্রান্ত বিধান রয়েছে।
🔹 রায়: Javer Chand v. Pukhraj Surana (1962)— এই মামলায় আদালত বলেন, “যদি প্রতারণার মাধ্যমে কোনো দলিল প্রস্তুত করা হয়, তবে তা বাতিল করা যেতে পারে।”


৭. রিসিভার নিয়োগের বিধান

এই আইনের আওতায় আদালত কোনো সম্পত্তি বা ব্যবসার দেখভালের জন্য রিসিভার নিয়োগ করতে পারে।

🔹 ধারা ৪৪: রিসিভার নিয়োগের বিধান রয়েছে।


আইনের প্রয়োগ:

এই আইন বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়—

১. চুক্তি লঙ্ঘন সংক্রান্ত মামলা

যখন কোনো পক্ষ চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে, তখন ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে আদালত চুক্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারে।

🔹 উদাহরণ: কোনো কোম্পানি নির্দিষ্ট মূল্যে পণ্য সরবরাহ করতে রাজি হয়, কিন্তু পরবর্তীতে তা না করলে ক্রেতা চুক্তির বাস্তবায়ন চাইতে পারেন।


২. সম্পত্তির বেআইনি দখল সংক্রান্ত মামলা

যদি কোনো ব্যক্তি বেআইনিভাবে অন্যের সম্পত্তি দখল করে, তবে প্রকৃত মালিক আদালতের মাধ্যমে সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করতে পারেন।

🔹 উদাহরণ: কোনো ভাড়াটিয়া মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বাড়ি ছাড়তে না চাইলে বাড়ির মালিক ধারা ৯ অনুযায়ী প্রতিকার চাইতে পারেন।


৩. প্রতিষেধক আদেশের মাধ্যমে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ

কোনো বেআইনি নির্মাণ বা কার্যকলাপ প্রতিরোধের জন্য আদালত প্রতিষেধক আদেশ দিতে পারে।

🔹 উদাহরণ: একজন প্রতিবেশী যদি অন্যের জমিতে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ করতে শুরু করে, তাহলে মালিক আদালতের মাধ্যমে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা পেতে পারেন।


উপসংহার:

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ বাংলাদেশের দেওয়ানি আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইন, যা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি চুক্তির বাস্তবায়ন, সম্পত্তি পুনরুদ্ধার, নিষেধাজ্ঞা প্রদান এবং ঘোষণামূলক ডিক্রি জারির মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।