আদালত যে কোনো পর্যায়ে মামলা সংশোধনের অনুমতি দিতে পারে

“The Code may at any stage of the proceedings allow either party to amend the pleadings.” — মুল মামলা এবং আপিল চলাকালে এই ধারনার গ্রহণযোগ্যতা ব্যাখ্যা করুন।

ভূমিকা:

বিচার প্রক্রিয়ায় সত্যের প্রতিষ্ঠা এবং সুবিচার প্রদান নিশ্চিত করতে সংশোধন বা amendment একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা হিসেবে বিবেচিত হয়। মামলা দায়েরের সময় কোনো ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতা থাকলে, সেগুলোর পরিমার্জন করার সুযোগ আদালত যে কোনো পর্যায়ে দিতে পারে। সুতরাং, Civil Procedure Code (CPC) এর অধীনে ধারা ১৫১ এবং ১৫৩ এর মাধ্যমে আদালতকে সংশ্লিষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যাতে আদালত প্রয়োজনে যে কোনো দলকে তার অভিযোগ (pleadings) সংশোধনের অনুমতি দিতে পারে।

দেওয়ানি কার্যবিধির (Code of Civil Procedure, 1908) আদেশ ৬ বিধি ১৭-এর অধীনে আদালত যে কোনো পর্যায়ে মামলা সংশোধনের অনুমতি দিতে পারে। সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য হল বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও নির্ভুল ও ন্যায়সঙ্গত করা, যাতে পক্ষগণ তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারে এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।

মুল মামলার চলাকালে সংশোধনী:

মূল মামলার যে কোনো পর্যায়ে, আদেশ ৬ এবং ১৭ বিধির আওতায় মামলা সংশোধনের অনুমতি দেয়া যেতে পারে। এখানে মূল দৃষ্টিভঙ্গি হল, সংশোধনী প্রক্রিয়াটি ন্যায়বিচারের স্বার্থে অনুমোদিত হওয়া উচিত। যদি সংশোধনের ফলে পক্ষগণ তাদের অবস্থান বা বিবৃতিতে আরও সুস্পষ্টভাবে যুক্তি স্থাপন করতে সক্ষম হয়, তবে আদালত তা গ্রহণ করতে পারে।

উদাহরণ:

উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি পক্ষ মূল মামলা দায়ের করার সময় ভুলবশত কিছু তথ্য বাদ দিয়ে থাকে বা ভুলভাবে উপস্থাপন করে থাকে, তবে সেই পক্ষ আদালতে আবেদন করতে পারে তার অভিযোগ সংশোধনের জন্য। আদালত এই সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা পরীক্ষা করে যদি দেখে যে, এই সংশোধনীর মাধ্যমে মামলার প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন করা সম্ভব এবং এর ফলে বিপরীত পক্ষের উপর কোনো অযথা ক্ষতি বা প্রভাব পড়বে না, তবে সংশোধনের অনুমতি প্রদান করা হবে। এরূপ একটি উদাহরণ হলো Raghunath Goyal v. Krishna Khanduja (2013) মামলায় আদালত সংশোধনের অনুমতি দিয়েছিল।

মৌলিক কারণসমূহ:

১. সংশোধনের আবেদনটি এমন পর্যায়ে আসতে হবে যেখানে এটি পক্ষগণকে কেবলমাত্র সুবিধা দান করবে না বরং মামলার প্রকৃত পরিস্থিতিকে বিচারকার্যকে সহজতর করতে সহায়ক হবে। ২. সংশোধনী যদি মামলার মূল প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তবে বিচারক এটি অনুমোদন করতে পারেন। যেমন, কোনও ভুল বা তথ্যের অপ্রতুলতার কারণে যদি মামলা পরিচালনা বাধাগ্রস্ত হয়, তখন সংশোধনী প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে।

রায় প্রক্রিয়ায় সংশোধনী:

আদালত যে কোনো পর্যায়ে এমনকি রায় ঘোষণার পরে কিংবা আপিল প্রক্রিয়া চলাকালীন সংশোধনের আবেদন গ্রহণ করতে পারে। এর লক্ষ্য হল, ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। আদালত ন্যায়বিচারকে সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়ে পক্ষগণকে সংশোধনের সুযোগ দিতে পারে, যদি তা বিচারকৃত মূল মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় এবং কোনও পক্ষকে আর্থিক বা অন্য কোনও ক্ষতির সম্মুখীন না করে।

সংশোধনের আইনি ভিত্তি:

দেওয়ানি কার্যবিধির অধীনে, মামলার পক্ষগণ তাদের দাবি বা বিবৃতিতে ভুল বা তথ্যের অপ্রতুলতার জন্য যে কোনো পর্যায়ে সংশোধনের আবেদন করতে পারে। তবে, সংশোধনের প্রস্তাবটি এমন হতে হবে যা মামলার মূল প্রতিপাদ্যকে পরিবর্তন না করে বরং তা আরও পরিষ্কার করে।

i. ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা:

ন্যায় বিচার (Justice) নিশ্চিত করা প্রতিটি বিচারিক প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য। যখন কোনো পক্ষ আদালতে মামলা করে, তখন তারা আশা করে যে বিচারিক প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হবে এবং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা হবে।

  • মুল বক্তব্য: আদালত যাতে পক্ষপাতিত্বহীনভাবে উভয় পক্ষের যুক্তি এবং প্রমাণাদি মূল্যায়ন করে সঠিক রায় প্রদান করে।
  • সংশোধনী আনার কারণ: মামলা চলাকালে যদি কোনো ভুল বা অপ্রতুল তথ্য থাকে, তাহলে তা সংশোধনের মাধ্যমে মামলাটির প্রকৃত অবস্থা প্রতিফলিত করা হয়। এতে ভুল সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা কমে এবং ন্যায় বিচার নিশ্চিত হয়।
ii. পক্ষগণের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধ নিরসন করা:

মামলার মূল উদ্দেশ্যই হলো পক্ষগণের মধ্যে বিরোধের সঠিক সমাধান করা। বিরোধ তখনই সমাধান হয় যখন উভয় পক্ষ আদালতে তাদের বক্তব্য বা দাবি সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয় এবং আদালত নিরপেক্ষভাবে তা বিশ্লেষণ করে রায় প্রদান করে।

  • মুল বক্তব্য: আদালতের প্রধান দায়িত্ব হলো উভয় পক্ষের মধ্যে যে মতপার্থক্য বা বিরোধ আছে, তা সঠিকভাবে নিরসন করা।
  • সংশোধনী আনার কারণ: যদি মামলার প্রক্রিয়া চলাকালে কোনো পক্ষ তাদের বক্তব্য বা প্রমাণ যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা সংশোধনের মাধ্যমে পুনরায় উপস্থাপন করতে পারে। এতে বিরোধ সঠিকভাবে সমাধান করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
iii. কার্যবিধির যথাযথ নীতি অনুসরণ করা:

বিচার প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় নির্দিষ্ট আইনি বিধান ও নীতিমালার মাধ্যমে। এই কার্যবিধি অনুসরণ করে বিচারক সিদ্ধান্ত নেন এবং মামলার প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়।

  • মুল বক্তব্য: আদালত আইন অনুযায়ী প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে অনুসরণ করে এবং সংশ্লিষ্ট কার্যবিধি মেনে সিদ্ধান্ত প্রদান করে।
  • সংশোধনী আনার কারণ: সংশোধনের মাধ্যমে কার্যবিধি অনুসারে মামলার প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে সম্পন্ন করা যায়। যদি কোনো পক্ষ ভুল করে অথবা কোনো আইনি বিধান অমান্য করে, তবে সংশোধনী আনার মাধ্যমে তা সংশোধন করা সম্ভব।

কেস আইন:

রাধাকৃষ্ণ বনাম বনানী দাস [৩৬ ডিএলআর (এডি) ২৫৩] কেসটি সংশোধনীর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে। এই মামলায় আদালত রায় দেয় যে, সংশোধনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সুযোগ আরও বৃদ্ধি পায়, যদি সংশোধনীর কারণে অন্য পক্ষের প্রতি অন্যায় না হয়।

কেসটিতে আদালত সিদ্ধান্তে এসেছে যে সংশোধনের অনুমতি তখনই দেওয়া উচিত যখন তা:

১. পক্ষগণের অবস্থানকে আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে; ২. ন্যায়বিচার প্রাপ্তির জন্য অপরিহার্য হয়; এবং ৩. মামলার মূল বিষয়বস্তু পরিবর্তন করে না।

আপিল চলাকালে সংশোধন:

আপিল প্রক্রিয়ার মধ্যেও সংশোধন সম্ভব। আপিলের বিচারিক আদালতও সংশোধনের অনুমতি দিতে পারে, যদি দেখা যায় যে মূল মামলার সময় কিছু তথ্য অজানা ছিল অথবা ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছিল। তবে, এখানে সংশোধনের আবেদনটি এমনভাবে হতে হবে যাতে তা মামলার মূল প্রতিপাদ্য পরিবর্তন না করে।

উচ্চ আদালত আপিলের সময়ও সংশোধনের আবেদন গ্রহণ করে, যদি দেখা যায় যে, সংশোধনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার আরও সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং পক্ষগণ কোনও আর্থিক বা অন্যান্য ক্ষতির সম্মুখীন হবে না।

উল্লেখযোগ্য কেস:

শ্রীরাম বনাম রাষ্ট্র [এআইআর ১৯৫৩ এসসি ৪২৫] কেসটিতে আদালত সিদ্ধান্ত দেন যে, আপিলের সময়ও সংশোধন করা সম্ভব। মামলার চলাকালীন কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা দাবি বাদ গেলে, সংশোধনের মাধ্যমে তা পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে, যদি তা ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজন হয়।

Rajkumar Gurawara v. S.K. Sarwagi & Co. Pvt. Ltd. (2008) মামলায় আপিলের সময় সংশোধনীর অনুরোধ করা হলে আদালত বলেছিল যে, শুধুমাত্র সেই সংশোধন অনুমোদন করা উচিত যা মামলার প্রকৃত বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত এবং নতুন কোন যুক্তি বা প্রমাণ না এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।

সংশোধনীর সীমাবদ্ধতা:

যদিও সংশোধনীর মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে, তবে সংশোধনের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে:

  • বিলম্ব: সংশোধনী আবেদন যদি অযৌক্তিকভাবে বিলম্বিত হয় এবং সেই বিলম্বের পেছনে যুক্তিসঙ্গত কারণ না থাকে, তবে সংশোধনীর আবেদন আদালত মঞ্জুর করবে না।
  • বিপরীত পক্ষের ক্ষতি: সংশোধনের ফলে যদি বিপরীত পক্ষকে অযথা ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়, তবে সেই সংশোধনী আদালত গ্রহণ করবে না। আদালত দেখবে যে সংশোধনীটি শুধুমাত্র প্রকৃত তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে কি না, এবং বিপরীত পক্ষের ন্যায়বিচারের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয় কি না।
  • সত্যের প্রতিষ্ঠা: আদালত সংশোধনীর অনুমতি দেওয়ার সময় লক্ষ্য করবে যে সংশোধনীটি মামলার সত্য ঘটনাগুলো প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক হবে কি না। মূল মামলার পক্ষ যদি সংশোধনী মাধ্যমে মূল বক্তব্যকে সুস্পষ্ট করতে চায়, তাহলে আদালত সাধারণত সেই সংশোধনীর অনুমতি দেবে।

উপসংহার:

মামলার যে কোনও পর্যায়ে সংশোধন একটি প্রয়োজনীয় এবং গৃহীত পদ্ধতি। তবে সংশোধনীর আবেদনটি ন্যায়বিচারের স্বার্থে হতে হবে এবং অন্য পক্ষের প্রতি কোনও অবিচার না করে মামলার প্রকৃত বিষয়বস্তুকে পরিষ্কার করতে সহায়ক হতে হবে। দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৬ বিধি ১৭ এবং কেস আইনের আলোকে, সংশোধনী মূলত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্যই প্রযোজ্য।

সংশোধনী আবেদন করার ক্ষেত্রে আদালতের মূল উদ্দেশ্য হল, বিচার প্রক্রিয়াকে আরও নির্ভুল ও সঠিকভাবে সম্পন্ন করা, যাতে পক্ষগণের পক্ষ থেকে যথাযথ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। সংশোধনী মামলার যে কোনো পর্যায়ে আনা যেতে পারে, তবে সংশোধনীর প্রয়োজনীয়তা ও ন্যায়সঙ্গতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট আইন ও কেস আইনগুলোকে বিবেচনায় নিতে হবে।

“The Code may at any stage of the proceedings allow either party to amend the pleadings” এই ধারণাটি বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মূল মামলার সময়, সংশোধনীর ব্যাপারে আদালত অনেক বেশি উদার মনোভাব পোষণ করে, কারণ ন্যায়বিচার প্রদানই প্রধান লক্ষ্য। তবে আপিলের সময়, সংশোধনের অনুমতি কিছুটা কঠোরভাবে পরীক্ষা করা হয়। সংশোধনীর মাধ্যমে মামলার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই আদালতের লক্ষ্য হওয়া উচিত।