স্পষ্ট ও সংক্ষিপ্ত চুক্তি ড্রাফটিং করার নিয়ম

একটি চুক্তি ড্রাফট করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন কাজ, কারণ এটি দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে আইনি বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে। চুক্তির উদ্দেশ্য হল একটি পরিষ্কার, নির্দিষ্ট এবং আইনি হিসেবে পর্যালোচনাযোগ্য দলিল তৈরি করা। একটি স্পষ্ট ও সংক্ষিপ্ত চুক্তি ড্রাফট করতে হলে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা জরুরি। এখানে সেই নিয়মগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

১. চুক্তির শিরোনাম স্পষ্ট করা

চুক্তির শুরুতেই তার উদ্দেশ্য এবং বিষয় সংক্ষেপে উল্লেখ করা উচিত। এটি পরবর্তীতে চুক্তির উদ্দেশ্য বোঝানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।

  • কী করবেন:
    • চুক্তির শিরোনামে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন, এটি কোন ধরনের চুক্তি (যেমন, “পণ্য বিক্রয় চুক্তি”, “ভাড়া চুক্তি” ইত্যাদি)।

২. পক্ষগুলির পরিচিতি প্রদান

চুক্তির প্রথম অংশে উভয় পক্ষের নাম, ঠিকানা, পরিচিতি এবং তাদের প্রতিনিধিদের নাম (যদি থাকে) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত। এটি চুক্তির জন্য দায়িত্বশীল পক্ষগুলির পরিচয় নির্ধারণ করে।

  • কী করবেন:
    • চুক্তিতে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তির (বা প্রতিষ্ঠানের) নাম, ঠিকানা, সংস্থা বা ব্যক্তি পরিচিতি, এবং আইনি পদবি উল্লেখ করুন।

৩. চুক্তির বিষয়বস্তু ও উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা

চুক্তির উদ্দেশ্য এবং উদ্দেশ্য অনুযায়ী পারস্পরিক অধিকার, দায়িত্ব ও শর্তগুলি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। পক্ষগুলোর দায়িত্ব এবং কর্তব্য গুলি সংক্ষিপ্তভাবে ও পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা উচিত।

  • কী করবেন:
    • চুক্তির প্রেক্ষাপটে পক্ষগুলোর অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ও নির্দিষ্ট ভাষায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা করুন।
    • যেকোনো নির্দিষ্ট বিষয় যেমন শর্তাবলী, সময়ে সময়ে চুক্তি রিনিউ বা নবায়ন করা যাবে কিনা, বিষয়গুলো চুক্তিতে তুলে ধরুন।

৪. পেমেন্ট শর্তাবলী স্পষ্ট করা

চুক্তিতে পেমেন্ট সম্পর্কিত শর্তাবলী এবং মুদ্রার পরিমাণও পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা উচিত। পেমেন্টের সময়সীমা, পদ্ধতি এবং অন্য কোনো পেমেন্ট সম্পর্কিত শর্তাবলী নির্ধারণ করা উচিত।

  • কী করবেন:
    • চুক্তিতে যে পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হবে এবং কখন প্রদান করতে হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করুন।
    • পেমেন্টের পদ্ধতি (যেমন, ব্যাংক ট্রান্সফার, চেক, নগদ) এবং সময়সীমা স্পষ্টভাবে লিখুন।

৫. সমাপ্তির শর্তাবলী

চুক্তি কতদিন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে এবং কোনো পক্ষ যদি শর্ত লঙ্ঘন করে, তার কী পরিণতি হবে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।

  • কী করবেন:
    • চুক্তির মেয়াদ এবং চুক্তি বাতিল বা সমাপ্ত করার শর্ত উল্লেখ করুন।
    • কোনো পক্ষ যদি চুক্তি ভঙ্গ করে, তখন কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তাও উল্লেখ করুন।

৬. আইনি দায়িত্ব ও নিষেধাজ্ঞা

এখানে চুক্তির লঙ্ঘন, ক্ষতিপূরণ এবং আইনি ব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

  • কী করবেন:
    • চুক্তির লঙ্ঘন হলে পক্ষের ওপর কী আইনি শাস্তি বা ক্ষতিপূরণ আরোপ হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করুন।
    • কোনো শর্ত ভঙ্গ হলে আইনি পদক্ষেপ বা মামলা মোকাবেলার কৌশল উল্লেখ করুন।

৭. বিশেষ শর্তাবলী

কিছু চুক্তি বিশেষ শর্ত নির্ধারণ করতে পারে, যেমন গোপনীয়তা রক্ষা, সুরক্ষা ব্যবস্থা বা অন্য কোনো অতিরিক্ত দায়িত্ব যা চুক্তির অন্যান্য পক্ষের জন্য প্রযোজ্য।

  • কী করবেন:
    • গোপনীয়তা, নিরাপত্তা বা অন্য কোনো সংবেদনশীল বিষয় থাকে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন।

৮. আইনি শর্তাবলী

চুক্তির মধ্যে আইনি শর্তাবলী অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যা আইনের ভিত্তিতে চুক্তির কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে। এখানে চুক্তি সংশ্লিষ্ট আইন, বিচারব্যবস্থা এবং আইনগত বৈধতা সম্পর্কে উল্লেখ করা উচিত।

  • কী করবেন:
    • চুক্তি সংশ্লিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের আইনগত শর্তাবলী উল্লেখ করুন।
    • চুক্তি বাস্তবায়ন বা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট আদালত বা সালিশী পদ্ধতি চিহ্নিত করুন।

৯. পক্ষগুলির সম্মতি এবং সাক্ষর

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চুক্তির সাথে সম্মতি জানানো এবং সাক্ষর প্রদান হল চুক্তির আইনি বৈধতার প্রমাণ।

  • কী করবেন:
    • প্রতিটি পক্ষের সাক্ষর এবং তারিখ নিশ্চিত করুন।
    • প্রত্যেক পক্ষের প্রতিনিধি যদি থাকে, তাদের নাম এবং পদবি উল্লেখ করুন।

১০. চুক্তির কপি বিতরণ

চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর, উভয় পক্ষের কাছে চুক্তির একটি কপি পৌঁছানো নিশ্চিত করুন।

  • কী করবেন:
    • চুক্তির কপি উভয় পক্ষকে দেওয়ার পর, সেই কপির সঠিক রেকর্ড রাখতে নিশ্চিত হন।

উপসংহার:

একটি স্পষ্ট ও সংক্ষিপ্ত চুক্তি লেখার জন্য উপরোক্ত নিয়মগুলির প্রতি লক্ষ্য রেখে চুক্তিটি ড্রাফট করা উচিত। এতে চুক্তির বিষয়বস্তু পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করা যাবে, এবং উভয় পক্ষই তাদের অধিকার ও দায়িত্ব বুঝতে পারবে, যা পরবর্তীতে আইনি জটিলতা এড়াতে সহায়ক হবে।