সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা (Specific Performance) হল একটি আদালত-নির্দেশিত আইনগত পদক্ষেপ যা চুক্তির নির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী বাস্তবায়ন করার আদেশ দেয়। এটি সাধারণত তখনই প্রযোজ্য হয় যখন কোনো চুক্তির অংশ বা পুরো চুক্তির বাস্তবায়ন কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে সম্ভব নয় এবং চুক্তির বিষয়টি একান্তভাবে বিশেষ বা অনন্য। সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা পেতে যে ধরনের চুক্তি যোগ্য হয় তা নীচে আলোচনা করা হলো:
১. সম্পত্তির সম্পর্কিত চুক্তি:
সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা সাধারণত সম্পত্তি সম্পর্কিত চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য দেয়া হয়, বিশেষত যখন সম্পত্তি বিরল বা বিশেষ কিছু হয়। বিশেষ সম্পত্তি, যেমন একটি ঐতিহাসিক বা বিরল জিনিস বা জমি, যেটি অন্য কোনো সম্পত্তির মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে আদালত সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা প্রদান করতে পারে।
উদাহরণ:
যদি কোনো ব্যক্তি কোনো বিশেষ জায়গা বা সম্পত্তি বিক্রির জন্য চুক্তি করে এবং বিক্রেতা সেই সম্পত্তি সরিয়ে নিতে অস্বীকার করে, তবে আদালত সেই বিশেষ সম্পত্তি সুনির্দিষ্টভাবে হস্তান্তর করতে নির্দেশ দিতে পারে, কারণ এটি আর্থিক ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে পূর্ণ করা সম্ভব নয়।
২. বিশেষ শর্তাবলী সংক্রান্ত চুক্তি:
যখন কোনো চুক্তি একান্তভাবে বিশেষ শর্তাবলী বা পরিষেবা সংক্রান্ত হয়, যা অন্য কোনো প্রতিস্থাপনযোগ্য পণ্য বা পরিষেবার মাধ্যমে পূর্ণ করা সম্ভব নয়, তখন সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা প্রয়োগ করা হতে পারে। এই ধরনের চুক্তি সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার জন্য যোগ্য হতে পারে যদি চুক্তির বিষয়টি বিশেষ এবং অসাধারণ হয়।
উদাহরণ:
যদি কোনো শিল্পী বা লেখক চুক্তি করে বিশেষ কোনো শিল্পকর্ম বা গ্রন্থ তৈরি করার জন্য এবং সে তা তৈরি করতে অস্বীকার করে, তবে আদালত তাকে সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার মাধ্যমে কাজ করতে বাধ্য করতে পারে।
৩. কার্যকরী চুক্তি যা দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য:
যে চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য এবং কোন যুক্তিসঙ্গত কারণে কার্যকর করা সম্ভব নয় এমন দৃষ্টিকোণ থেকে অসুবিধা সৃষ্টি করবে না, এমন চুক্তিও সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার জন্য প্রযোজ্য হতে পারে। তবে, যদি চুক্তির বাস্তবায়ন সম্ভব হলে এবং যদি চুক্তি অন্যথায় অসম্ভব না হয়ে থাকে, তখন আদালত এই ধরনের চুক্তি বাস্তবায়ন করতে নির্দেশ দিতে পারে।
উদাহরণ:
যদি এক পক্ষ কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কিছু পণ্য সরবরাহ করতে চুক্তিবদ্ধ হয় এবং সে তা সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়, তবে আদালত সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা প্রদানের মাধ্যমে তাকে তা সরবরাহ করতে বাধ্য করতে পারে।
৪. যেখানে চুক্তির উদ্দেশ্য একান্তভাবে নির্দিষ্ট বা একতরফা:
এমন চুক্তি, যেখানে এক পক্ষকে নির্দিষ্ট কর্তব্য সম্পাদন করতে বাধ্য করা হয় এবং সে কার্যকরভাবে একতরফা দায়িত্ব পালন করতে পারে, সেগুলিও সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার আওতায় আসতে পারে। এর মধ্যে প্রাথমিক শর্তটি হল যে চুক্তির বাস্তবায়ন দ্বারা প্রকৃত আঘাত বা ক্ষতি হয়নি।
উদাহরণ:
যদি কোনো ব্যক্তি কোন প্রতিষ্ঠানের কর্মীকে সুনির্দিষ্ট কাজে নিয়োগ দেয় এবং কর্মী তার দায়িত্ব পালন করতে অস্বীকার করে, তবে আদালত তাকে সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার আদেশ দিতে পারে।
৫. সম্পর্কিত পক্ষের সম্মতি এবং আইনগত ভিত্তি:
এমন চুক্তি যা কোনো বৈধ উদ্দেশ্য বা আইনের অধীনে তৈরি হয় এবং যার বাস্তবায়ন কোনো বিশেষ আইনগত ভিত্তির উপর নির্ভর করে, সেগুলিও সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার জন্য যোগ্য হতে পারে। তবে, এটি তখনই প্রযোজ্য হবে যখন এর বাস্তবায়ন আইনি কারণে প্রয়োজনীয় এবং অন্য কোনো উপায়ে পূর্ণ করা সম্ভব নয়।
উদাহরণ:
যদি দুটি পক্ষ একটি নির্মাণ কাজের জন্য চুক্তি করে এবং এক পক্ষ নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ শুরু করে, তবে আদালত সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার মাধ্যমে তাকে কাজ সম্পন্ন করতে নির্দেশ দিতে পারে।
কেস রেফারেন্স:
M. C. Chockalingam v. N. Natarajan (AIR 1964 SC 101) – এই মামলায়, আদালত সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার আদেশ দেয়, কারণ চুক্তির বিষয়টি বিশেষ এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এবং কেবল আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে পূর্ণ করা সম্ভব ছিল না।
উপসংহার:
সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা আইন মূলত তখনই প্রয়োগ করা হয় যখন চুক্তির বাস্তবায়ন কেবল আর্থিক ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে সম্ভব নয় এবং চুক্তির বিষয়টি বিশেষ বা অনন্য। এটি এমন চুক্তির জন্য প্রযোজ্য, যেখানে চুক্তির অংশ বা শর্ত সরাসরি বাস্তবায়নযোগ্য এবং অন্য উপায় বা উপকরণের মাধ্যমে পূর্ণ করা সম্ভব নয়।