চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার বিকল্প প্রতিকার কী হতে পারে?

চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার বিকল্প প্রতিকার

বাংলাদেশে চুক্তি সংক্রান্ত প্রতিকার আইন ১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ (The Specific Relief Act, 1877) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা (Specific Performance of Contract) তখনই আদেশযোগ্য যখন অন্য কোনো প্রতিকার যথাযথ হয় না। তবে, কিছু ক্ষেত্রে আদালত চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা প্রদানে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। তখন বিকল্প প্রতিকার হিসেবে কিছু আইনি সমাধান পাওয়া যেতে পারে।

নিম্নে চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার বিকল্প প্রতিকার ব্যাখ্যা করা হলো—


১. ক্ষতিপূরণ (Compensation or Damages)

যদি চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা আদায় সম্ভব না হয় বা আদালত তা দিতে না চায়, তবে চুক্তি লঙ্ঘনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ চুক্তি আইন, ১৮৭২ (The Contract Act, 1872) এবং সিভিল প্রসিডিউর কোড, ১৯০৮ (The Code of Civil Procedure, 1908)-এর অধীনে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন।

ক্ষতিপূরণের ধরন:

১. সাধারণ ক্ষতিপূরণ (Ordinary Damages):
– চুক্তি লঙ্ঘনের ফলে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা ক্ষতিপূরণ হিসাবে দাবি করা যায়।
উদাহরণ: একজন ঠিকাদার নির্ধারিত সময়ে বিল্ডিং নির্মাণে ব্যর্থ হলে জমির মালিক প্রকৃত ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন।

২. বিশেষ ক্ষতিপূরণ (Special Damages):
– যদি ক্ষতির পরিমাণ চুক্তির সময় অনুমেয় হয় এবং তা লঙ্ঘনের ফলে ঘটে, তবে বিশেষ ক্ষতিপূরণ পাওয়া যেতে পারে।
উদাহরণ: এক ব্যবসায়ী চুক্তি অনুযায়ী সময়মতো পণ্য সরবরাহ না পাওয়ার কারণে বিশাল ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হলে তিনি বিশেষ ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন।

৩. দণ্ডমূলক ক্ষতিপূরণ (Punitive or Exemplary Damages):
– কিছু ক্ষেত্রে, যদি চুক্তি ভঙ্গকারীর আচরণ ইচ্ছাকৃত বা প্রতারণামূলক হয়, তবে আদালত দণ্ডমূলক ক্ষতিপূরণ দিতে পারে।

৪. নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ (Liquidated Damages):
– চুক্তিতে যদি ক্ষতিপূরণের পরিমাণ আগেই নির্ধারণ করা থাকে, তবে আদালত সেই নির্ধারিত পরিমাণ আদেশ দিতে পারে।
ধারা ৭৩, চুক্তি আইন, ১৮৭২ অনুযায়ী, চুক্তি লঙ্ঘনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন।


২. চুক্তি বাতিল (Rescission of Contract)

যদি চুক্তির কোনো পক্ষ শর্তভঙ্গ করে, তবে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ২৭ ধারা অনুযায়ী, চুক্তি বাতিল করে প্রতিকার চাওয়া যায়।

  • উদাহরণ: যদি কোনো বিক্রেতা প্রতারণার মাধ্যমে সম্পত্তি বিক্রি করে, তবে ক্রেতা চুক্তি বাতিল করতে পারেন।

৩. চুক্তির সংশোধন (Rectification of Contract)

যদি চুক্তির ভুল বা অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি থাকে, তবে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ৩১ ধারা অনুসারে আদালত চুক্তির সংশোধনের নির্দেশ দিতে পারেন।

  • উদাহরণ: জমি ক্রয়ের চুক্তিতে ভুলবশত জমির পরিমাণ কম লেখা হলে, ক্রেতা আদালতে চুক্তি সংশোধনের আবেদন করতে পারেন।

৪. আদেশপত্র (Injunction)

যদি চুক্তি লঙ্ঘন প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়, তবে আদালত আদেশপত্র (injunction) জারি করতে পারে। এটি দুই ধরনের হতে পারে—

  1. স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Permanent Injunction) –
    – সম্পত্তির অবৈধ স্থানান্তর রোধ করতে আদালত স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারেন।
    ধারা ৫৬, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭
  2. অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Temporary Injunction) –
    – মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আদালত একটি সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে।
    সিপিসি, ১৯০৮-এর ১৫১ ধারা

৫. বিশ্বাসভঙ্গজনিত ট্রাস্ট সৃষ্টি (Constructive Trust)

যদি প্রতারক চুক্তির মাধ্যমে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে নিজের দখলে নেয়, তবে আদালত বিশ্বাসভঙ্গজনিত ট্রাস্ট (Constructive Trust) সৃষ্টি করতে পারে এবং প্রকৃত মালিককে সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতে পারে।

  • ধারা ৩৯, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ অনুযায়ী প্রতারণাজনিত চুক্তি বাতিলযোগ্য।

গুরুত্বপূর্ণ মামলার রেফারেন্স

  1. Hadley v. Baxendale (1854) – ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের নীতি ব্যাখ্যা করেছে।
  2. Lalbhai Trading Co. v. Union of India (1959) – নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকার সম্পর্কিত ব্যাখ্যা দিয়েছে।
  3. Bangladesh vs. Syed Abdul Kayum (1973) – প্রতারণামূলক চুক্তির বাতিলযোগ্যতার বিষয় ব্যাখ্যা করেছে।

উপসংহার

চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা তখনই আদেশযোগ্য, যখন ক্ষতিপূরণ পর্যাপ্ত প্রতিকার নয়। তবে আদালত যদি মনে করে যে চুক্তির বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বা অন্য প্রতিকার যথেষ্ট, তবে বিকল্প হিসেবে ক্ষতিপূরণ, চুক্তি বাতিল, সংশোধন, আদেশপত্র, বা বিশ্বাসভঙ্গজনিত ট্রাস্ট সৃষ্টি করতে পারে। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ এবং চুক্তি আইন, ১৮৭২ এর বিভিন্ন ধারার আলোকে বিকল্প প্রতিকার প্রদান করা হয়।