ধারা ৪২ অনুযায়ী স্বত্ব ঘোষণার আদেশ কখন দেওয়া যেতে পারে?

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ (The Specific Relief Act, 1877)-এর ধারা ৪২ অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো সম্পত্তি বা আইনি অধিকার সম্পর্কিত স্বত্ব বা বৈধ অবস্থান সম্পর্কে সন্দিহান থাকেন, তবে তিনি আদালতের মাধ্যমে একটি স্বত্ব ঘোষণার আদেশ (Declaratory Decree) পেতে পারেন।

এই আদেশের মাধ্যমে আদালত নিশ্চিত করেন যে বাদী নির্দিষ্ট সম্পত্তি বা আইনি অধিকারের বৈধ মালিক বা অধিকারী


📌 ধারা ৪২-এর শর্তাবলী:

✅ (১) বাদীর আইনগত অধিকার থাকা আবশ্যক

✔ বাদীকে আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে তার কোনো বৈধ অধিকার বা স্বত্ব আছে, যা অন্য পক্ষ চ্যালেঞ্জ করছে বা অস্বীকার করছে।

🔹 উদাহরণ:

  • একজন ব্যক্তি তার জমির মালিকানা দাবি করছেন, কিন্তু অন্য কেউ তা দখল করে রেখেছে।
  • তিনি আদালতে ধারা ৪২ অনুসারে স্বত্ব ঘোষণার আদেশ চাইতে পারেন।

✅ (২) অপরপক্ষ অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে

✔ আদালত শুধুমাত্র তখনই স্বত্ব ঘোষণার আদেশ দেবেন, যখন বাদীর স্বত্ব সম্পর্কে কোনো পক্ষ প্রশ্ন তুলেছে বা অস্বীকার করেছে।

🔹 উদাহরণ:

  • সরকারের একটি সংস্থা বাদীর জমি সরকারী সম্পত্তি বলে দাবি করছে।
  • বাদী তার মালিকানা নিশ্চিত করতে স্বত্ব ঘোষণার আদেশ চাইতে পারেন।

🚫 কিন্তু যদি কেউ স্বত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্ন না তোলে, তাহলে আদালত এই আদেশ দেবেন না।


✅ (৩) বাদীর কাছে অন্য কোনো কার্যকর প্রতিকার থাকা যাবে না

যদি বাদীর জন্য অন্য কোনো কার্যকর প্রতিকার (Effective Remedy) থাকে, তাহলে শুধুমাত্র ঘোষণামূলক আদেশ দেওয়া হবে না।

🔹 উদাহরণ:

  • যদি বাদী জমি পুনরুদ্ধারের জন্য সরাসরি দখল পুনরুদ্ধারের মামলা (Suit for Possession) করতে পারেন, তাহলে শুধু স্বত্ব ঘোষণার জন্য মামলা গ্রহণযোগ্য হবে না।
  • তবে, যদি জমি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব না হয়, তাহলে স্বত্ব ঘোষণার আদেশ চাওয়া যেতে পারে।

✅ (৪) আদালতের বিবেচনাধীন সিদ্ধান্ত

আদালত চাইলে স্বত্ব ঘোষণার আদেশ দিতে পারেন, তবে বাধ্য নন।
আদালত যদি মনে করেন যে ঘোষণার আদেশ দেওয়া ন্যায্য হবে না, তাহলে তারা তা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।

🔹 উদাহরণ:

  • যদি বাদী আদালতে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন যে তার আইনি স্বত্ব আছে, তবে আদালত আদেশ দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন।

📌 ধারা ৪২-এর অধীনে স্বত্ব ঘোষণার আদেশ কবে দেওয়া যেতে পারে?

✅ (১) জমির মালিকানা নির্ধারণের জন্য

যদি কেউ অন্যায়ভাবে বাদীর জমির মালিকানা দাবি করেন, তবে বাদী আদালতে স্বত্ব ঘোষণার মামলা করতে পারেন।

🔹 উদাহরণ:

  • জনাব রফিক একটি জমি ২০ বছর ধরে ভোগদখল করছেন।
  • হঠাৎ একজন ব্যক্তি দাবি করলো যে এই জমি তার পৈতৃক সম্পত্তি।
  • রফিক আদালতে স্বত্ব ঘোষণার মামলা করতে পারেন।

✅ (২) উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিরোধে

✔ যদি কেউ উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি দাবি করেন এবং অন্য কেউ তা অস্বীকার করে, তাহলে আদালত স্বত্ব ঘোষণার আদেশ দিতে পারেন।

🔹 উদাহরণ:

  • জনাব করিমের বাবা মারা গেছেন, এবং করিম তার পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার দাবি করছেন।
  • কিন্তু তার চাচা বলছেন, তিনি এই সম্পত্তির প্রকৃত মালিক।
  • করিম আদালতে স্বত্ব ঘোষণার আদেশ চাইতে পারেন।

✅ (৩) চুক্তি সংক্রান্ত অধিকার সুরক্ষার জন্য

যদি কোনো চুক্তির অধিকার কেউ চ্যালেঞ্জ করে, তবে বাদী স্বত্ব ঘোষণার আদেশ চাইতে পারেন।

🔹 উদাহরণ:

  • একজন ব্যক্তি একটি সম্পত্তি কিনেছেন, কিন্তু বিক্রেতা বলছেন যে চুক্তি বৈধ নয়।
  • ক্রেতা আদালতে স্বত্ব ঘোষণার জন্য আবেদন করতে পারেন।

✅ (৪) সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার দাবির বিরুদ্ধে

যদি কোনো সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা কারও স্বত্ব বা অধিকারকে অস্বীকার করে, তাহলে বাদী আদালতে স্বত্ব ঘোষণার মামলা করতে পারেন।

🔹 উদাহরণ:

  • একটি সংস্থা বাদীর জমির ওপর রাস্তা নির্মাণ করছে এবং বলছে যে এটি সরকারি সম্পত্তি
  • বাদী আদালতে মালিকানা ঘোষণার আদেশ চাইতে পারেন।

📌 কেস রেফারেন্স (Case Laws)

1️⃣ K.K. Verma v. Union of India (1954)

  • আদালত বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি তার স্বত্ব সম্পর্কে সন্দেহ বা বিতর্কের সম্মুখীন হন, তবে তিনি ধারা ৪২ অনুযায়ী স্বত্ব ঘোষণার আদেশ চাইতে পারেন।

2️⃣ Bhavan Vaja v. Solanki Hanuji (1972)

  • আদালত বলেন, যদি বাদীর স্বত্ব অন্য কেউ অস্বীকার করে এবং বাদীর অন্য কোনো কার্যকর প্রতিকার না থাকে, তবে স্বত্ব ঘোষণার আদেশ দেওয়া যেতে পারে।

3️⃣ Vemareddi Ramaraghava Reddy v. Konduru Seshu Reddy (1967)

  • আদালত বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানা দাবি করেন এবং কেউ তা অস্বীকার করেন, তাহলে স্বত্ব ঘোষণার আদেশ দিতে হবে।

📌 উপসংহার

ধারা ৪২ অনুযায়ী, আদালত নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে স্বত্ব ঘোষণার আদেশ দিতে পারেন:
1️⃣ যদি বাদীর স্বত্ব বা অধিকার চ্যালেঞ্জ করা হয়।
2️⃣ যদি বাদীর পক্ষে স্বত্বের সুরক্ষার জন্য অন্য কোনো কার্যকর প্রতিকার না থাকে।
3️⃣ যদি আদালত মনে করেন যে ঘোষণার আদেশ দেওয়া ন্যায্য হবে।

তবে আদালত বাধ্য নন, বরং বিষয়টি তার বিবেচনার ওপর নির্ভর করে।