কোন ধরনের চুক্তি সুনির্দিষ্ট কার্যকর করা যায় না?

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ (The Specific Relief Act, 1877)-এর অধীনে কিছু চুক্তি সুনির্দিষ্ট কার্যকর করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ, আদালত এসব চুক্তির বাধ্যতামূলক বাস্তবায়নের আদেশ দিতে পারেন না। আইনটির ১৪ ও ১৫ নম্বর ধারা এসব চুক্তির তালিকা নির্ধারণ করেছে।


যেসব চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা দেওয়া যায় না (Section 14 & 15):

১. ক্ষতিপূরণ দ্বারা পরিমাপযোগ্য চুক্তি (Section 14(1)(a))

  • যদি কোনো চুক্তি ভঙ্গের ফলে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়, তাহলে সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার প্রয়োজন হয় না
  • আদালত পরিবর্তে ক্ষতিপূরণ আদেশ দিতে পারেন

🔹 উদাহরণ:

  • একজন ঠিকাদার নির্দিষ্ট দামে একটি ভবন নির্মাণের চুক্তি করলেন, কিন্তু কাজ শেষ না করেই ছেড়ে দিলেন।
  • আদালত সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার আদেশ না দিয়ে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করতে পারেন

২. ব্যক্তিগত দক্ষতা বা শ্রম সম্পর্কিত চুক্তি (Section 14(1)(b))

  • যেখানে কোনো শিল্পী, ক্রীড়াবিদ, সংগীতজ্ঞ, প্রকৌশলী, ডাক্তার বা অন্য কোনো বিশেষজ্ঞের দক্ষতা প্রয়োজন, সেই চুক্তি সুনির্দিষ্টভাবে কার্যকর করা যায় না
  • কারণ, আদালত কাউকে জোরপূর্বক কাজ করাতে পারে না

🔹 উদাহরণ:

  • একজন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী একটি নির্দিষ্ট গ্রাহকের জন্য ছবি আঁকার চুক্তি করলেন কিন্তু পরবর্তীতে কাজ করতে অস্বীকার করলেন।
  • আদালত তাকে জোর করে কাজ করানোর নির্দেশ দিতে পারবেন না, তবে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করতে পারেন

৩. অত্যন্ত অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট চুক্তি (Section 14(1)(c))

  • যদি চুক্তির শর্ত অস্পষ্ট বা অনির্দিষ্ট হয়, তাহলে আদালত সেটি কার্যকর করতে পারে না।
  • চুক্তির শর্ত পরিষ্কার ও বাস্তবায়নযোগ্য হওয়া প্রয়োজন

🔹 উদাহরণ:

  • যদি দুটি কোম্পানি একটি চুক্তিতে বলে, “আমরা ভবিষ্যতে একে অপরকে সহযোগিতা করবো,” তবে এটি সুনির্দিষ্ট কার্যকর করা যাবে না, কারণ এর অর্থ অনির্দিষ্ট।

৪. চুক্তি যেখানে তৃতীয় পক্ষের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন (Section 14(1)(d))

  • যদি চুক্তির বাস্তবায়নের জন্য তৃতীয় কোনো পক্ষের সম্মতি বা অংশগ্রহণ প্রয়োজন হয়, তাহলে তা সুনির্দিষ্ট কার্যকর করা যায় না

🔹 উদাহরণ:

  • একজন জমির মালিক একজন ক্রেতার সঙ্গে বিক্রির চুক্তি করলেন, কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল যে সেই জমির মালিকানা আংশিকভাবে আরেকজনের কাছে রয়েছে।
  • আদালত এই চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা দিতে পারবেন না, কারণ তৃতীয় পক্ষ এতে যুক্ত

৫. চুক্তি যেখানে আদালতের নজরদারি প্রয়োজন (Section 14(1)(e))

  • যদি কোনো চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য আদালতের দীর্ঘমেয়াদী নজরদারি প্রয়োজন হয়, তবে তা সুনির্দিষ্টভাবে কার্যকর করা যায় না
  • কারণ, আদালতের পক্ষে চুক্তির প্রতিটি দিক পর্যবেক্ষণ করা কঠিন

🔹 উদাহরণ:

  • যদি কোনো সংস্থা ১০ বছরের জন্য অন্য একটি সংস্থার হয়ে ব্যবসা পরিচালনার চুক্তি করে, তবে আদালত এই চুক্তি কার্যকর করতে পারবেন না, কারণ তারা এতদিন ধরে নজরদারি করতে পারবেন না

৬. চুক্তি যেখানে পক্ষদ্বয়ের বিশ্বাস ও আস্থার সম্পর্ক (Section 14(1)(f))

  • কোনো চুক্তি যদি সম্পূর্ণরূপে পক্ষদ্বয়ের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে তা সুনির্দিষ্ট কার্যকর করা সম্ভব নয়

🔹 উদাহরণ:

  • একজন আইনজীবী ও তার মক্কেলের মধ্যে চুক্তি হলে, আদালত আইনজীবীকে জোর করে কাজ করতে বাধ্য করতে পারবেন না

৭. জনস্বার্থের পরিপন্থী চুক্তি (Public Policy Violation – Section 15)

  • যদি কোনো চুক্তি অন্যায়, অবৈধ বা জনস্বার্থবিরোধী হয়, তবে আদালত সেটির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা আদেশ দিতে পারেন না।
  • আদালত কেবল ন্যায়সঙ্গত চুক্তি কার্যকর করতে পারেন

🔹 উদাহরণ:

  • যদি দুই পক্ষের মধ্যে একটি বেআইনি কার্যক্রম করার জন্য চুক্তি হয়, তবে সেটি সুনির্দিষ্টভাবে কার্যকর করা যাবে না
  • যেমন, একজন ব্যক্তি অবৈধভাবে সরকারি জমি দখলের জন্য চুক্তি করলে আদালত তা বাস্তবায়ন করবেন না।

গুরুত্বপূর্ণ কেস রেফারেন্স (Case Laws)

1️⃣ Lumley v. Wagner (1852)

  • এই মামলায় আদালত বলেন, কোনো ব্যক্তি বিশেষ প্রতিভা বা দক্ষতার ভিত্তিতে করা চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য করা যাবে না

2️⃣ Co-operative Insurance Society Ltd. v. Argyll Stores (1998)

  • আদালত বলেন, যে চুক্তি আদালতের দীর্ঘমেয়াদী নজরদারি প্রয়োজন করে, তা কার্যকর করা সম্ভব নয়

3️⃣ Bangladesh v. Abdul Karim (2007)

  • আদালত বলেন, যে চুক্তি অস্পষ্ট বা বাস্তবায়নের জন্য তৃতীয় পক্ষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন, তা কার্যকর করা যাবে না

উপসংহার

সুনির্দিষ্ট কার্যকর করা যায় না এমন চুক্তিগুলো মূলত তিন ধরনের:

  • যেগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
  • যেগুলো আদালতের নজরদারির আওতায় পড়ে।
  • যেগুলো আইন বা ন্যায়ের পরিপন্থী।

এতে ক্ষতিপূরণ বা অন্য বিকল্প প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে, তবে জোরপূর্বক বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।