চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা বলতে কী বোঝায়?

বাংলাদেশে চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা (Specific Performance of a Contract) সম্পর্কিত আইনগত বিধানগুলি সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ (Specific Relief Act, 1877)-এর ধারা ১১ থেকে ২১ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। এই আইনের অধীনে আদালত চুক্তির শর্তাবলী সুনির্দিষ্টভাবে বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ প্রদান করতে পারে। নিম্নে আর্টিকেলটি ব্যাখ্যা করা হলো:


চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা কী?

চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা বলতে বোঝায়, আদালত চুক্তির শর্তাবলী অনুযায়ী পক্ষগুলিকে তাদের দায়িত্ব পালনে বাধ্য করার জন্য একটি আদেশ প্রদান করে। এই আদেশের মাধ্যমে চুক্তির শর্তাবলী সুনির্দিষ্টভাবে পালন করা হয়, এবং চুক্তি ভঙ্গের ক্ষেত্রে আদালত পক্ষগুলিকে চুক্তি অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য করে।


চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার উদ্দেশ্য

চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার মূল উদ্দেশ্য হলো:

  1. চুক্তির শর্তাবলী অনুযায়ী কাজ সম্পাদন করতে পক্ষগুলিকে বাধ্য করা।
  2. যখন আর্থিক ক্ষতিপূরণ (Monetary Compensation) দ্বারা ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়, তখন চুক্তির শর্তাবলী বাস্তবায়ন করা।
  3. বিশেষ ধরনের সম্পত্তি বা পরিষেবার ক্ষেত্রে চুক্তি বাস্তবায়ন করা, যা অর্থ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না।

চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার উদাহরণ

  1. রিয়েল এস্টেট চুক্তি: যদি কোনো ব্যক্তি জমি বা বাড়ি বিক্রির চুক্তি করে এবং বিক্রেতা চুক্তি অনুযায়ী সম্পত্তি হস্তান্তর করতে অস্বীকার করে, তাহলে ক্রেতা আদালতে সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার জন্য আবেদন করতে পারে। আদালত বিক্রেতাকে সম্পত্তি হস্তান্তরের নির্দেশ দিতে পারে।
  2. শিল্পকর্ম বা সেবা চুক্তি: যদি কোনো শিল্পী বা সঙ্গীতজ্ঞ চুক্তি অনুযায়ী একটি শিল্পকর্ম তৈরি করতে বা সঙ্গীত পরিবেশন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আদালত তাকে সেই কাজটি সম্পাদন করতে বাধ্য করতে পারে।

কখন সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা প্রদান করা হয়?

সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে প্রদান করা হয়:

  1. যখন আর্থিক ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট নয়: যদি আর্থিক ক্ষতিপূরণ দ্বারা ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা দেওয়া হয়।
  2. বিশেষ বা একক সম্পত্তির ক্ষেত্রে: যেমন জমি, বাড়ি, প্রাচীন শিল্পকর্ম ইত্যাদি, যা অর্থ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না।
  3. যখন চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব: চুক্তির শর্তাবলী বাস্তবায়ন করা যদি সম্ভব এবং যৌক্তিক হয়, তাহলে আদালত সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার আদেশ দেয়।

কখন সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা দেওয়া হয় না?

সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে দেওয়া হয় না:

  1. চুক্তি অবৈধ বা ভ্রষ্ট হলে: যদি চুক্তির শর্তাবলী অবৈধ বা অস্পষ্ট হয়।
  2. চুক্তি বাস্তবায়ন অযৌক্তিক হলে: যদি চুক্তি বাস্তবায়ন করা আদালতের কাছে অযৌক্তিক বা অসম্ভব মনে হয়।
  3. দীর্ঘসূত্রতা: যদি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘ সময় লাগার সম্ভাবনা থাকে।
  4. পক্ষগুলির অসদাচরণ: যদি কোনো পক্ষ চুক্তির শর্তাবলী পুরোপুরি মেনে না চলে।

আইনগত ভিত্তি

বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ধারা ১১ থেকে ২১ পর্যন্ত চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা সম্পর্কিত বিধান রয়েছে। এই আইনের অধীনে আদালত চুক্তির শর্তাবলী সুনির্দিষ্টভাবে বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ প্রদান করতে পারে। বিশেষ করে:

  • ধারা ১২: চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতার জন্য আদালতের ক্ষমতা।
  • ধারা ১৪: যখন সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা দেওয়া হয় না।
  • ধারা ২০: আদালতের বিবেচনামূলক ক্ষমতা।

উপসংহার

চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরতা হলো একটি আইনগত প্রতিকার, যা চুক্তির শর্তাবলী সুনির্দিষ্টভাবে বাস্তবায়নের জন্য আদালতের নির্দেশ প্রদান করে। এটি বিশেষভাবে প্রয়োগ করা হয় যখন আর্থিক ক্ষতিপূরণ দ্বারা ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয় বা চুক্তির বিষয়বস্তু বিশেষ ধরনের সম্পত্তি বা পরিষেবা সম্পর্কিত হয়। বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ধারা ১১ থেকে ২১ পর্যন্ত এই বিষয়ে বিস্তারিত বিধান রয়েছে।