কোন পরিস্থিতিতে আদালত নিষেধাজ্ঞা প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে?
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ (The Specific Relief Act, 1877)-এর ধারা ৫৬ অনুযায়ী, কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আদালত নিষেধাজ্ঞা প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন। আদালত তখনই নিষেধাজ্ঞা দিতে চান না, যখন তারা মনে করেন যে এটি অন্যায়, অযৌক্তিক বা অপ্রয়োজনীয় হতে পারে।
📌 আদালত যেসব পরিস্থিতিতে নিষেধাজ্ঞা দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন (ধারা ৫৬ অনুযায়ী)
১. যদি নিষেধাজ্ঞা সরকার বা সরকারি সংস্থার বিরুদ্ধে হয় (Section 56(a))
✅ যদি সরকার কোনো কাজ আইনি ক্ষমতার আওতায় করে, তাহলে আদালত সাধারণত তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেন না।
🔹 উদাহরণ:
- সরকার একটি রাস্তা প্রশস্ত করতে গিয়ে কিছু স্থাপনা অপসারণ করছে।
- যেহেতু এটি জনস্বার্থে হচ্ছে, আদালত এই কাজে বাধা দিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করবেন না।
🚫 তবে যদি সরকার বেআইনিভাবে কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি দখল করে, তাহলে আদালত নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন।
২. যদি নিষেধাজ্ঞা জনস্বার্থের পরিপন্থী হয় (Section 56(b))
✅ যদি আদালত মনে করেন যে নিষেধাজ্ঞা জনস্বার্থের ক্ষতি করবে, তবে তা জারি করা হবে না।
🔹 উদাহরণ:
- একটি সরকারি হাসপাতাল তৈরির জন্য সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, কিন্তু কিছু মানুষ সেই কাজ বন্ধের জন্য নিষেধাজ্ঞার আবেদন করলো।
- আদালত এটি জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় বলে নিষেধাজ্ঞা দিতে অস্বীকৃতি জানাবেন।
৩. যদি বাদী নিজেই অন্যায়ভাবে সুবিধা নিতে চান (Section 56(c))
✅ যদি বাদী নিজেই অসৎ উদ্দেশ্যে নিষেধাজ্ঞা চান, তাহলে আদালত তা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।
🔹 উদাহরণ:
- একজন ব্যবসায়ী তার প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবসা বন্ধ করতে নিষেধাজ্ঞা চাইছেন।
- আদালত যদি দেখেন যে বাদীর উদ্দেশ্য প্রতিযোগিতাকে অন্যায়ভাবে বাধাগ্রস্ত করা, তাহলে নিষেধাজ্ঞা দেবেন না।
৪. যদি মামলার বাদীর পক্ষে অন্য আইনগত প্রতিকার থাকে (Section 56(d))
✅ যদি বাদীর সমস্যা সমাধানের জন্য অন্য কোনো আইনি উপায় থাকে, তাহলে আদালত নিষেধাজ্ঞা দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন।
🔹 উদাহরণ:
- কোনো ব্যক্তি জমি দখলের অভিযোগ করেছেন, কিন্তু সেই জমির মালিকানা সংক্রান্ত মামলা অন্য আদালতে বিচারাধীন আছে।
- আদালত মালিকানা মামলা নিষ্পত্তির আগেই নিষেধাজ্ঞা জারি করতে চাইবেন না।
৫. যদি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চুক্তি কার্যকর করা সম্ভব না হয় (Section 56(e))
✅ যদি কোনো চুক্তি এমন হয় যে, তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, তবে আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করবেন না।
🔹 উদাহরণ:
- একজন গায়ক তার কনসার্টে গান গাওয়ার চুক্তি করেছেন, কিন্তু তিনি গাইতে রাজি নন।
- আদালত তাকে বাধ্য করতে পারেন না, কারণ এটি ব্যক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল।
🚫 তবে আদালত তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করতে পারেন।
৬. যদি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে অপরাধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় (Section 56(f))
✅ যদি কোনো ব্যক্তি অপরাধ করে এবং নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নিজেকে রক্ষা করতে চান, তাহলে আদালত তা প্রত্যাখ্যান করবেন।
🔹 উদাহরণ:
- একজন ব্যক্তি বেআইনি কারখানা চালাচ্ছেন এবং তিনি চাচ্ছেন সরকার তার কারখানা বন্ধ না করতে পারে।
- আদালত এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবেন না যা বেআইনি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়।
৭. যদি আদালতের আদেশ পালন করা সম্ভব না হয় (Section 56(g))
✅ যদি আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হয়, তাহলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে না।
🔹 উদাহরণ:
- একজন ব্যক্তি চাচ্ছেন আকাশ থেকে একটি নক্ষত্র সরিয়ে দেওয়া হোক!
- এটি বাস্তবসম্মত নয়, তাই আদালত এ ধরনের আদেশ দেবেন না।
📌 কেস রেফারেন্স (Case Laws)
1️⃣ Municipal Board of Agra v. Asharfi Lal (1919)
- আদালত বলেন, যদি নিষেধাজ্ঞার ফলে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তা জারি করা যাবে না।
2️⃣ Co-operative Insurance Society Ltd. v. Arjan Das (1957)
- আদালত বলেন, যদি বাদীর পক্ষে অন্য কোনো আইনি প্রতিকার থাকে, তবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে না।
3️⃣ State of Orissa v. Madan Gopal Rungta (1952)
- আদালত বলেন, সরকার কোনো আইনানুগ কাজ করলে, তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করা যাবে না।
📌 উপসংহার
✔ আদালত ধারা ৫৬ অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন যদি:
1️⃣ সরকারি সংস্থার আইনগত কাজের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়।
2️⃣ নিষেধাজ্ঞা জনস্বার্থের পরিপন্থী হয়।
3️⃣ বাদী অসৎ উদ্দেশ্যে নিষেধাজ্ঞা চাইলে।
4️⃣ বাদীর জন্য অন্য কোনো আইনি প্রতিকার থাকলে।
5️⃣ চুক্তি কার্যকর করা অসম্ভব হলে।
6️⃣ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে বেআইনি কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করা হয়।
7️⃣ আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলে।
✔ আদালত সব সময় ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা দেন বা প্রত্যাখ্যান করেন।