আদালতে ঘুষ গ্রহণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল!

আদালতে ঘুষ ও দুর্নীতি: বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন

বাংলাদেশের আদালতগুলোর বিশেষ করে অধস্তন আদালতগুলোর বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিচারপ্রার্থী নাগরিকদের অভিযোগ, আদালতে ফাইল নড়াচড়া করাতেও ঘুষ দিতে হয়, যা ‘খরচাপাতি’ বা ‘বকশিশ’ নামে প্রচলিত। তবে এটি মূলত এক ধরনের ঘুষ, যা পিয়ন, পেশকার, মুহুরি এবং এমনকি আইনজীবীদের মধ্যেও প্রচলিত।

শরীয়তপুর আইনজীবী সমিতির বিতর্কিত রেজ্যুলেশন

শরীয়তপুর জেলা আইনজীবী সমিতির একটি সভায় ঘুষ দেওয়ার হার নির্ধারণ করে রেজ্যুলেশন পাস করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী:

  1. পেশকার/পিয়নকে সি.আর ফাইলিং এ ১০০ টাকার বেশি দেওয়া যাবে না।
  2. যেকোনো দরখাস্ত জি.আর/সি.আর ১০০ টাকার বেশি দেওয়া যাবে না।
  3. জামিননামা দাখিলের খরচ মামলা প্রতি ১০০-২০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
  4. গারদখানায় ওকালতনামা স্বাক্ষরে ১০০ টাকা, সিভিল ফাইলিংয়ে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা ও হলফনামায় ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্ত আদালতের বিচার প্রক্রিয়ায় উৎকোচ গ্রহণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি করেছে।

বিচার বিভাগে দুর্নীতির চিত্র

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের এক অনলাইন জরিপে দেখা গেছে, ৬৬% বিচারক মনে করেন, তাদের সহকারী স্টাফরা ঘুষ গ্রহণ করেন। নাগরিকদের মধ্যে ৮৪.৯০% এবং আইনজীবীদের মধ্যে ৯১.৭০% মনে করেন, আদালতের কর্মচারীরা ঘুষ চান।

দুর্নীতির মূল কারণ

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং পর্যাপ্ত জনবল সংকট ঘুষ ও দুর্নীতির অন্যতম কারণ। বর্তমানে ২,৩০০ জন বিচারক প্রায় ৪৩ লাখ মামলা পরিচালনা করছেন, যা কার্যত অসম্ভব। ফলে আইনজীবী, আদালতের কর্মচারী এবং পুলিশের মাধ্যমে মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয় এবং ঘুষ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে।

প্রতিরোধমূলক সুপারিশ

বিচার বিভাগের দুর্নীতি দমনে কমিশনের সুপারিশ:

  1. সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে বিচারকদের সম্পদের হিসাব নেওয়া।
  2. কোর্ট সাপোর্ট স্টাফদের ঘুষ নেওয়ার বিষয়ে বিশেষ মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা।
  3. বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা।
  4. অভিযোগ ব্যবস্থাপনার জন্য সুপ্রিম কোর্টে পৃথক দুর্নীতি অনুসন্ধান কমিটি গঠন।

সংস্কার প্রস্তাব

আদালত সংস্কারে কমিশনের ৩৫২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ৩১টি অধ্যায়ের মাধ্যমে সুপারিশ ও সংস্কারের প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশন গত ৫ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধানের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।