আইনি লেখায় সঠিকতা, পরিষ্কারতা এবং নির্ভুলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইন পেশায় লেখালেখি এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে একটি ছোট ভুলও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। নিচে কিছু সাধারণ ভুল এবং তা এড়ানোর উপায় তুলে ধরা হলো:
১. অস্পষ্টতা ও জটিল ভাষা
আইনি লেখার একটি সাধারণ ভুল হলো অতিরিক্ত জটিল বা কঠিন ভাষার ব্যবহার, যা পাঠককে বিভ্রান্ত করতে পারে। আইনি লেখার উদ্দেশ্য হলো তথ্যকে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা, না যে তা আরো জটিল করা।
- এড়িয়ে চলার উপায়:
- সহজ এবং সরল ভাষায় লেখার চেষ্টা করুন।
- অত্যধিক আইনি শব্দ বা জটিল পরিভাষা এড়িয়ে চলুন, তবে আইনি শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করুন।
- সংক্ষেপে বক্তব্য উপস্থাপন করুন যাতে তা পরিষ্কার ও সহজে বোধগম্য হয়।
উদাহরণ:
অস্পষ্ট: “অতএব, উক্ত অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তীতে ঐ সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পূর্ববর্তী সময়ের মধ্যে কোনো ধরনের বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা হলে…” স্পষ্ট: “এই অভিযোগের ভিত্তিতে যদি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা হয়, তবে পরবর্তী সিদ্ধান্ত বাতিল হতে পারে।”
২. অতিরিক্ত তথ্য প্রদান
আইনি লেখায় অনেক সময় অত্যধিক তথ্য প্রদান করা হয়, যা বিষয়টির মূল সুরের বাইরে চলে যায়। এই ধরনের অপ্রয়োজনীয় তথ্য লেখার মানে নষ্ট করে এবং পাঠককে বিভ্রান্ত করে।
- এড়িয়ে চলার উপায়:
- শুধুমাত্র মামলার জন্য প্রাসঙ্গিক তথ্য প্রদান করুন।
- প্রতিটি অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা রাখুন।
- অনুচ্ছেদগুলোর মধ্যে পরিষ্কার সংযোগ রাখুন।
উদাহরণ:
অতিরিক্ত তথ্য: “অভিযোগকারী ব্যক্তি এমন অবস্থায় মামলা দাখিল করেছেন যেখানে তিনি, তার পরিবার, প্রতিবেশী এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থা প্রমাণাদি প্রদান করেছে…” স্পষ্ট তথ্য: “অভিযোগকারী ব্যক্তি মামলা দাখিল করেছেন এবং তার পক্ষে প্রমাণাদি প্রদান করা হয়েছে।”
৩. প্রমাণের অভাব
আইনি লেখায় অনেক সময় প্রমাণ বা নজিরের উল্লেখ কম হয়, যা লেখার বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়ে দেয়। একটি আইনি লেখার ক্ষেত্রে প্রমাণ, নজির বা আইনের রেফারেন্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
- এড়িয়ে চলার উপায়:
- লেখার প্রতিটি অংশে আইনি প্রমাণ বা রেফারেন্স ব্যবহার করুন।
- আদালতের পূর্ববর্তী রায় বা আইনের ধারা উল্লেখ করে যুক্তি প্রদান করুন।
উদাহরণ:
প্রমাণের অভাব: “মামলাটি সঠিকভাবে পরিচালিত হয়েছে।” প্রমাণ সহ: “মামলাটি সঠিকভাবে পরিচালিত হয়েছে, যেমনটি ‘জন ডো’ বনাম ‘রিচার্ড স্মিথ’ (২০১৫) মামলায় আদালত উল্লেখ করেছে।”
৪. নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যহীনতা
আইনি লেখায় অনেক সময় লেখক তাদের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করেন না। এটি লেখাটিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ এবং উদ্দেশ্যহীন করে ফেলে।
- এড়িয়ে চলার উপায়:
- লেখার শুরুতে পরিষ্কারভাবে আপনার উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।
- লেখার প্রতিটি প্যারাগ্রাফকে আপনার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত রাখুন।
উদাহরণ:
নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যহীন: “আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে নানা দিক বিবেচনা করা উচিত, যা কেবলমাত্র আইনি বিষয় নয়, বরং…” সুস্পষ্ট: “এই লেখার উদ্দেশ্য হলো, কীভাবে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে মামলা সফলভাবে পরিচালিত হতে পারে তা বিশ্লেষণ করা।”
৫. আলগা বা অসংগত যুক্তি
অনেক সময় আইনি লেখায় যুক্তি খণ্ডিত বা অসংগত থাকে। এতে লেখাটি বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না এবং পাঠকের মনোযোগ নষ্ট হয়।
- এড়িয়ে চলার উপায়:
- যুক্তি সমর্থনকারী প্রমাণ ও যথাযথ তথ্য প্রদান করুন।
- আইনি লেখার প্রতিটি অংশে যুক্তিসংগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন।
উদাহরণ:
অসংগত যুক্তি: “কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল, তবে প্রমাণের অভাব সত্ত্বেও, সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনা উচিত।” সংগত যুক্তি: “কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল, কারণ প্রমাণাদি ভিত্তিক সিদ্ধান্তে কোনো ত্রুটি পাওয়া যায়নি।”
৬. আইনি ধারার ভুল ব্যবহার
আইনি লেখায় ভুল আইনি ধারার ব্যবহারও একটি সাধারণ ভুল। ভুল আইনি ধারার উল্লেখ লেখার সঠিকতা নষ্ট করে দিতে পারে এবং আদালতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
- এড়িয়ে চলার উপায়:
- আইনি ধারার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করুন।
- আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ধারা বা নিয়মের সঠিক রেফারেন্স প্রদান করুন।
উদাহরণ:
ভুল ব্যবহার: “ধারা ১৫৩ অনুযায়ী প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।” সঠিক ব্যবহার: “ধারা ১৫৩ অনুযায়ী সিদ্ধান্তের পূর্বে প্রমাণের যাচাই করা আবশ্যক।”
৭. লেখার কাঠামো না মানা
আইনি লেখায় উপস্থাপনার কাঠামো বা ফরম্যাট সঠিকভাবে অনুসরণ না করলে, এটি পাঠকের কাছে অপরিষ্কার ও দুর্বোধ্য হয়ে উঠতে পারে।
- এড়িয়ে চলার উপায়:
- আইনি লেখার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বা ফরম্যাট অনুসরণ করুন।
- প্রতিটি বিভাগ বা প্যারাগ্রাফকে সঠিকভাবে শ্রেণীবদ্ধ করুন, যেমন: পরিচিতি, আইনি প্রশ্ন, যুক্তি, সিদ্ধান্ত, ইত্যাদি।
উদাহরণ:
কাঠামো অনুপস্থিত: “কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয় এখানে আলোচনা করা হলো।” কাঠামো সঠিক:
- প্রস্তাবনা: “এই লেখায় আমরা আইনগতভাবে কীভাবে মামলা পরিচালিত হবে তা আলোচনা করব।”
- আইনি প্রশ্ন: “এখানে কীভাবে আইনি প্রশ্নটি উঠছে?”
- বিচার: “বিচারের প্রেক্ষিতে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা কী?”
উপসংহার:
আইনি লেখায় সাধারণ ভুলগুলো এড়িয়ে চলার জন্য নিয়মিত প্র্যাকটিস ও মনোযোগী হওয়া জরুরি। লেখার সঠিকতা, প্রমাণের যথাযথ ব্যবহার, এবং স্পষ্টতা নিশ্চিত করে আইনি লেখার মান উন্নত করা সম্ভব। এসব ভুল এড়াতে হলে, নিয়মিত লেখার অভ্যাস তৈরি করা এবং আইনি ভাষার সঠিক ব্যবহার প্রয়োজন।